Image description

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিবেচনার কথা প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। কোনো কোনো বিশ্লেষণে বিষয়টিকে ভারতের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আবার কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তিটিকে ঘিরে অতিরিক্ত আতঙ্কের কারণ নেই।

তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও মতামত বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য পরিসর এবং তাতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে নয়াদিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

সাম্প্রতিক এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (২) শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের স্বার্থ, অর্থনীতি ও জনগণের জন্য কতটা লাভ হবে, তা আগে মূল্যায়ন করা হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর অবস্থান, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির সামগ্রিক হিসাব করা হবে।

এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও মক্কা চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠলে তাতে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত ৭ আগস্ট মক্কায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, যৌথ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। ফলে চুক্তিটি প্রকাশের পর থেকেই একে অনেকে ন্যাটোর আদলে সম্ভাব্য বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে ভারতীয় বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, এখনই এটিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত হবে।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ পাওয়া যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যে। ২১ আগস্ট নয়াদিল্লিতে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগদানের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহ ভারত নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছে। ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এই চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে এশিয়ায় নতুন শক্তির অক্ষ তৈরির প্রেক্ষাপটে দেখেছে। ২১ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে বাংলাদেশও দরজা খোলা রেখেছে। প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঢাকার বাড়তে থাকা যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্প বাড়ানোর প্রবণতাকে একই ধারার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

পরে ২৫ আগস্ট ‘ইন্ডিয়া টুডে’ আরও এক প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের দিকে মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য বিস্তার হিসেবে ব্যাখ্যা করে। প্রতিবেদনের শিরোনামেই প্রশ্ন তোলা হয়, বাংলাদেশের প্রবেশের বিনিময়ে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ কী দিতে পারে এবং এর বিনিময়ে ঢাকাকে কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ছাড়তে হতে পারে। অর্থাৎ ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে শুধু বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ নয়, চুক্তির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য কীভাবে বদলাতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘হিন্দুস্তান টাইমস’ও বাংলাদেশের আগ্রহকে সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা, প্রবাসী আয়, জ্বালানি ও বিনিয়োগ—এসব বিষয় বাংলাদেশের হিসাবের মধ্যে থাকতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যদি চুক্তিতে যুক্ত হয়, তাহলে তা দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ধরনের কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সংবাদমাধ্যমটি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছে, এখনো বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিশ্লেষণ তুলনামূলকভাবে সতর্ক। চুক্তি নিয়ে তাদের একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা—এই তিনটি শক্তি এক জায়গায় আসায় চুক্তিটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা কতটা হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে তিন দেশের অভিন্ন হুমকি-ধারণা কতটা শক্তিশালী তার ওপর। কারণ তিন দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকার এক নয়।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত কংগ্রেস নেতা ও সাবেক কূটনীতিক শশী থারুরের বিশ্লেষণেও ভারতের জন্য সতর্কতার কথা বলা হয়েছে, তবে আতঙ্কিত হওয়ার পক্ষে তিনি নন। তার মতে, মক্কা চুক্তিকে এখনই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি ভুলভাবে বোঝার ঝুঁকি আছে। চুক্তিটি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে এমন কোনো অবাধ নিরাপত্তা ছাতা দিচ্ছে—এমন ধারণাও অতিরঞ্জিত। বরং ভারতের উচিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা।

ভারতীয় বাংলা সংবাদমাধ্যম ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ অবশ্য চুক্তির প্রথম দিকের বিশ্লেষণে অনেক বেশি উদ্বেগমুখী ভাষা ব্যবহার করেছে। ৮ আগস্টের প্রতিবেদনে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে তুলে ধরে এর ফলে ভারত ও ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে কি না, সে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে আরেক প্রতিবেদনে চুক্তিকে ঘিরে সম্ভাব্য বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

হিন্দি সংবাদমাধ্যম ‘অমর উজালা’ বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ইতিবাচক মনোভাবকে ভারতের জন্য সম্ভাব্য উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নিজের কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে চাইছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ চুক্তিতে যুক্ত হলে ভারতের জন্য তা চিন্তার কারণ হতে পারে—এমন বিশ্লেষণ সেখানে পাওয়া যায়।

‘নবভারত টাইমস’ও বাংলাদেশের অবস্থানকে একইভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। ২৩ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান সরকারের পক্ষ থেকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা হয়নি। একই সঙ্গে চুক্তিতে আরও কয়েকটি দেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সব বিশ্লেষণ যে আতঙ্কের, তা নয়। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর একটি সম্পাদকীয়তে সরাসরি বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বিষয় থাকলেও ‘অ্যালার্মিজম’ বা অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর প্রয়োজন নেই। চুক্তিটির এখনো ন্যাটোর মতো স্থায়ী সামরিক কমান্ড, স্থায়ী সদর দপ্তর কিংবা সমন্বিত বাহিনী নেই। ফলে এর বাস্তব সামরিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে কী দাঁড়াবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের উদ্বেগের আরেকটি কারণ পাকিস্তান।

ভারতীয় বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে বাধ্যতামূলক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামোয় পাকিস্তান যুক্ত হওয়ায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হলে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম—দুই দিকেই এমন একটি নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি হতে পারে, যা নয়াদিল্লিকে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করবে। ‘ইন্ডিয়া টুডে’র বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।

ভারতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা সৌদি আরব। নয়াদিল্লির সঙ্গে রিয়াদের তেল, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে গভীর হয়েছে। ফলে সৌদি আরবকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোয় দেখার পাশাপাশি ভারত চায়, রিয়াদের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেন এই নতুন জোটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ভারতের সমুদ্রবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উপসাগরীয় অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চুক্তিটির সামুদ্রিক প্রভাব নিয়েও নয়াদিল্লির আগ্রহ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের আলোচনায় বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগদানের বিষয়টি এখনো সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বাস্তব সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়। কোথাও এটিকে ভারতের জন্য ‘নতুন উদ্বেগ’, কোথাও ‘কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’, আবার কোথাও অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার মতো একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি তাই শুধু কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ এবং ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক—সবকিছুর হিসাব জড়িয়ে আছে।

 

ঢাকার জন্য মূল প্রশ্নও সেখানেই। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কী ধরনের বাস্তব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, তার বিপরীতে কোন কোন কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—সেটিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে। আর ভারতীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো—বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই জোটে যুক্ত হয়, তাহলে সেটিকে শুধু পশ্চিম এশিয়ার একটি প্রতিরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে দেখবে না নয়াদিল্লি; বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে।