তেলের প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, যুদ্ধ আর বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার এই সময়ে সেই সত্য আরও একবার সামনে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রধান পথগুলো যখন একের পর এক ঝুঁকির মুখে, তখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশটি বাধ্য হচ্ছে বিকল্প পথ খুঁজতে৷ ইয়ানবুর লোহিত সাগর বন্দর থেকে ওমানের সোহর উপকূল পর্যন্ত নতুন জ্বালানি করিডর তৈরি করছে রিয়াদ।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেল পরিবহনে বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে পারত।
পাইপলাইনটি বন্ধ হওয়ার ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বৈশ্বিক সরবরাহ থেকে সাময়িকভাবে কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, মেরামতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে বড় বিকল্প হয়ে উঠেছে জাহাজ বদল পদ্ধতি। বিশেষ করে ওমানের সোহর বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় বড় তেলবাহী জাহাজে সরাসরি তেল স্থানান্তর করে রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে রিয়াদ।
লন্ডনভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা সংস্থা এলএসইজি-র গবেষক রিশি রাজানালা বলেছেন, “ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ থাকায় সৌদির বিকল্প সীমিত। একটি পথ হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে আরও বেশি তেল পাঠানো এবং সোহরের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা।”
তবে এই পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দাব প্রণালী নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর সামরিক অগ্রযাত্রা ওই অঞ্চলের নৌ নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সৌদি আরবের আগের মূল রপ্তানি পথ ছিল উপসাগরীয় বন্দর রাস তানুরা ও রাস আল-জুয়াইমাহ। সেখান থেকে জাহাজ হরমুজ হয়ে এশিয়ার বাজারে যেত। কিন্তু বর্তমান উত্তেজনায় এই পথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সড়কপথে তেল পরিবহন কোনও বাস্তব সমাধান নয়। সৌদি আরব প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করে, তা ট্রাকে বহন করতে গেলে হাজার হাজার তেলবাহী ট্রাক প্রয়োজন হবে। তাই শেষ পর্যন্ত সমাধান খুঁজতে হচ্ছে সমুদ্রপথেই।
এই সংকটের প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যে ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। যদিও মজুত তেল ও বিকল্প সরবরাহের কারণে বাজারে কিছুটা স্থিতি রয়েছে, তবে দীর্ঘদিন সৌদি সরবরাহ ব্যাহত হলে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপের কয়েকটি শোধনাগার ইতিমধ্যেই বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
তেলের রাজ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইয়ানবু কি দ্রুত ফিরবে নাকি সোহরের বিকল্প পথই হয়ে উঠবে নতুন বাস্তবতা? কারণ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে যুদ্ধের রেখা যত বদলাচ্ছে, তেলের পথও তত বদলে যাচ্ছে।