২০১৭ সালের আগস্টে বিবিসির হার্ডটক অনুষ্ঠানে স্টিফেন সাকুর আল জাজিরার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোস্তফা সোয়াগকে প্রশ্ন করেছিলেন, এই নেটওয়ার্ক চালাতে বছরে কেমন খরচ হয়।
সোয়াগ বললেন, সেটা বলার অনুমতি তার নাই।
নিষেধাজ্ঞা কার? নির্দিষ্টভাবে কারোই না। সোয়াগ বললেন, কিন্তু নানা বিষয় আছে, বাজেট কমিটি ঠিক করেছে এই মুহূর্তে অঙ্কটা প্রকাশ করা হবে না।
তারপর নিজে যোগ করলেন, দর্শকের যা জানা দরকার তা হলো, বাজেটের ৯০ শতাংশই সম্ভবত সরকারের। পর্দায় যা দেখা যায়, পুরাটাই কাতার রাষ্ট্রের টাকায়।
সোয়াগ তখন চার বছর ধরে আল জাজিরা নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন, আরও আট বছর চালাবেন। তিনি জানতেন প্রতিষ্ঠানের খরচ কত। তিনি এটাও জানতেন যে সাকুর একজন সহকর্মী, স্বচ্ছতার কথা বলছেন, এবং জবাবটা ভালো দেখাবে না।
তবু তিনি বললেন না। এই লেখা সেই না-বলার ভেতরে যে প্রতিষ্ঠান আছে, তাকে নিয়ে।
আল জাজিরার সাংবাদিকতা সত্যিকারের সাংবাদিকতা। এই প্রতিষ্ঠান যা কিছু প্রকাশ করেছে, তার বড় অংশ পরবর্তীতে আদালতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থায়, এমনকি যেসব লেখা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সেইসবও রাষ্ট্রের সরকারি নথিতে টিকে গেছে।
আবার এই সাংবাদিকতা চলে কাতার রাষ্ট্রের টাকায়, এবং কাতার এটা সচল রাখে কারণ এটা তার কূটনীতির কাজে লাগে।
রাষ্ট্রের টাকায় সংবাদমাধ্যম চালানোর কাজ শুধু কাতারই করে না।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের খরচের এক-তৃতীয়াংশের বেশি দেয় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর, এবং সরকারি বাজেটে কারণ হিসেবে সোজাসুজি লেখা থাকে ‘সফট পাওয়ার’।
কাতারকে যা আলাদা করে, সেটা হলো সে কোনো হিসাব দেয় না।
এই দুই দিকের যে কোনো একটা ধরে অনুসন্ধান চালানো সহজ। শুধু সাংবাদিকতার দিকটা দেখলে লেখাটা প্রশংসামূলক হবে, আর শুধু টাকার দিকটা দেখলে অভিযোগ।
আল জাজিরাকে বুঝতে হলে দুইটাই একসঙ্গে দেখতে হয়, এবং এই লেখায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে।
➖
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে বিবিসির আরবি টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যায়। চ্যানেলটা চলত সৌদি অর্থে, অরবিট নামে এক কোম্পানির মাধ্যমে, যার মালিক ছিলেন বাদশাহ ফাহাদের চাচাতো ভাই।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে একটা তথ্যচিত্র আটকাতে চাওয়া হলো, বিবিসি নিজ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ছাড়তে রাজি হলো না, দেড় বছরের মাথায় চ্যানেলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল।
এর ফলে লন্ডনে একদল অভিজ্ঞ আরব সাংবাদিক হঠাৎ বেকার হয়ে গেলেন।
কাতারের নতুন আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানি তাদেরকে দোহায় নিয়ে গেলেন। ১৯৯৬ সালের ১ নভেম্বর আল জাজিরার সম্প্রচার শুরু হলো, প্রথমে দিনে ছয় ঘণ্টা করে। প্রথম দিকের কর্মীদের মধ্যে একশোর বেশি কর্মী এসেছিলেন সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া বিবিসি আরবি চ্যানেল থেকে।
টাকা দিলেন আমির নিজে, ৫০ কোটি রিয়াল, পাঁচ বছরের জন্য। কথা ছিল ২০০১ সালের মধ্যে বিজ্ঞাপনের আয়ে চ্যানেল নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
দাঁড়ায় নাই। সৌদি আরব আল জাজিরায় বিজ্ঞাপন দেওয়া কোম্পানিগুলোকে নিজের বাজারে ঢুকতে দিল না, এবং সৌদি বাজার ছাড়া আরব বিজ্ঞাপনের বাজার বলে কিছু নাইও।
পাঁচ বছরের সময়সীমা পার হয়ে গেল। রাষ্ট্র টাকা দিতে থাকল, এবং সেই থেকে দিয়ে যাচ্ছে। যে ব্যবস্থা সাময়িক হওয়ার কথা ছিল, সেটা স্থায়ী হয়ে গেল।
প্রতিষ্ঠানের পরের ত্রিশ বছরের পরিক্রমার হিসাব এই একটা ঘটনায় নিহিত আছে।
➖
আল জাজিরার প্রথম স্লোগান ছিল "মত এবং অন্য মত"। আজকে এটা শুনতে সাধারণ লাগে।
১৯৯৬ সালের আরব টেলিভিশনে এর মানে ছিল নিষিদ্ধ দলের নেতাদের স্টুডিওতে ডাকা, ইসরায়েলের নির্বাচন কভার করা, একজন ইসরায়েলিকে হিব্রু ভাষায় কথা বলতে দেওয়া।
এর আগে কোনো আরব চ্যানেল এইসব করে নাই, কারণ কোনো আরব সরকার এইসব হতে দিত না।
প্রায় প্রতিটা আরব সরকার কোনো না কোনো সময় কাতারের কাছে অভিযোগ করেছে। চ্যানেলটা তবু চলেছে, কাতার অভিযোগ শুনেছে, কিন্তু কিছু করে নাই।
একটা যুদ্ধ আরব বিশ্বের বাইরে আল জাজিরাকে পরিচিত করালো।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বাগদাদ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করার মতো সংবাদদাতা ছিল শুধু সিএনএনের, পৃথিবী সেই যুদ্ধ দেখেছিল আমেরিকান ক্যামেরায়।
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা শুরু হলে দেখা গেল কাবুলে সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি আছে একজন বিদেশি সংবাদদাতার, তিনি আল জাজিরার তায়সির আলুনি।
এবং সিএনএনকেও আফগানিস্তানের সরাসরি ফুটেজের জন্য দোহার সঙ্গে চুক্তি করতে হলো। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়জুড়ে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় উপস্থিত একমাত্র টেলিভিশন সম্প্রচারক ছিল আল জাজিরা।
৩০ অক্টোবর ওয়াশিংটনে আল জাজিরার সংবাদদাতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ডকে আফগান শিশুদের হতাহতের ছবি নিয়ে প্রশ্ন করলে রামসফেল্ড বললেন, এই চ্যানেল তালেবানের প্রচারণা ছড়াচ্ছে।
স্টুডিওর বাইরে যে কাজ আল জাজিরাকে আজকের আল জাজিরা বানিয়েছে, সেটা শুরু হয় ২০১১ সালে, আলাদা অনুসন্ধানী ইউনিট গঠনের পর।
এই ইউনিট কাজ করে দীর্ঘ আন্ডারকভার অপারেশনের মধ্য দিয়ে, যেখানে দরকার হলে ভুয়া সংগঠন খোলা হয়, গোপন ক্যামেরা বসানো হয়, এবং ফাঁস হওয়া নথি ঘেঁটে দেখা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বন্দুক আইন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা বন্দুক-অধিকারের নামে ভুয়া সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলো এবং সেই পরিচয়ে তিন বছর আমেরিকান বন্দুক-লবির ভেতরে যাতায়াত করে।
শেষ পর্যন্ত ক্যামেরায় ধরা পড়ে, অস্ট্রেলিয়ার একটা রাজনৈতিক দলের লোকজন ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ), অর্থাৎ আমেরিকার সবচেয়ে বড় বন্দুক-লবির কাছে ২ কোটি ডলার চাইছেন।
সাইপ্রাসে ইউনিটটার হাতে প্রথমে আসে প্রায় ১,৪০০ ফাঁস হওয়া নথি। তারপর ইউনিটের সাংবাদিকরা নিজেদের এক কাল্পনিক চীনা ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, যিনি অর্থপাচারের দায়ে দণ্ডিত।
এই পরিচয়ে তারা যান সংসদের স্পিকার দেমেত্রিস সিলোরিস, সংসদ সদস্য ও আবাসন ব্যবসায়ী খ্রিস্তাকিস জিওভানিস, এবং কয়েকজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ীর কাছে।
দণ্ডিত অপরাধীর নাগরিকত্ব পাওয়া আইনে নিষিদ্ধ, তবু গোপন ক্যামেরায় তারা এই ব্যবসায়ীকে সাইপ্রাসের পাসপোর্ট পেতে সাহায্য করার আশ্বাস দেন। স্পিকার বলেন, দরকার হলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজের দপ্তরে ডেকে সমস্যার সমাধান করবেন।
প্রচারের পর সাইপ্রাস টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট দেওয়ার কর্মসূচি বাতিল করে। ইউনিট নিজের ওয়েবসাইটে জানায়, তারা ব্রিটিশ সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক অফকমের নিয়ম মেনে কাজ করে, এবং গঠনের পর থেকে তাদের তথ্যচিত্র ৪০-এর বেশি পুরস্কার পেয়েছে।
এই ধরনের কাজে খরচ ব্যাপক, এবং সেই খরচ তোলার কোনো বাজার নাই। তিন বছর ধরে আন্ডারকভার লোক রাখা কিংবা ১,৪০০ নথি পড়ে যাচাই করার জন্য কোনো বিজ্ঞাপনদাতা টাকা দেয় না, রেটিংও আসে না।
যে সাংবাদিকতা রাষ্ট্রকে বিব্রত করে, বিজ্ঞাপনের আয়ে তা চালানো যায় না। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, ত্রিশ বছর ধরে যে রাষ্ট্র এই খরচ বহন করে আসছে, বিনিময়ে তার প্রাপ্তি কী।
➖
আল জাজিরার পর্দায় কোনো স্পনসর নাই। কারণ স্পনসর একজন, যিনি নাম দেখান না।
নেটওয়ার্ক নিজে বলে সে "আংশিকভাবে" কাতার সরকারের অর্থে চলে, অনুপাত বছরভেদে বদলায়, উৎসভিত্তিক হিসাব তারা প্রকাশ করে না।
এটা অনুমান না, নিউজগার্ডের লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাব। ত্রিশ বছরে কোনা যাচাই করা বার্ষিক হিসাব প্রকাশিত হয় নাই।
যেটা জানা যায়, সেটা কাঠামো। ২০১১ সালে কাতারি আইনে প্রতিষ্ঠানকে "জনস্বার্থে প্রাইভেট ফাউন্ডেশন" বলে পুনর্গঠন করা হয়। বোর্ড নিয়োগ দেয় মন্ত্রিপরিষদ, অনুমোদন করেন আমির।
যিনি বোর্ডের চেয়ারম্যান, শেখ হামাদ বিন থামের আল থানি, তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা কাতার মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সোয়াগের জায়গায় মহাপরিচালক হন শেখ নাসের বিন ফয়সাল আল থানি। তিনি শাসক আল থানি পরিবারের সদস্য, এবং ২০১৩ সাল থেকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করে রাষ্ট্রদূত পদমর্যাদা পর্যন্ত উঠেছিলেন।
বাজার থেকে নিজের আয় তৈরির চেষ্টাও আল জাজিরা দুইবার করেছিল। প্রথম চেষ্টা ছিল আমেরিকার বাজারে ঢোকা, এবং সেখানে চ্যানেলটা শুরু থেকেই বাধার মুখে পড়ে।
আমেরিকায় টিভি চ্যানেল দর্শকের ঘরে পৌঁছায় ক্যাবল বা স্যাটেলাইট কোম্পানির মাধ্যমে, তারা নিজেদের লাইনআপে না রাখলে চ্যানেলটা দেখার উপায় থাকে না।
২০০৬ সালে আল জাজিরা ইংলিশ চালু হওয়ার কয়েক দিন আগে দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাবল কোম্পানি কমকাস্ট এটা দেখানো হবে কিনা এই আলোচনা থেকে সরে যায়।
ফলে প্রথম দিন আমেরিকার কোনো বড় ক্যাবল কোম্পানিতে আল জাজিরা ইংলিশ দেখা যায় নাই।
পরের বছরগুলোতেও অবস্থা বদলায় নাই, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের মতো হাতে গোনা কয়েকটা জায়গা বাদে আমেরিকার বেশির ভাগ ঘরে আল জাজিরা ইংলিশ পৌঁছায় নাই।
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় হোয়াইট হাউস এবং কংগ্রেসের টিভিতে চ্যানেলটা চলছিল, সাধারণ আমেরিকানকে দেখতে হতো ইন্টারনেটে।
সেই মার্চে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সিনেটে বললেন, আমেরিকায় আল জাজিরার দর্শক বাড়ছে কারণ এটা আসল খবর দেয়, মার্কিন চ্যানেলের মতো বিজ্ঞাপন আর টক-শোর তর্ক না।
একই সময়ে অ্যাকুরেসি ইন মিডিয়া নামে একটা সংগঠন ক্যাবল কোম্পানিগুলোকে পিটিশন দিচ্ছিল চ্যানেলটা না দেখাতে, কারণ "আমেরিকা উগ্র ইসলামের সঙ্গে যুদ্ধে আছে"।
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে আল জাজিরা সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের সহপ্রতিষ্ঠিত কেবল চ্যানেল কারেন্ট টিভি প্রায় ৫০ কোটি ডলারে কিনে নেয়, যেন আমেরিকার ঘরে পৌঁছানোর জন্য চ্যানেলটার কেবল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিগুলো হাতে আসে।
সেই চুক্তির উপর দাঁড়িয়ে ওই বছরের আগস্টে চালু হয় আল জাজিরা আমেরিকা। ঘোষণার দিন টাইম ওয়ার্নার কেবল কারেন্ট টিভিকে নিজের লাইনআপ থেকে বাদ দিল।
যেসব কেবল কোম্পানি চ্যানেলটা প্রচার করতো, সেখানেও দর্শক তেমন আসে নাই, প্রাইমটাইমে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চ্যানেলটা দেখতেন।
তিন বছরের মাথায় আল জাজিরা আমেরিকা বন্ধ হয়ে যায়, চাকরি হারান ৭০০ কর্মী।
নেটওয়ার্কের যে অংশ নিয়মিত আয় আনত, সেটা ছিল খেলার সম্প্রচার। ২০১৩ সালের শেষে ক্রীড়া চ্যানেলগুলোকে আল জাজিরা থেকে আলাদা করে beIN নামে নতুন প্রতিষ্ঠান বানানো হয়, এবং সেটা রাষ্ট্রের সরাসরি মালিকানায় গেল।
ফলে সংবাদ-নেটওয়ার্কের হাতে নিজের আয়ের কোনো উৎস থাকল না, তার পুরো খরচ বহন করে রাষ্ট্র।
আল জাজিরা নিজের এই ব্যবস্থাকে বিবিসি বা ডয়চে ভেলের সঙ্গে তুলনা করে। তাদের যুক্তি, তারাও সরকারি টাকায় চলে, তবু তাদের কেউ ডিপেন্ডেন্ট বলে না।
তুলনাটা যেহেতু আল জাজিরা নিজে করে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার, এবং খতিয়ে দেখলে দেখা যায় বিবিসির বিদেশি সম্প্রচারও জন্ম থেকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বাঁধা।
বিবিসি আরবি রেডিও চালু হয় ১৯৩৮ সালের ৩ জানুয়ারি। তখন মুসোলিনির ইতালি বারি শহর থেকে আরবি ভাষায় ব্রিটিশবিরোধী প্রচার চালাচ্ছিল। তার জবাব দিতে এই সম্প্রচারের টাকা দিল ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর।
বিবিসির পুরা ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুদানে চলেছে, এখনো তার বড় অংশ সেখান থেকে আসে।
ব্রিটিশ জাতীয় নিরীক্ষা দপ্তরের হিসাবে ২০২৫-২৬ সালে ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের মোট বাজেট ৩৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড, এর মধ্যে ১৩৭ মিলিয়ন দিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর, বাকিটা এসেছে লাইসেন্স ফি থেকে।
টাকা দেওয়ার কারণ সরকারি কাগজে লেখা আছে। বাজেটে বলা হয়েছে, বরাদ্দটা "যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক উপস্থিতি ও সফট পাওয়ারের সমর্থনে"।
পার্লামেন্টের এক কমিটিকে পাঠানো চিঠিতে পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বিবিসির পরের সনদ ঠিক করার সময় তারাও মত দেবে, যাতে পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার যথাযথ গুরুত্ব পায়।
রাষ্ট্রের টাকায় চলা সংবাদমাধ্যম কূটনীতির কাজে লাগে, এই কথাটা হার্ডটকে সোয়াগ বলেন নাই, ব্রিটিশ সরকার সেটা নিজের কাগজে সরাসরি লিখে রাখে।
ভয়েস অব আমেরিকা মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হওয়া আন্তর্জাতিক চ্যানেল, এবং মার্কিন আইনে লেখা আছে সরকার এর সংবাদ প্রচারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আইনে লেখা এই স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করে, তার সবচেয়ে কাছের নজির এই প্রতিষ্ঠানটা।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ভয়েস অব আমেরিকার মূল সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়াকে আইন অনুযায়ী যতটুকু না রাখলেই নয়, ততটুকুতে ছোট করার নির্দেশ দেন।
এর পরপর হোয়াইট হাউস "দ্য ভয়েস অব র্যাডিকাল আমেরিকা" শিরোনামে বিবৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটার বিরুদ্ধে বামপন্থী পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে।
পরের দিন প্রায় ১,৩০০ কর্মীকে ছুটিতে পাঠানো হলো, বিদেশি ভাষার সম্প্রচারে খবরের জায়গায় গান বাজল। জুনে ৬৩৯ জনকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ গেল।
যে প্রতিষ্ঠান ৪৯ ভাষায় সম্প্রচার করত, এই বছরের জানুয়ারিতে সেটা নেমে এসেছে ছয় ভাষায়।
২০২৬ সালের মার্চে এক ফেডারেল বিচারক রায় দিলেন পুরো প্রক্রিয়াটা বেআইনি, কর্মীদের ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন, এবং আপিল আদালত সেই নির্দেশ স্থগিত করল।
দেড় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটা কার্যত বন্ধ, মামলা চলছে।
তবু একটা তফাত আছে, সেটা ছোট না। বিবিসি প্রতি বছর অডিট করা হিসাব প্রকাশ করে, বাইরের নিয়ন্ত্রক তার ভুল ধরে, সংসদীয় কমিটির সামনে জবাব দিতে হয়।
ভয়েস অব আমেরিকার কর্মীরা আদালতে যেতে পেরেছেন কারণ তাদের হাতে কংগ্রেসের পাস করা আইন ছিল। কাতারে আল জাজিরার স্বাধীনতা নিয়ে কোনো আইন নাই, কোনো হিসাব নাই, কোনো নিয়ন্ত্রক নাই।
স্বাধীনতা আছে, সেটা কারও কথা, কোনো কাগজ না। রাষ্ট্রের টাকায় চলা সম্প্রচারের সীমা সব দেশে রাষ্ট্রের দরকার দিয়ে ঠিক হয়। কাতারে সেই সীমা নিয়ে তর্ক করার জায়গাও নাই।
➖
একটা সংবাদমাধ্যম আসলে কতোদূর করতে পারে, তার সবচেয়ে ভালো মাপ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। আল জাজিরার বেলায় প্রথম প্রতিক্রিয়া এসেছিল ওয়াশিংটন থেকে।
রামসফেল্ডের ওই অভিযোগের দুই সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের ১৩ নভেম্বর ভোরে, মার্কিন বিমান কাবুলে আল জাজিরার ভবনে ৫০০ পাউন্ডের দুইটা বোমা ফেলে।
সংখ্যাটা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্রের দেওয়া। ভেতরে তখন কেউ ছিলেন না, ব্যুরো ধ্বংস হয়ে যায়।
৬ ডিসেম্বর সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভিক্টোরিয়া ক্লার্ক চিঠিতে জানালেন ভবনটা কাবুলে আল-কায়েদার পরিচিত স্থাপনা ছিল, আল জাজিরা সেটা ব্যবহার করত এমন কোনো ইঙ্গিত তাদের কাছে ছিল না।
আল জাজিরা প্রায় দুই বছর ওই ভবনে ছিল, ছাদে তিনটা স্যাটেলাইট ডিশ ছিল, এবং কূটনীতিকসহ এলাকার সবাই জানত সেখানে কী হয়।
২০০৩ সালের ৮ এপ্রিল সকালে বাগদাদে একই জিনিস ঘটল, এবার একজন মারা গেলেন। যুদ্ধ শুরুর আগে আল জাজিরা পেন্টাগনকে নিজেদের বাগদাদ অফিসের কোঅর্ডিনেট পাঠিয়েছিল।
মার্কিন বিমান হামলায় ছাদে দাঁড়ানো সংবাদদাতা তারেক আইয়ুব নিহত হলেন, একজন ক্যামেরাম্যান আহত হলেন।
কয়েক মিনিট পরে কাছের আবুধাবি টিভির অফিসে গুলি হলো, এবং একই দিন পালেস্তাইন হোটেলে মার্কিন ট্যাংকের গোলায় রয়টার্স ও টেলেসিঙ্কোর দুই ক্যামেরাম্যান নিহত হলেন।
সেন্ট্রাল কমান্ড বলল, ভবন থেকে গুলি এসেছিল, তারা আত্মরক্ষায় জবাব দিয়েছে। অক্টোবরে তাদের মুখপাত্র সিপিজেকে নিশ্চিত করলেন, ঘটনার কোনো তদন্ত হয় নাই।
তৃতীয় নজির একজন ক্যামেরাম্যানের। সামি আল-হাজকে ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনী আটক করে, ২০০২ সালের জুনে মার্কিন সেনারা তাকে গুয়ান্তানামোতে নিয়ে যায়।
সেখানে তিনি ছিলেন বন্দি নম্বর ৩৪৫, আটক একমাত্র সাংবাদিক, ছয় বছরে কোনো অভিযোগ গঠন হয় নাই, বিচারও হয় নাই।
তার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদকারীরা প্রায় পুরাটা সময় জানতে চাইত আল জাজিরা এবং তার কর্মীদের কথা।
২০০৭ সালের পর্যালোচনায় তার বিরুদ্ধে "সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ"-এর যে অভিযোগ হলো। ভিত্তি হিসেবে লেখা ছিল আল জাজিরা তাকে ক্যামেরা চালানো শিখিয়েছে।
২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে অনশনে, দিনে দুইবার নাক দিয়ে নল ঢুকিয়ে খাওয়ানো হতো। তিনি মুক্তি পান ২০০৮ সালের ১ মে।
ব্রিটেনের অংশ একটা ফাঁস হওয়া কাগজ ঘিরে। ২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর ডেইলি মিরর জানাল, ২০০৪ সালের এপ্রিলে বুশ-ব্লেয়ার বৈঠকের একটা গোপন মেমোতে দোহায় আল জাজিরার সদর দপ্তরে হামলার কথা আছে, ব্লেয়ার বুশকে নিরস্ত করেছেন।
হোয়াইট হাউস দাবিটাকে উদ্ভট বলল, মিরর নিজে লিখল তাদের সূত্ররা একমত না প্রস্তাবটা গুরুতর ছিল কি না। পরের দিন অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড গোল্ডস্মিথ পত্রিকাটিকে মেমোর আর কোনো বিবরণ ছাপতে নিষেধ করলেন।
২০০৭ সালের ১০ মে মেমো ফাঁসের দায়ে সরকারি কর্মচারী ডেভিড কিওকে ছয় মাস এবং সংসদীয় গবেষক লিও ও'কনরকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হলো, বিচারের বড় অংশ চলল বন্ধ দরজার ভেতরে, এবং বিচারক সংবাদমাধ্যমকে মেমোর বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা নিষেধ করলেন।
এই মেমো কখনো প্রকাশ করা হয় নাই, ফলে তাতে কী লেখা তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। যেটা প্রমাণিত, সেটা হলো একটা টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ে দুই নেতার কথোপকথন ফাঁস হলে ব্রিটিশ রাষ্ট্র দুইজনকে জেলে পাঠায়।
আগের বছর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ব্লাঙ্কেট নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ২০০৩ সালের মার্চে তিনি ব্লেয়ারকে বাগদাদে আল জাজিরার ট্রান্সমিটারে বোমা ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ যুদ্ধে সম্প্রচার চলতে দেওয়ার কথা না।
মিসর এই কাজ করেছে আদালত দিয়ে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কায়রোর এক হোটেল থেকে আল জাজিরার তিন সাংবাদিককে তুলে নেওয়া হয়, পিটার গ্রেস্টে, মোহাম্মদ ফাহমি, বাহের মোহাম্মদ।
অভিযোগ ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সাহায্য করা এবং মিথ্যা খবর প্রচার করা নিয়ে।
প্রসিকিউশন প্রমাণ হিসেবে যা দেখাল, তার মধ্যে ছিল একটা বিবিসি পডকাস্ট, অভিযুক্তরা মিসরে না থাকা অবস্থায় বানানো একটা প্রতিবেদন, এবং অস্ট্রেলীয় গায়ক গোতিয়ের একটা গান।
গুয়ান্তানামোতে সামি আল-হাজের ক্যামেরা-প্রশিক্ষণের পাশে এটা রাখলে দুই আদালতের প্রমাণের মান একই দেখায়। তিনজনের সাত থেকে দশ বছর সাজা হলো।
২০১৬ সালে ছুটিতে দেশে ফেরা প্রযোজক মাহমুদ হুসেইনকে আটক করা হয়, চার বছরের বেশি বিনা অভিযোগে জেলে থাকেন তিনি।
মুক্তি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ঠিক এক মাস আগে মিসর ও কাতার সম্পর্ক মেরামত করেছে। মিসর কোনো ব্যাখ্যা দেয় নাই, দরকারও ছিল না।
গাজায় ব্যাপারটা অন্য রকম। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর আল জাজিরা নেটওয়ার্কের হিসাবে ইসরায়েল তাদের অন্তত ১০ জন সাংবাদিককে হত্যা করেছে।
সবচেয়ে আলোচিত কেস আনাস আল-শরিফের, ২৮ বছর বয়স, উত্তর গাজায় টিকে থাকা শেষ কয়েকজন রিপোর্টারের একজন।
২০২৫ সালের ১০ আগস্ট আল-শিফা হাসপাতালের গেটের বাইরে সাংবাদিকদের তাঁবুতে ড্রোন হামলায় তিনি এবং তার চার সহকর্মী মারা যান।
ইসরায়েল দায় স্বীকার করে বলে তিনি হামাসের একটা সেল চালাতেন, প্রমাণ হিসেবে দেখায় কয়েকটা ছবি, তারিখ ছাড়া। হামলার তিন সপ্তাহ আগে আল-শরিফ নিজে সিপিজে-কে জানিয়েছিলেন তাকে মেরে ফেলা হতে পারে।
ইসরায়েল মেরে ফেলার পাশাপাশি আইনও করেছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে নেসেটে পাস হওয়া এক অস্থায়ী আইনে জরুরি অবস্থায় বিদেশি সম্প্রচারক বন্ধের ক্ষমতা দেওয়া হয়, এবং এক মাসের মধ্যে সেই আইনে আল জাজিরার অফিস সিল করা হয়, সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়।
একই মাসে একই আইনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের গাজা লাইভ ফিড বন্ধ করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক চাপে সেটা ফেরত দিতে হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নেসেট এই আইনের মেয়াদ ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ায় এবং জরুরি অবস্থার শর্ত ও বিচারিক তদারকি দুটোই তুলে দেয়।
একটা চ্যানেলকে থামানোর জন্য যে আইন বানানো হয়েছিল, সেটা সবার জন্য স্থায়ী ক্ষমতা হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও এই তালিকায় আছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি রামাল্লার সরকার পশ্চিম তীরে আল জাজিরার কার্যক্রম স্থগিত করে, কারণ জেনিন শিবিরে পিএ-র নিজের বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষের কভারেজ।
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রায় কোনো বিষয়ে একমত হয় না। আল জাজিরা বন্ধ করার প্রশ্নে তারা তিন মাসের ব্যবধানে একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
➖
২০১৭ সালের জুনে সৌদি আরব, আমিরাত, বাহরাইন এবং মিসর কাতারকে অবরোধ করে। স্থল, নৌ, আকাশ, সব বন্ধ করে।
কয়েক সপ্তাহ পর তারা ১৩ দফা দাবি পাঠায়, ১০ দিনের সময় দিয়ে।
ছয় নম্বর দাবিটা ছিল আল জাজিরা বন্ধ করা, সঙ্গে কাতারের টাকায় চলা আরও চারটা সংবাদমাধ্যম। এর আশপাশের দাবিগুলো ছিল কাতারে তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কমানো।
চারটা রাষ্ট্র একটা টেলিভিশন চ্যানেলকে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির সমান দামে বিচার করছে। আল জাজিরা কী, তার এর চেয়ে পরিষ্কার মূল্যায়ন আর হয় না।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে সাড়ে তিন বছরের অবরোধ উঠে যায়, এবং এর জন্য কাতারকে আল জাজিরা বন্ধ করতে হয় নাই। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সমঝোতার আলোচনায় চ্যানেলটার প্রসঙ্গ ওঠে নাই।
চার প্রতিবেশীর চাপের মধ্যেও কাতার যে চ্যানেলটা ছাড়ে নাই, তার সঙ্গে দেশটার পররাষ্ট্রনীতির ধরন জড়িত। কাতার একসঙ্গে এমন সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, যারা নিজেরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ, এবং সেই সম্পর্কগুলো দোহায় পাশাপাশি দেখা যায়।
শহরের বাইরে আল উদেইদ ঘাঁটি, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা। শহরের ভেতরে হামাসের রাজনৈতিক দপ্তর, যেটা কাতারের ভাষ্য অনুযায়ী হামাসের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে ওয়াশিংটনের অনুরোধে খোলা হয়েছিল।
তালেবানও দোহায় রাজনৈতিক দপ্তর পরিচালনা করে, এবং ২০২০ সালে আমেরিকা ও তালেবানের চুক্তি এই শহরে সই হয়। আবার ইরানের সঙ্গে কাতার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র ভাগ করে নেয়।
কাতার ছোট দেশ, নিজের সামরিক শক্তিতে টিকে থাকার মতো বড় না। তাই সে টিকে থাকে একসঙ্গে সব পক্ষের কাছে দরকারি হয়ে, এবং আল জাজিরা এই ব্যবস্থার অংশ।
যে যুক্তিতে একই শহরে আমেরিকান ঘাঁটি ও হামাসের দপ্তর থাকে, সেই যুক্তিতে সেখানে এমন একটা চ্যানেলও থাকে, যেটা পুরো আরব বিশ্বের সরকারগুলোকে বিব্রত করতে পারে।
২০১০ সালে উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় দোহার মার্কিন দূতাবাস আল জাজিরাকে কাতারের সবচেয়ে মূল্যবান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হাতিয়ারগুলোর একটা বলেছে, যা দিয়ে কাতার অন্য দেশের সঙ্গে নষ্ট হওয়া সম্পর্ক মেরামত করতে পারে।
আরেকটা বার্তায় দূতাবাস লিখেছে, আল জাজিরার কভারেজকে দুই দেশের আলোচনার বিষয় করা গেলে এই চ্যানেলে আমেরিকার ছবি আরও ভালো হবে।
আল জাজিরা জবাবে বলেছিল, এটা মার্কিন দূতাবাসের মূল্যায়ন, বাস্তবতা থেকে বহু দূরে।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন বিচার বিভাগ আল জাজিরার অনলাইন শাখা AJ+-কে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধনের নির্দেশ দেয়, চিঠিতে লেখা ছিল এই নেটওয়ার্ক কাতার সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও অর্থে চলে।
সেদিন ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র-কাতার কৌশলগত সংলাপ চলছিল। পরের দিন হোয়াইট হাউসে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তিতে সই করে।
আল জাজিরার দাবি, আমিরাত এই নির্দেশ চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে আদায় করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল ওতাইবা কোনো যোগসূত্রের কথা অস্বীকার করেন।
কাতারের টাকা ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংকেও যায়।
২০১৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমস দেখিয়েছিল, কাতার ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনকে চার বছরে ১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার দেওয়ার চুক্তি করেছে, এবং বিদেশি সরকারের টাকা নেওয়া থিংক ট্যাংকগুলোর খুব কমই বিদেশি এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধন করেছে।
এই কূটনৈতিক ভূমিকার ঝুঁকি সামনে আসে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। হামাসের নেতারা যখন দোহায় গাজা যুদ্ধবিরতির একটা মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক করছিলেন, ইসরায়েল সেখানে বিমান হামলা চালায়।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের কোনো সদস্য দেশে এটা ইসরায়েলের প্রথম সরাসরি হামলা। শীর্ষ নেতারা বেঁচে যান, নিহত হন ছয়জন, তাদের মধ্যে ছিলেন হামাসের পাঁচ সদস্য এবং কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বললেন, এই হামলার পর চলমান আলোচনার কোনো ভিত্তি তিনি দেখছেন না।
২০১৭ সালে যিনি কাতার অবরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হামলাকে অপরাধমূলক বলে নিন্দা করেন এবং কয়েক দিনের মধ্যে দোহা সফরে যান।
হামাসের রাজনৈতিক দপ্তর দোহায় থাকায় কাতার এই যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হতে পেরেছিল, এবং সেই দপ্তরের কারণে দোহা হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
➖
এতক্ষণ যা বলা হলো, তাতে মনে হতে পারে আল জাজিরা সব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমান। তা না।
তার প্রতিরোধের একটা মানচিত্র আছে, এবং সেটা কাতারের পররাষ্ট্রনীতির মানচিত্রের সঙ্গে অনেকটাই মিলে।
২০১১ সালের মার্চে বাহরাইনে বিক্ষোভ দমাতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বাহিনী প্রবেশ করে, কাতার সেই পরিষদের সদস্য। বৈরুতে আল জাজিরার সংবাদদাতা আলি হাশেম পরের বছর পদত্যাগ করেন।
তার ইমেইল সিরিয়ান সরকারপন্থী হ্যাকাররা ফাঁস করে দিয়েছিল, তাতে তিনি লিখেছিলেন বাহরাইনে যা হচ্ছে তা নিয়ে চ্যানেল চুপ, এবং তার মনে হচ্ছে তাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে।
হাশেম পরে আল জাজিরায় ফিরে এসেছেন, সেটা বলা দরকার, কারণ ঘটনাটা কারও ব্যক্তিগত শত্রুতার না, একটা নির্দিষ্ট বছরের একটা নির্দিষ্ট দেশ নিয়ে।
এর চেয়ে স্পষ্ট নজির একটা তথ্যচিত্র, যেটা আল জাজিরা বানিয়েছিল কিন্তু কখনো প্রচার করেনি।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আল জাজিরা ব্রিটেনে ইসরায়েলি লবির কাজকর্ম নিয়ে "দ্য লবি" প্রচার করে।
একই অনুসন্ধানী ইউনিট এরপর আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো নিয়ে চার পর্বের আরেকটা সংস্করণ বানায়, যার কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে।
সময়টা কাতারের জন্য কঠিন ছিল। সৌদি আরব ও আমিরাতের অবরোধ থেকে বের হতে কাতার তখন ওয়াশিংটনে সমর্থন খুঁজছিল, এবং আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী ইহুদি সংগঠনের নেতাদের দোহায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল।
ছবিটার প্রচার মাসের পর মাস পিছিয়ে যেতে থাকে।
২০১৮ সালের শুরুতে ইউনিটের প্রধান ক্লেটন সুইশার বেতনসহ ছুটিতে যান এবং আমেরিকান ইহুদি পত্রিকা ফরোয়ার্ডে লেখেন, ছবিটা এমন সময়ে শেষ হয়েছে যখন অবরোধ থেকে বের হতে কাতার আমেরিকানদের সমর্থন চাইছে।
জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মর্টন ক্লাইন দাবি করেন, আল জাজিরাকে ছবিটা বাতিল করতে বাধ্য করা হয়েছে।
আল জাজিরা দাবিটা অস্বীকার করে, কিন্তু প্রচারের তারিখ দেয় না। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ফিলিস্তিনপন্থী ওয়েবসাইট ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা চার পর্ব ফাঁস করে দেয়।
ছবিটা বাতিলের কোনো ঘোষণা আসে নাই, প্রচারের তারিখও কখনো আসে নাই।
অথচ একই ইউনিট ২০১১ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের গোপন আলোচনার নথি "প্যালেস্টাইন পেপারস" প্রকাশ করেছিল, এবং তার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রধান আলোচক সায়েব এরেকাতের অভিযোগ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রক অফকম পুরোপুরি খারিজ করেছিল।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিব্রত করার কাজ প্রচার হয়েছে, আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী লবিকে বিব্রত করার কাজ হয় নাই। দুই কাজের মধ্যে সাংবাদিকতার মানে ফারাক ছিল না, ফারাক ছিল প্রচারের সময়ে কাতার কার সমর্থন চাইছিল।
একই ধরনের ঘটনা ২০২৫ সালে লন্ডনে ঘটেছে, সরকারি সনদ ও বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ফিতে চলা বিবিসিতে।
বিবিসি গাজায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের উপর হামলা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র কমিশন করেছিল, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রচারের কথা ছিল, প্রচারের অনুমোদনও হয়ে গিয়েছিল।
তারপর বিবিসি প্রচার আটকে রাখে, কারণ হিসেবে জানায় গাজা নিয়ে তাদের আরেকটা তথ্যচিত্রের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। সেই তথ্যচিত্রের শিশু বর্ণনাকারী ছিল হামাসের এক মন্ত্রীর ছেলে, যা বিবিসি প্রচারের আগে জানত না।
জুনে বিবিসি জানায়, ছবিটা দেখানো হবে না, কারণ প্রচার করলে পক্ষপাতের ধারণা তৈরি হতে পারে।
২ জুলাই চ্যানেল ফোর ছবিটা “গাজা: ডক্টরস আন্ডার অ্যাটাক” নামে প্রচার করে, জানায় তারা নিজেরা তথ্য যাচাই করেছে এবং অফকমের সম্প্রচার বিধি মেনেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে ছবিটা বাফটা টেলিভিশন অ্যাওয়ার্ডসে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগে পুরস্কার পায়।
ঘটনা দুইটা একই রকম। ছবি শেষ হওয়ার পর, যখন ইসরায়েল প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ চলছিল, তখন ছবিতে কোনো তথ্যগত ভুল দেখানো ছাড়াই প্রচার আটকে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রের টাকায় চলা সম্প্রচারের সীমা এভাবে কোথাও লেখা থাকে না, প্রচারের তালিকা থেকে ছবি বাদ পড়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়।
তবে কাতারের ক্ষেত্রে একটা বিষয় আলাদা।
বিবিসি ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা নিয়মিত প্রচার করে, কিন্তু আল জাজিরার কোনো চ্যানেলে কাতারের শাসক পরিবার, রাষ্ট্রীয় হিসাব বা দেশের ভেতরের রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী কাজ দেখা যায় না।
এই নিয়ম দোহার নিউজরুমের বাইরেও মানা হয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের দোহা সেন্টারের সাবেক ভিজিটিং ফেলো সালিম আলী ২০১৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সেখানে কাতারি সরকারের সমালোচনা করা যেত না।
কাতারের টাকায় চলা মার্কিন থিংক ট্যাংকের শাখাতেও আল জাজিরার মতো একই সীমা মানা হতো।
➖
বাংলাদেশের মানুষ চার বছরের ব্যবধানে আল জাজিরার দুইটা বড় অনুসন্ধান দেখেছে। দুইবার চ্যানেলটা একই পদ্ধতিতে কাজ করেছে, একই প্রধানমন্ত্রীর সরকার নিয়ে।
প্রথমবার রাষ্ট্র প্রতিবেদনটাকে ষড়যন্ত্র বলে মুছে দিতে চেয়েছে, দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রের মুখপাত্র সেই চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
মাঝখানে চ্যানেল বদলায় নাই, বদলেছে ঢাকায় কে ক্ষমতায় আছে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রচার হয় "অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার'স মেন"।
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়, তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের তিন ভাই ১৯৯৬ সালের এক খুনের মামলায় দণ্ডিত, তাদের দুইজন পলাতক, এবং পলাতকদের একজন, হারিস আহমেদ, হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ভিন্ন নামে ব্যবসা করছেন।
গোপন রেকর্ডিংয়ে হারিসকে পুলিশে পদ বিক্রি এবং সামরিক ঠিকাদারির ভাগ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়।
প্রচারের আগে আল জাজিরা প্রধানমন্ত্রী থেকে পুলিশ কমিশনার পর্যন্ত সবার কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল, কেউ জবাব দেয় নাই।
রাষ্ট্রের জবাব আসল মিসর বা রামাল্লার মতো করে। প্রথম দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলল, প্রতিবেদনটা জামায়াতের মদদে বিদেশ থেকে সাজানো।
সেনাসদর বলল, এটা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
১৭ ফেব্রুয়ারি এক আইনজীবীর রিটে হাইকোর্ট বিটিআরসিকে ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটার থেকে প্রতিবেদন সরানোর নির্দেশ দিল, যদিও অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিটিআরসির আইনজীবী দুইজন আদালতে বলেছিলেন এমন নির্দেশ দেওয়ার মতো আইন নাই।
সেদিন বিটিআরসির চেয়ারম্যান জানালেন, ইউটিউব ও ফেসবুক সরাতে রাজি হয় নাই। ভিডিওটা তখন ৭০ লাখ বার দেখা হয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন তখন প্রতিবেদনটাকে গুরুত্ব দেয় নাই। প্রচারের দিন আজিজ আহমেদ মার্কিন সেনাপ্রধানের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটনে সরকারি সফরে ছিলেন।
পরের দিন তিনি পেন্টাগনে বৈঠক করেন, এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র নেত্র নিউজকে বলেন, তারা অভিযোগের কথা জানেন, তবু বৈঠক চলবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তির পরও সফর নির্ধারিত সূচিতে শেষ হয়।
দুই ভাইয়ের সাজা যে আগেই মওকুফ হয়েছে, সেটা প্রথম জানায় সেনাসদর, ১৫ ফেব্রুয়ারির বিবৃতিতে। পরদিন প্রথম আলো প্রজ্ঞাপনটা সামনে আনে।
২০১৯ সালের ২৮ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে পলাতক হারিস ও আনিসের যাবজ্জীবন সাজা মওকুফ করেছিল, আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান হওয়ার নয় মাস পর।
প্রজ্ঞাপনটা প্রায় দুই বছর গোপন ছিল, এবং তখনো পুলিশের ওয়েবসাইটে হারিসের নাম "ওয়ান্টেড" তালিকায়। ভাইদের বিচার এড়াতে সেনাপ্রধানের সাহায্যের যে অভিযোগ তথ্যচিত্রে ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দুই বছর ধরে বাংলাদেশের নিজের সরকারি কাগজে ছিল।
তিন বছর পর, ২০২৪ সালের মে মাসে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
কারণ হিসেবে লেখা হয় তথ্যচিত্রের মূল অভিযোগগুলো, ভাইকে বিচার থেকে বাঁচানো, সামরিক ঠিকাদারিতে অনিয়ম, এবং নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ।
একই প্রমাণ ২০২১ সালে ওয়াশিংটনের সামনে ছিল, তখন তারা বৈঠক চালিয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা আসলো মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফরের পরপর, যে সফরের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্ক পুনর্গঠন।
এর মানে সিদ্ধান্ত হয়েছে ওয়াশিংটনের নিজের হিসাবে, প্রতিবেদনের সত্যতার সনদ হিসেবে না।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে, এবং এক বছর পর আল জাজিরা আবার বাংলাদেশ নিয়ে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে।
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই প্রচার হয় "হাসিনা: ৩৬ ডেজ ইন জুলাই"। এইবার উপাদান হাসিনার নিজের নজরদারি সংস্থা এনটিএমসির করা ফোন রেকর্ডিং।
১৮ জুলাই ২০২৪-এর এক কলে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, তিনি খোলা নির্দেশ দিয়েছেন, বাহিনী এখন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, যেখানে পাবে সেখানে গুলি করবে।
রংপুরে আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত যিনি করেছিলেন, তিনি ইঙ্গিত দেন, মৃত্যুর কারণ হিসেবে গুলির বদলে মাথার আঘাত লিখতে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। ছবিটা ওভারসিজ প্রেস ক্লাবের পুরস্কার পায়।
দুই ঘটনা পাশাপাশি রাখলে বিষয়টা সহজ হয়ে যায়। ২০২১ সালে যে চ্যানেলের প্রতিবেদন রাষ্ট্র ইন্টারনেট থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে রাষ্ট্রের মুখপাত্ররা বসেছেন।
আল জাজিরা নিজের কাজের ধরন বদলায় নাই। বদলেছে ক্ষমতায় কে, এবং তার সঙ্গে বদলেছে রাষ্ট্র কোন প্রতিবেদনকে সত্য বলবে আর কোনটাকে ষড়যন্ত্র।
এখানে কাতারের কোনো কূটনৈতিক স্বার্থ চোখে পড়ে না, আজিজ আহমেদের পরিবারেও না, হাসিনার ফোনালাপেও না।
ফলে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কোনো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সম্পদ ঠেকানোর চেষ্টা ছিল না। ২০২১ সালে রাষ্ট্র থামাতে চেয়েছিল এমন এক প্রতিবেদন, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল তার নিজের প্রজ্ঞাপনে।
➖
আল জাজিরা নিজের সম্পর্কে অনেক সংখ্যা প্রকাশ করে, কয়টা ব্যুরো, কয়টা দেশ, কত দর্শক, কত কর্মী।
যে দুইটা তথ্য প্রকাশ করে না, তা হলো বছরে কত টাকা খরচ হয়, এবং কোন প্রতিবেদন কেন প্রচার হয় না। ২০১৭ সালে হার্ডটকে সোয়াগ প্রথম প্রশ্নের জবাব দেন নাই, "দ্য লবি" নিয়ে প্রতিষ্ঠানটা দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দেয় নাই।
আল জাজিরার যেসব অনুসন্ধান নিয়ে রাষ্ট্র আপত্তি তুলেছিল, তার মূল দাবিগুলো পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার রায়ে এবং সরকারের নিজের সিদ্ধান্ত ও নথিতে টিকে গেছে।
প্যালেস্টাইন পেপারস নিয়ে অভিযোগ অফকম খারিজ করেছে, সাইপ্রাস তার পাসপোর্ট কর্মসূচি বাতিল করেছে, আজিজ আহমেদের ভাইদের সাজা মওকুফের প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশের নিজের প্রজ্ঞাপনে।
অথচ আমেরিকা, ব্রিটেন, মিসর, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, অবরোধ দেওয়া উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এবং বাংলাদেশের হাইকোর্ট, সবাই কোনো না কোনো সময় চ্যানেলটাকে থামাতে চেয়েছে, এবং যুক্তি প্রায় সব সময় একই ছিল যে, প্রতিবেদন মিথ্যা, উদ্দেশ্য রাজনৈতিক।
এই সাংবাদিকতা সত্যিকার বলে কাতারের কাছে এর কূটনৈতিক মূল্য আছে, এবং সেই মূল্যের জন্য কাতার এর খরচ বহন করে।
কাতার একা এই কাজ করে না।
ব্রিটেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের খরচ দেয় সফট পাওয়ারের কথা লিখে, আমেরিকা ভয়েস অব আমেরিকা চালিয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের এক আদেশে কার্যত বন্ধও করে দিয়েছে।
রাষ্ট্রের টাকায় চলা সম্প্রচারের সীমা কোথাও লেখা থাকে না, ছবি আটকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়।
দোহায় আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী লবি নিয়ে তথ্যচিত্র আটকে গেছে, লন্ডনে গাজার চিকিৎসকদের নিয়ে তথ্যচিত্র আটকে গেছে।
কাতারের তফাত হলো, সেখানে এই সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো আইন, হিসাব বা নিয়ন্ত্রক নাই, এবং নিজের দেশ নিয়ে চ্যানেলটা কোনো অনুসন্ধান করে না।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এর সঙ্গে আরেকটা কথা যোগ করে। চার বছরের ব্যবধানে এইখানে একই চ্যানেলের কাজ একবার ষড়যন্ত্র, আরেকবার সত্য বলে গণ্য হয়েছে, যদিও দুইবার তারা একই প্রধানমন্ত্রীর সরকার নিয়ে একই পদ্ধতিতে কাজ করেছে।
ওয়াশিংটনও একই প্রমাণ ২০২১ সালে পাশে সরিয়ে রেখেছে, ২০২৪ সালে কাজে লাগিয়েছে।
ফলে আল জাজিরার সাংবাদিকতা সৎ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাজ নিজেই দিয়েছে।
তবে একটা কথা থেকে যায়, এবং সেটা শুধু আল জাজিরার জন্য না, রাষ্ট্রের টাকায় চলা সব সম্প্রচারকের জন্য প্রযোজ্য যে, কোন খবর প্রচার হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কে নেয়।
দোহা, লন্ডন বা ওয়াশিংটন, কোথাও এই সীমা লিখে রাখা নাই, এবং সব জায়গায় রাষ্ট্রের দরকার ও চাপ তার উপর প্রভাব ফেলে। প্রচারের পরেও প্রশ্ন শেষ হয় না।
বাংলাদেশের পাঠক এই অভিজ্ঞতা নিজের দেশে দেখেছেন। ২০২১ সালে যে চ্যানেলের প্রতিবেদনকে রাষ্ট্র ষড়যন্ত্র বলে ইন্টারনেট থেকে সরাতে চেয়েছিল, চার বছর পর সেই চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে বসে সেই রাষ্ট্রেরই মুখপাত্র সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
এর মধ্যে আল জাজিরা তার কাজের ধরন বদলায় নাই, বদলেছে ঢাকায় কারা ক্ষমতায় আছেন।
ফলে একটা প্রতিবেদন সত্য না ষড়যন্ত্র, সেই বিচার শুধু প্রতিবেদনের প্রমাণ দিয়ে হয় না, যে দেশ নিয়ে প্রতিবেদন, সেখানে তখন ক্ষমতায় থাকা মানুষদের প্রয়োজনও সেই বিচারে প্রভাব ফেলে।