এক দশক আগে যে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গিয়েছিল ব্রিটেন, সেই দরজায় আবার কড়া নাড়তে পারে লন্ডন। ব্রেক্সিটের প্রশ্নে বহুদিনের রাজনৈতিক ‘রেড লাইন’ পুরোপুরি মুছে দেননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য দরজাটিও সম্পূর্ণ বন্ধ করলেন না। পরবর্তী নির্বাচনে লেবার পার্টির ইশতেহারে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার প্রতিশ্রুতি থাকবে কি না, এমন সরাসরি প্রশ্নে তার উত্তর, ‘ওগুলো অন্য দিনের বিষয়।’ দ্য গার্ডিয়ানের মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতির এই নতুন সূক্ষ্ম সুর।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাওয়ার পথে সাংবাদিকেরা বার্নহ্যামকে প্রশ্ন করেছিলেন, পরবর্তী লেবার ইশতেহারে ব্রেক্সিট প্রত্যাহার বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের প্রতিশ্রুতি থাকবে না, এমন নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারেন কি না। সরাসরি ‘না’ না বলে প্রধানমন্ত্রী জানান, তার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য চলতি বছরের শেষ দিকে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ বৈঠক আয়োজন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের শুরু করা সম্পর্ক পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।
বার্নহ্যামের ভাষায়, গত দশকের শুরুতে ইউরোপের সঙ্গে যে ‘সেতুগুলো ভেঙে গিয়েছিল’, স্টারমার সেগুলো পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। এখন প্রয়োজন সেই সম্পর্ককে ‘পরবর্তী স্তরে’ নিয়ে গিয়ে এমন বাস্তব চুক্তি করা, যা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। আলোচনায় বাণিজ্যের পাশাপাশি তরুণদের পড়াশোনা ও কাজের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে সহজ চলাচলের বিষয়টিও থাকবে।
বার্নহ্যাম এখনই অবশ্য আগের লেবার সরকারের কয়েকটি ‘রেড লাইন’ ভাঙছেন না। পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত একক বাজার, শুল্ক ইউনিয়ন কিংবা অবাধ চলাচলে ফেরার কোনও তাৎক্ষণিক পরিকল্পনার কথা তিনি বলেননি। কিন্তু পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য একেবারে বন্ধও করেননি। এর আগে তিনি ব্রেক্সিটকে ব্রিটেনের জন্য ক্ষতিকর বলেছিলেন, যদিও দেশকে আবার পুরনো বিভাজনের রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটেই প্রথমবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বার্নহ্যাম। সেখানে বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে ইউরোপের প্রস্তাবিত ‘ইউরোপে তৈরি’ শিল্পনীতি। চীনা যন্ত্রাংশ ও উৎপাদনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপে তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যেই এই নীতি তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হওয়ায় দেশটির গাড়ি ও যন্ত্রাংশ নির্মাতারা এই সুবিধার বাইরে পড়ে যেতে পারেন। লন্ডনের আশঙ্কা, এমন হলে ব্রিটিশ গাড়িশিল্পে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। শুধু ব্রিটেন নয়, ইউরোপীয় সরবরাহব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়বে, কারণ দুই পক্ষের গাড়িশিল্প বহু বছর ধরে গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে গাড়ি ও যন্ত্রাংশের বার্ষিক বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি ইউরো। ফলে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন শিল্পনীতি থেকে বাদ দিলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সরবরাহশৃঙ্খলে অতিরিক্ত বাধা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছে ব্রিটিশ গাড়িশিল্প।
ফন ডার লেয়েনের সঙ্গে বৈঠকে তাই ব্রিটেনকে এই ব্যবস্থায় ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দেবেন বার্নহ্যাম। তাঁর বক্তব্য, ইউরোপের শিল্পনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত চিনের উপর কৌশলগত নির্ভরতা কমানো, ব্রিটেনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য প্রাচীর তৈরি করা নয়।
বার্নহ্যামের কথায়, ‘আমরা আপনাদের শত্রু নই, আমরাই সমস্যা নই।’ তাঁর যুক্তি, ব্রিটেনকে বাদ দিলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চলমান প্রচেষ্টাতেও নতুন বাধা তৈরি হবে।
বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের উদ্বেগও নতুন নয়। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা ইতিমধ্যে ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছে যুক্তি দিয়েছেন, সরবরাহব্যবস্থা এবং শিল্প উৎপাদনের বাস্তবতায় ব্রিটেনকে ইউরোপের বাইরে আলাদা করে দেখা কঠিন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ ব্রিটেনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তুলনামূলক ইতিবাচক হলেও সদস্যদেশগুলোর মধ্যে এখনও পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
এই আলোচনাই বার্নহ্যামের ইউরোপ নীতির প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। একদিকে তিনি ব্রেক্সিটের বর্তমান রাজনৈতিক সীমারেখা বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে ব্যবসা ও শিল্পের স্বার্থে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় অর্থনীতির আরও কাছাকাছি টানছেন।
২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ব্রিটেন। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ে দেশটি। ছয় বছর পর সেই সম্পর্ক আবার নতুন এক সন্ধিক্ষণে।