মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে মাসের পর মাস প্রচার-প্রচারণা আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর অবশেষে এসেছে ভোটের দিন। সর্বশেষ জনমত জরিপ বলছে, এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে অতীতে সবসময় জরিপের পূর্বাভাস মেলেনি। এ বছরও ভোটের ফলে থাকতে পারে নানা চমক।
মোটাদাগে, ভোটারদের রায় আসার পর তিন ধরনের ফল দেখা যেতে পারে।
কী হতে পারে সেই তিনটি ফল, ভোট গণনার সময় কোন প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখে সেগুলোর আভাস পাওয়া যাবে এবং এর অর্থ কী হতে পারে—চলুন দেখে নেওয়া যাক।
১. ডেমোক্র্যাটদের বড় জোয়ার
ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতার বাইরে থাকা দল সুবিধা পায়।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে জনমত জরিপে ঐতিহাসিকভাবে অজনপ্রিয় হিসেবে উঠে আসা একজন প্রেসিডেন্ট, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া ভোক্তা ব্যয় এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে সমর্থনের মতো বিতর্কিত নীতি। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে তথাকথিত নির্বাচনী জোয়ারের অনুকূল পরিস্থিতি।
প্রথম সম্ভাব্য চিত্রে সত্যিই বড় ধরনের নির্বাচনী জোয়ার দেখা যেতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণই নিতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের চেয়েও অনেক বেশি আসন জিততে পারে। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, যেসব আসনে দুই দলের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি, সেগুলোর প্রায় এক ডজন আসনেই তারা জিততে পারে। এমনকি অপেক্ষাকৃত বেশি রক্ষণশীল এলাকাতেও রিপাবলিকানদের কিছু আসন নিজেদের দখলে নিতে পারে তারা।
সিনেটের ক্ষেত্রে এমন ফল পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর সব কটিতে বা অধিকাংশে জয় পেতে হবে। এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের আসনও রয়েছে। এমনকি এমন কোনো অঙ্গরাজ্যে চোখ-ধাঁধানো জয় পেতে পারে দলটি, যেখানে এক প্রজন্ম ধরে কোনো ডেমোক্র্যাট নির্বাচিত হননি—যেমন টেক্সাস। আর কানসাসের ক্ষেত্রে এমন জয় পেতে প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে যাবে।
এমনটা ঘটলে ডেমোক্র্যাটরা শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণই পাবে না, এক বা দুটি আসনের ব্যবধানও হাতে থাকবে তাদের। এতে আলাস্কায় সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানো যেতে পারে। সেখানে ব্যালটে একই নামের দুই ড্যান সালিভান থাকার বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের করা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন এক বিচারক।
ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের ভোটারদের উপস্থিতি বাড়িয়ে এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের বড় ব্যবধানে সমর্থন পেয়ে এমন জয় অর্জন করতে পারে। এতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটার ও তরুণ পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের যে সমর্থন বেড়েছিল, তা উল্টে যেতে পারে। রিপাবলিকান ভোটারদের কেউ কেউ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করতে পারেন, আবার কেউ ভোট দিতে না-ও যেতে পারেন।
এ ধরনের ফল হবে ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য বড় ধরনের প্রত্যাখ্যান। এর মধ্য দিয়ে পরবর্তী দুই বছর নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে। আইন প্রণয়নের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকবে দলটির হাতে, আর এমন এক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাদের লড়াই চলবে, যিনি সাধারণত সংঘাত থেকে পিছিয়ে আসেন না।
ভোটের ফল আসার সময় যেসব প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে :
ফ্লোরিডায় প্রতিনিধি পরিষদের লক্ষ্যভিত্তিক আসনগুলো ধরে রাখতে পারলে এবং নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও কেনটাকির কয়েকটি রিপাবলিকান আসন নিজেদের দখলে নিতে পারলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য ভালো রাত হবে। সাউথ ক্যারোলাইনায় সিনেটের আসনটি জিততে পারলে তাদের সাফল্য আরও বড় হবে।
২. ডেমোক্র্যাটদের সীমিত অগ্রগতি
হয়তো জনমত জরিপ পুরোপুরি ভুল হবে না, আবার পুরোপুরি সঠিকও হবে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে সহজে জেতা সম্ভব এমন যথেষ্ট আসন ডেমোক্র্যাটরা পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান খুব বেশি হবে না।
এর অর্থ, আইন পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ভোট নিশ্চিত করতে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতাদের নিয়মিতভাবে দলের বাম ও মধ্যপন্থী অংশের প্রান্তিক সদস্যদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে।
এই কাল্পনিক পরিস্থিতিতে সিনেটের এক বা দুটি আসনই শুধু নিজেদের দখলে নিতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। উদাহরণ হিসেবে নর্থ ক্যারোলাইনার আসনটি তাদের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। তবে রক্ষণশীলদের শক্ত ঘাঁটির আসনগুলো জেতা তাদের নাগালের বাইরে থেকে যেতে পারে।
হয়তো মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারাতে পারবে না ডেমোক্র্যাটরা। অথবা বামপন্থী প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ মিশিগানকে ডেমোক্র্যাটদের দখলে রাখতে ব্যর্থ হবেন।
আলাস্কায় একই নামের দুই ড্যান সালিভানকে ঘিরে বিতর্কের কারণে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলাও হেরে যেতে পারেন।
‘ডেমোক্র্যাটদের সীমিত অগ্রগতি’র এই পরিস্থিতি তৈরি হতে হলে আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের যে বড় উপস্থিতি দেখা গেছে, ভোটের দিন রিপাবলিকানদের ভোটার উপস্থিতি বেড়ে তার সমান হতে হবে।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে নিজের সমর্থকদের উজ্জীবিত করার ট্রাম্পের প্রচেষ্টা তার দলকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে। জরিপে যেসব আসনের লড়াইয়ে দুই প্রার্থীর ব্যবধান ছিল ত্রুটিসীমার কাছাকাছি, সেগুলোতে দুই দলই মিশ্র ফল পেতে পারে।
এর ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ দুই দলের হাতে যেতে পারে। আর তাতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোটের ফল আসার সময় যেসব প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে:
ফ্লোরিডা যদি সব পর্যায়ে স্বাচ্ছন্দ্যে রিপাবলিকানদের দখলে থাকে। ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভানিয়ার মতো জায়গায় ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকটি আসন পেতে পারে, তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে না পড়লে এই পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলবে।
৩. রিপাবলিকানদের জন্য ভালো রাত
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ধরে রাখবে রিপাবলিকানরা।
এমনটা ঘটতে হলে জনমত জরিপের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হতে হবে। অতীতে এসব জরিপ ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কম করে দেখিয়েছে। পাশাপাশি, যেসব আসনে দুই দলের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি, সেগুলোর অধিকাংশেই জয় পেতে হবে রিপাবলিকানদের।
রয়টার্সরিপাবলিকান ভোটারদের শুধু অপ্রত্যাশিতভাবে বিপুলসংখ্যায় ভোট দিতে হবে তা-ই নয়; ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছেন বলে মনে হওয়া স্বতন্ত্র ও হিস্পানিক ভোটারদেরও শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে ভোট দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের জন্য নিশ্চিত বিষয় তো নয়ই, বরং তা নির্ভর করতে পারে ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর। সেখানে ডাকযোগে আসা ব্যালট গণনায় কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
শেষ পর্যন্ত টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো জায়গায় নিজেদের অনুকূলে কংগ্রেসনাল আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টার কারণে সামগ্রিকভাবে সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে রিপাবলিকানরা।
সিনেটের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোর সব আসনেই জিততে পারে রিপাবলিকানরা। পাশাপাশি, মিশিগানেও জয় পেতে পারে তারা। ভোটের আগে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল।
নর্থ ক্যারোলাইনা ধরে রাখতে না পারলেও কিংবা ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মিনেসোটা বা নিউ হ্যাম্পশায়ারে জিততে না পারলেও রিপাবলিকানরা অন্তত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের চাপে রাখতে পারে। এই আসনগুলো এ বছরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কেন্দ্রের কিছুটা বাইরে।
এমন ফল হলে বুধবার সকালে ট্রাম্প নতুন করে নির্বাচনী ম্যান্ডেট পাওয়ার দাবি করতে পারেন। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে তিনি অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারেন।
ভোটের ফল আসার সময় যেসব প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে :
ফ্লোরিডার সিনেটর অ্যাশলি মুডি এবং ওহাইওর সিনেটর জন হাস্টেড অনায়াসে পুনর্নির্বাচিত হলে। পেনসিলভানিয়া ও ভার্জিনিয়ায় প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলো ধরে রাখতে পারলে এবং নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা আসন ছিনিয়ে নিতে পারলে রিপাবলিকানদের জন্য ভালো ফলের ইঙ্গিত মিলবে।
সূত্র : বিবিসি