Image description

পবিত্র রমজান মাসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ১০ টাকা মূল্যের ইফতার বিতরণ কর্মসূচিতে মায়ের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল নিহত শিশু অপ্রতীম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমের সঙ্গে ইফতার বিতরণে তার অংশগ্রহণের সেই স্মৃতি এখন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বেদনার হয়ে উঠেছে।

গত রমজানে কুবি শিক্ষার্থী কাজী মিরাজের উদ্যোগে আয়োজিত দশ টাকার ইফতার বিতরণ সময়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের মাঝে ইফতার তুলে দেওয়া অপ্রতিমের সেই মুহূর্তের ছবি ও স্মৃতি এখন সহপাঠী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছে কেবলই এক বিষাদময় স্মৃতি।

জানা যায়, গত রমজানে কুবি শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ দশ টাকার ইফতার বিতরণের উদ্যোগ নেয়। তখন অপ্রতিমের মা নাহিদা ম্যাম মিরাজকে বলেছিলেন, ‘তোমারা যখন ইফতার বিক্রি করো, তখন আমারে ছেলেকে রাইখো। যেন সে কিছু শেখে। ছোটো বয়সে থেকে কিছু শিখলে সেটা তার বেড়ে উঠায় ভালো প্রভাব ফেলবে। যেন সে এসব ভালো কাজে আগ্রহী হয়।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তুহিন নামে এক কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।

অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সে। সন্ধ্যার পরও বাসায় না ফেরায় তার মা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলায় অপ্রতিমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের জিলানী। তিনি সেখানে বাঁশ কাটতে গিয়েছিলেন।

আব্দুল কাদের জিলানীর ভাষ্য, বেলা ১২টার দিকে তারা ওই এলাকায় বাঁশ কাটতে যান। সেখানে একটি শিশুকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন, যার শরীরে রক্তের দাগ ছিল। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বিষয়টি জানান। মামুনসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন।

এর আগে শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এবং দক্ষিণ মোড়ের একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। ফুটেজে অপ্রতীমকে তুহিন নামের এক কিশোরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের দিকে যেতে দেখা যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়।

তুহিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা। তার বাড়ি এবং অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থান পরস্পরের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বলে জানা গেছে।

শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীকে তুহিনের বাড়িতে পাঠিয়ে অপ্রতিমের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়। পরে বিষয়টি কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িকে জানানো হলে দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ তুহিনকে আটক করে।

পরে তুহিনের মুঠোফোনের বার্তায় অপ্রতীমকে শুক্রবার বিকেলে বাইরে আসতে বলার তথ্য পাওয়া যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। 

তুহিনকে আটকের বিষয়ে নিশ্চিত করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম বলেন, কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সাব-ইন্সপেক্টর মহিবুল আলম ভূঁইয়া বলেছেন, “তদন্তের স্বার্থে সন্দেহজনকভাবে তুহিন নামের একজনকে আটক করা হয়েছে।”

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই আমরা পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’

কুমিল্লার এসপি আনিসুজ্জামান বলেন, আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে আছে একজন ব্যক্তি, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমি এখান থেকে যাওয়ার পরে এই হত্যাকান্ডের বিষয়টি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখবো, তদন্ত করবো এবং প্রকৃত হত্যাকারীকে না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করবো।