ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যয়বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিবাদে দেশে দেশে বিক্ষোভে নামছেন কিশোর-তরুণেরা।
তবে এটি ইউরোপজুড়ে সমন্বিত কোনো একক আন্দোলন নয়। দেশভেদে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে তাদের উদ্বেগের জায়গাগুলোতে মিল রয়েছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা ও বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে, তখন সরকারগুলো শিক্ষাখাতে যথেষ্ট অর্থ দিচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের সূচনা ফ্রান্সে
টাইমস অব ইন্ডিয়ার বৃহস্পতিবারের (৮ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিস অঞ্চলে এ আন্দোলনের শুরু। পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবলের অভাবের প্রতিবাদে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা বিক্ষোভে নামেন। দ্রুতই তা ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রবেশপথ আটকে দিতে শুরু করেন। পরে তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও যোগ দেয়।
অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে তার জায়গায় বিকল্প শিক্ষক না দেওয়া, দীর্ঘ সময় ক্লাস, জরাজীর্ণ ভবন এবং ধনী ও দরিদ্র এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈষম্য—এসব নিয়ে অভিযোগ তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিব্যবস্থা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অতিরিক্ত চাপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা।
আন্দোলনের পরিসরও দ্রুত বেড়েছে। আন্দোলন শুরুর পর সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ ছাড়া শত শত স্কুলের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের লঁস শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত হারানোর ঘটনায় পুলিশের আচরণও বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে স্টান গ্রেনেড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয় ফরাসি সরকার। পুলিশের আচরণ নিয়েও শুরু হয়েছে তদন্ত।
ফ্রান্সে আর্থিক সংকটের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ চলছে। বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে চাপে রয়েছে দেশটির সরকার। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগের দাবি জানাচ্ছেন।
বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগ দূর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স সরকার। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা শুধু আশ্বাস নয়; বাস্তব পরিবর্তন চান।
বেলজিয়াম থেকে ইতালি ও গ্রিস
টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও পৌঁছেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরে শত শত শিক্ষার্থী রাস্তায় নামেন। শিক্ষা ব্যয়বৃদ্ধি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং পড়াশোনার উপকরণে সীমিত সুযোগের প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করেন।
এরই মধ্যে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই আন্দোলনের সঙ্গে চলতি বছরের শুরুর দিকে ব্রাসেলসে হওয়া বিক্ষোভের মিল রয়েছে। তখন বেলজিয়ামে ফরাসিভাষী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি বাড়ানোসহ প্রস্তাবিত শিক্ষা সংস্কারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়।
বেলজিয়ামের শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যেই তাদের বিক্ষোভের সঙ্গে সীমান্তের ওপারে ফ্রান্সে চলা আন্দোলনের যোগসূত্রের কথা বলছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, অন্য দেশগুলোর তরুণ বিক্ষোভকারীদের কাছে ফ্রান্সের আন্দোলন দ্রুত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
এদিকে ইতালিতে তুরিন ও রোমের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ‘ফ্রান্সের মতো করি’ স্লোগানে স্কুলে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন।
অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগ তাদের। ইতালির শিক্ষার্থীরা ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্যারিসেও গেছেন।
গ্রিসেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। দেশটির শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে স্কুলে বিভিন্ন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সমাবেশ, ক্লাস বর্জন, বিক্ষোভ এবং প্রয়োজনে স্কুলে অবস্থান কর্মসূচি। তাৎক্ষণিক দাবিগুলো দেশভেদে ভিন্ন হলেও মূল দাবি একই—শিক্ষাখাতে সরকারের আরও বেশি বাজেট বরাদ্দ।
বৃহত্তর ইউরোপীয় সংকট
বিক্ষোভ শুধু স্কুলকেন্দ্রিক নয়। আয়ারল্যান্ডে হাজারো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ডাবলিনে টিউশন ফি, উচ্চশিক্ষায় সরকারি অর্থায়ন এবং আবাসন ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। জার্মানিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো শিক্ষাখাতে আরও বিনিয়োগ, শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো এবং আরও ন্যায্য শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।
অস্ট্রিয়াতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি আগামী তিন বছরের বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট থেকে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করার পর শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে এসব বিক্ষোভ ইউরোপজুড়ে বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারগুলো যখন বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের বাড়তি ব্যয় সামলানোর চেষ্টা করছে, তখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষাখাতের কর্মীরা এমন সেবায় আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন, যা তাদের ভাষায় এরই মধ্যে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে।
সরকারগুলো যখন বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ ঋণ নেওয়ার খরচ সামাল দিতে ব্যস্ত, তখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষাখাতের কর্মীরা এমন সব সেবায় আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন, যা এরই মধ্যে চরম চাপের মুখে রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে এর অর্থ এই নয়, ইউরোপজুড়ে সমন্বিত কোনো শিক্ষার্থী আন্দোলন চলছে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাৎক্ষণিক দাবি রয়েছে।
তবে ফ্রান্সের বিক্ষোভ অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের জায়গাগুলোতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য মিল।
ইউরোপের অনেক তরুণের প্রশ্ন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তাদের নানা সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। আগামী দিনে শিক্ষাব্যবস্থা আরও ভালো করতে সরকারগুলো কি যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করবে?