সার্বিয়ায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে জন্ম একটি আন্দোলনের। শুরুতে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় নিয়মিত বিক্ষোভে। দুর্নীতি ও সরকারি অবহেলার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে জাতীয় আন্দোলন।
আর অবশেষে দুই বছরেরও কম সময়ে আলেক্সান্দার ভুচিচের ১৪ বছরের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তার সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) জনসমর্থন ক্রমেই কমেছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের গণভোটে পরিণত হয়।
বেলগ্রেড থেকে নোভি সাদ ও নিশ—সবখানেই উচ্ছ্বসিত পরিবেশ দেখা গেছে। সমর্থকেরা শহরের কেন্দ্রস্থলে কিংবা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’–এর সদর দপ্তরের সামনে জড়ো হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, ‘সার্বিয়া স্বাধীন।’
সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল তথাকথিত ‘চাচিল্যান্ডের’ পতন। ভুচিচপন্থী এই তাঁবুশিবির ১৮ মাস আগে মধ্য বেলগ্রেডে সার্বিয়ার পার্লামেন্টের সামনে পাইওনিয়ার্স পার্কে স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানকার ধাতব বেড়া ভেঙে ফেলা হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘ভুচিচ বিদায় নিচ্ছেন।’
শিক্ষার্থীরা যেভাবে বদলে দিলেন সার্বিয়াকে
এই আন্দোলনের কোনো স্পষ্ট নেতা নেই। রাজনীতির জগতেও তাদের নেই পূর্ব অভিজ্ঞতা। তবু ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্টস উইন’ আন্দোলনটি সার্বিয়ার সমাজের বিভিন্ন স্তরের সরকারবিরোধী ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।
পার্লামেন্টের ২৫০টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছিল তারা। তবে প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন না কোনো শিক্ষার্থী।
আলেকসান্দার ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করার পর তার ছবি পদদলিত করেন শিক্ষার্থীরা— রয়টার্সগত সপ্তাহে বেলগ্রেডের উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন আন্দোলনের প্রধান প্রার্থী ও হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সর্দানোভিচ। তিনি বলেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে। ‘এই উদ্দীপনাকে থামানো অসম্ভব।’
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘গত সরকারের শাসনামলে আমাদের নাগরিকদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া সভ্য সমাজের মৌলিক মূল্যবোধগুলো আমরা ফিরিয়ে দিতে চাই।’
আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরের কংক্রিটের ছাউনি ধসে পড়ে। এতে ১৬ জন নিহত হন।
এই দুর্ঘটনাকে ব্যাপক দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সমালোচকেরা রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজে গুরুতর ত্রুটির জন্য এমন এক প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন, যিনি প্রকল্পটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে নিজের সম্পৃক্ততা তুলে ধরেছিলেন।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটি নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হেলেনা ইভানভ বললেন, ‘ছাউনিটি ধসে পড়ার ঘটনাই ছিল সহ্যের শেষ সীমা।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল আবেগঘন এক মুহূর্ত, যা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে। এরপর দেশজুড়ে পদযাত্রা ও বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু হয়। কোনো বিরোধী দল আগে যেভাবে সার্বিয়ার মানুষের মন ও হৃদয় জয় করতে পারেনি, এই আন্দোলন তা পেরেছে।
বিক্ষোভ থেকে ভুচিচকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের রাস্তায় ন্যায়বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক বিক্ষোভ দিয়ে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। দ্রুত তা জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এর বিস্তার ঘটে এবং কৃষক, অভিনেতা ও বিচারকদের মতো সমাজের আরও অনেক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হন।
ভুচিচের এসএনএস পার্টি যে চাপে পড়েছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কথা বলে পদত্যাগ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
২০২৫ সালের মার্চে বেলগ্রেডে সার্বিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্বহীন শিক্ষার্থী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের সংগঠিত করতে শিক্ষার্থী সমাবেশ বা ‘প্লেনাম’ গড়ে তোলে।
গত মাসে ভুচিচ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা প্রস্তুত ছিলেন।
হেলেনা ইভানভ বললেন, ‘তারা আবেগের সেই জোয়ারকে কার্যকর সংগঠনে রূপ দিতে পেরেছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটের নিরপেক্ষতা কীভাবে রক্ষা করতে হয়, তা মানুষকে শিখিয়েছেন তারা।’
জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের বলকান কর্মসূচির প্রধান গোরদানা দেলিচ বললেন, ‘বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, আইন দিয়ে মানুষকে শাসন করা নয়।’
তার মতে, রবিবারের ভোট কার্যত একটি গণভোটে পরিণত হয়েছিল।শুরুতে ভুচিচ বিক্ষোভকারীদের ‘সৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন’ বলে প্রশংসা করার চেষ্টা করেন। তবে নির্বাচনের আগে তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীরা সার্বিয়াকে ‘ধ্বংস করতে’ চাইছেন।
পরাজয় স্বীকার করার পরও রবিবার রাতে তিনি ভিত্তিহীন অভিযোগ করেন যে আন্দোলনকারীরা নাম উল্লেখ না করা কয়েকটি ‘ইউরোপীয় দেশ’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেটের’ সমর্থন পেয়েছেন।
এখন সার্বিয়া চালাবেন কারা?
একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষার্থীরা নিজেরা সার্বিয়া পরিচালনা করবেন না। কারণ, তারা নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এটি ছিল হিসাব করে নেওয়া সিদ্ধান্ত। কারণ, রাজনৈতিক বা পেশাগত জীবনে খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই—এমন প্রার্থীদের ভোটাররা সম্ভবত সমর্থন করতেন না।
ভুচিচের পরাজয় উদযাপনের উদ্দেশ্যে স্লাভিজা স্কোয়ারে সমবেত হওয়া "স্টুডেন্ট লিস্ট - স্টুডেন্টস উইন" সমর্থকদের ড্রোন থেকে নেওয়া দৃশ্য— রয়টার্সআন্দোলনের প্রধান প্রার্থী ছিলেন নোভি সাদের হৃদ্রোগবিদ্যার অধ্যাপক ইলিয়া সর্দানোভিচ। তবে তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে খুব একটা দেখা হচ্ছে না।
সম্ভাব্য নেতা হিসেবে আলোচনায় আসা প্রার্থীর সংখ্যাও কম।
স্বাধীন জনমত জরিপকারী সংস্থা সেসিআইডি ও ইপসোসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ থেকে ১৪০ জন পার্লামেন্টের আসন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেজান বোদিরোগা (তালিকায় ২৪তম), খ্যাতিমান অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ (৮ম), অপেরা সংগীতশিল্পী নিকোলা মিকিচ (৪৬তম) এবং সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেজান শোশকিচ (২৭তম)। তালিকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধ্যাপকও রয়েছেন।
শীর্ষ পদে শোশকিচের নাম আলোচনায় এসেছে। অর্থনীতিতে কী ধরনের সংস্কার আনবেন, সে বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সরকারপন্থী গণমাধ্যমে তার ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে।
তাদের কর্মসূচি কী?
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব হবে কার্যত একটি ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, তারা এমন ব্যক্তিদের খুঁজেছেন, যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ‘দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের কাজ করবেন এবং কেন সেখানে এসেছেন, তা ভুলে যাবেন না’।
১১ দফা কর্মসূচিতে আন্দোলনটি যেসব পদক্ষেপ নিতে চায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করে দুর্নীতি নির্মূল করা।
- বিক্ষোভ দমনে নিয়ম ভঙ্গ করেছেন কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত—এমন কর্মকর্তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া।
- সার্বিয়ার ভারসাম্যহীন গণমাধ্যমব্যবস্থার সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা।
- রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ বন্ধ করা।
ভুচিচ ও তার এসএনএস পার্টি দুর্নীতি এবং গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
শিক্ষার্থী ছাড়াই কি এটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থাকবে?
শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত না হলেও সার্বিয়ার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিগুলো তারাই দিয়েছেন। তাই ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য তাদের ওপর চাপ থাকবে।
আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য শিক্ষার্থীদের বেছে নেওয়া সাধারণ সার্বীয় নাগরিকদের সম্পর্কে তাদের বক্তব্য, ‘গত এক বছর ধরে রাস্তায় আমরা যে সংগ্রাম চালিয়ে আসছি, তার একটি অংশকে এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছে।’
রবিবার সন্ধ্যায় দেওয়া বক্তব্যে ভুচিচ তার দলের সমর্থকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা সার্বিয়ার দুই বছরের জীবন নষ্ট করেছে। তবে তাদের ধারণার চেয়েও দ্রুত পরাজিত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি