Image description

ব্রাসেলসে একটি ডেস্কে বসে দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান লিখছেন ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মায়া গুরদেল। তার লেখা স্লোগানটি হলো, ‘আমরা পুড়লে, তোমরাও আমাদের সঙ্গে পুড়বে!’ ২০১২ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’ থেকে নেওয়া এই স্লোগান বিশ্বজুড়ে অনেক তরুণ আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জেন-জির নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের পেছনে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন এটি।

প্যারিসের উপকণ্ঠ থেকে বেলগ্রেডের রাজপথ—হাজারো মানুষ নেমে এসেছেন রাস্তায়।

বিক্ষোভকারীদের দাবি নানা ধরনের হলেও সেগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব বলে মনে করা, জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি, আবাসনসংকট এবং তাদের কথা শোনা হচ্ছে না—এমন অনুভূতি থেকে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বিক্ষোভ সহিংসতায়ও রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শুধু ফ্রান্সেই হাজারো দোকান ভাঙচুর বা লুটপাটের শিকার হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ছুড়েছে স্টান গ্রেনেড ও ব্যবহার করেছে জলকামান।

তবে এই সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ বাস্তব পরিবর্তনও এনেছে। দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার অভিযোগে প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচ।

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী স্তাশা পিলেটিচ বললেন, ‘ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আমরা স্বস্তি ও স্বাধীনতার অনুভূতি পেয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটি বিজয়ের অনুভূতি। আমার মনে হচ্ছে, অবশেষে আমরা বিক্ষোভের পর্যায় থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছি।’

‘ক্ষোভের বিস্ফোরণ’

বিক্ষোভে উত্তাল মিলানের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কিয়ারা মনে করেন, ‘মানুষের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে আন্দোলন তৈরি হয়েছে, তাতে অংশ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষোভই সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।’

তিনি বললেন, ‘শাসকগোষ্ঠী আমার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি করেছে, তা হলো ভবিষ্যৎ কল্পনা করার, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেওয়া।’

কিয়ারার ভাষ্য, ইতালির শিক্ষার্থীরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং ভবনগুলোও ভেঙে পড়ার অবস্থায়।

তার মতে, ‘এসবের পরিণতি হলো এমন একটি কম বেতনের চাকরির সম্ভাবনা, যার জন্য আমরা যোগ্যতা অর্জন করিনি। আর থাকতে হবে ছোট, অতিরিক্ত ব্যয়বহুল কোনো বাড়িতে—সম্ভবত নিজের শহর থেকে দূরে, যেখানে আমরা থাকতে চাইনি।’

বিশ্বজুড়েই জেন-জির নেতৃত্বে বিক্ষোভ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম নিজেদের দাবি তুলে ধরতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ, ২০২৫ সালে নেপাল এবং চলতি বছর ভারতে আন্দোলনের পর এবার ইউরোপ হয়ে উঠেছে বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্র।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক জরিপ অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের ৪০ শতাংশের উদ্বেগের বড় কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯ কোটি ২৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা। এই বয়সীদের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ এ ঝুঁকিতে ছিলেন। বিপরীতে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
২৪ অক্টোবর আলবেনিয়ার তিরানায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় এক বিক্ষোভকারীর কাছে একটি আতশবাজি সদৃশ বস্তু বিস্ফোরিত হয়— রয়টার্সতরুণেরা এমন এক বয়স্ক প্রজন্মের আর্থিক বোঝা বহন করা নিয়েও উদ্বিগ্ন, যারা সাধারণত বেশি সংখ্যায় ভোট দেন। ফ্রান্সের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওএফসিইর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। অথচ দেশের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশের মালিক তারা।

ফ্রান্সে সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত পেনশন। জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং অবসরের বয়স বাড়ানো বা পেনশন সুবিধা কমানোর বিরোধিতার কারণে অর্থনৈতিক উৎপাদনের ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে যাচ্ছে এ খাতের ব্যয়।

তবে এটি এখনো গ্রিস ও ইতালির চেয়ে কম। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পেনশনে জাতীয় আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় করে এই দুটি দেশ—জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ। বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়া, চিলি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারি পেনশনে ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশেরও কম।

‘ইউরোপের তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ’

প্যারিসের উত্তরের একটি উপশহরের ১৭ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থী বিলাল নারজিসি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘শোচনীয়’ পরিবেশ ও কর্মীসংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন।

তিনি বলছিলেন, ‘আগে স্কুলে ইঁদুর ছিল।’ গত বছর স্কুলের আঙিনার ওপরের ছাদ ধসে পড়লে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে এতে কেউ আহত হননি বলে জানান তিনি।

নারজিসির মতে, বিক্ষোভ দেখিয়েছে, ‘ইউরোপের তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ।’ তিনি আরও বললেন, ‘একটি বিষয়ে আমরা সবাই একমত—তরুণদের সঙ্গে অতিরিক্ত শিশুসুলভ আচরণ করা হয়। আমাদের কথা যথেষ্ট শোনা হয় না।’

ফরাসি সরকারের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পেনশন খাতে ব্যয় জিডিপির তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। একই সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৩২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে পেনশনে। ফলে শিক্ষার অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ কমে গেছে।

বেলজিয়ামে স্কুলের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন গুরদেলও।

তিনি বললেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে চেষ্টা করেছিলাম। কেউ আমাদের কথা শোনেনি। মানুষ যখন আবর্জনায় আগুন দিতে শুরু করল বা এ ধরনের কাজ করল, তখনই কেবল গণমাধ্যম ও ক্যামেরা আমাদের দিকে নজর দিল।’

বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য, যুদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে এই সপ্তাহান্তে জার্মানিতে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

আলবেনিয়াতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ রাজধানী তিরানায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে অন্যান্য শহরেও পৌঁছায়। দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।

১৯ বছর বয়সী স্থাপত্যের শিক্ষার্থী জাইকে কুর্তি বললেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী ১৩০ দিন ধরে আমাদের কথা শোনেননি।’

তার ভাষায়, ‘আলবেনিয়ার কোনো শিক্ষার্থীকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, সে নিজের ভবিষ্যৎ কোথায় দেখে, সবাই বলবে—দেশের বাইরে।’ তার যুক্তি, নিজ দেশে প্রতিভা থাকলেও ‘যার প্রভাবশালী যোগাযোগ আছে, সে-ই সব সময় আপনাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে।’

সার্বিয়ার শিক্ষার্থী আন্দোলন এমন একটি সাফল্য অর্জন করেছে, যা ইউরোপের অন্যান্য রাজধানীর বিক্ষোভকারীরা কেবল স্বপ্নেই দেখতে পারেন।

তবে এবার সামনে সরকার পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। শিক্ষার্থী কিংবা তাদের প্রার্থী— কারোরই সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই।

আরেক বিক্ষোভকারী লুকা স্তোয়াকোভিচ অবশ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান না। তিনি বললেন, ‘রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা আমাদের কোথায় নিয়ে গেছেন, তা তো আমরা দেখেছি।’