নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ নেমে আসে পানির ভয়াবহ ঢল। এতে ধ্বংস হয় সীমান্ত এলাকার বসতি। পরে সেই পানি গিয়ে পড়ে ত্রিশূলী নদীতে। গতকাল বুধবার সকালে নেমে আসে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, নেপালে ১৬২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫৭৯ জন। অন্যদিকে তিব্বতে নিহত হয়েছেন তিনজন। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫৫৮ জন।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর হিসাবে, প্রায় ৩০ কিলোমিটারের ওই নদীপথে এটা সর্বশেষ ১৩ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভয়াবহ বন্যা।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে বলেছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্পের পর হয় বড় ধরনের ভূমিধস। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে নেমে আসে পানির স্রোত।
বুধবারের এই দুর্যোগ শুধু আবহাওয়ার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দুটি প্রক্রিয়ার মিলনে ঘটেছে এই দুর্যোগ। প্রথমত, হিমালয় গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে বরফ গলে পানি এমন জায়গায় জমা হচ্ছে যেখানে পানি ধরে রাখা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, হিমালয় পর্বতটি এখনো তৈরি হচ্ছে। কারণ পৃথিবীর দুুটি বড় প্লেট (ভারতীয় ও ইউরেশীয়) এখনো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। এই ধাক্কায় হিমালয় ধীরে ধীরে আরও উঁচু হচ্ছে। যা নেপালকে পরিণত করেছে দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশে।
ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সামনে এসেছে তিনটি ব্যাখ্যা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে বলেছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্পের পর হয় বড় ধরনের ভূমিধস। এতে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে নেমে আসে পানির স্রোত।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসও ওই সময় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প শনাক্ত করেছিল। তবে পরে সংস্থাটি জানায়, ওই কম্পন ভূমিকম্পের কারণে নয়, হয়েছিল ভূমিধসের কারণে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) বিজ্ঞানী শাশ্বত সান্যালের ব্যাখ্যাও কাছাকাছি।
বুধবারের এই দুর্যোগ শুধু আবহাওয়ার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দুটি প্রক্রিয়ার মিলনে ঘটেছে এই দুর্যোগ। ছবি : রয়টার্সতার মতে, সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে খোলায়। একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে আটকে দেয় নদীটি। পরে জমে থাকা পানি হঠাৎ বেরিয়ে আসে প্রবল স্রোতে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও হিমবিজ্ঞানী রিজান ভক্ত কায়স্থও একই ধরনের ধারণা দিয়েছেন।
‘আগের বছরও লেন্দে খোলা একই ধরনের ঘটনায় আটকে গিয়েছিল। ২৪ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিও এখন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে’, নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করে জানিয়েছেন রিজান ভক্ত।
তিনটি ব্যাখ্যার মধ্যে মূল বিষয়টি একই। হিমালয়ের কোনো একটি স্থানে বন্ধ হয়ে যায় নদীর প্রবাহ। পরে জমতে থাকে পানি। আর সেই বাধা ভেঙে মুহূর্তে নেমে আসে বিশাল পানির ঢল।
নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত রাসুওয়াগাধিতে দেখা গেছে এই ঢলের ভয়াবহ চিত্র। চীন-নেপাল সীমান্তের প্রধান প্রবেশপথের দিকে থাকা একটি সেতু পানির স্রোতে ভেসে যায়। সেখানে আশঙ্কা করা হচ্ছে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর।
নেপাল এমন হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনাকে অনেক সময় বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’।
আইসিআইএমওডির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার হার বেড়েছে দ্বিগুণ। এর ফলে ঝুঁকি বাড়ছে হিমবাহ থেকে নেমে আসা নদীগুলোর নিচের দিকে থাকা প্রায় ২০ লাখ মানুষের।
অবশ্য দুর্যোগের এমন ঘটনা নতুন নয়। গত বছর একই এলাকার বন্যাটিও যুক্ত ছিল তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে। তারও বহু আগে ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের ঝাংঝাংবো উপত্যকার একটি হ্রদ হঠাৎ ছেড়ে দেয় পানি। ওই ঘটনায় মারা যান ২০০ জনের বেশি মানুষ। ধ্বংস হয় ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সান কোশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নেপালের ইতিহাসে বড় ধরনের এমন বন্যার ঘটনা অন্তত ২৪টি। এর মধ্যে ১৪টির উৎপত্তি নেপালে এবং ১০টির তিব্বতে।
গত বছর ৮ জুলাইয়ের বন্যার উৎসও পরে আরও স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্ত থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে এবং প্রায় ৫ হাজার ১৫০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের ওপর তৈরি হ্রদ হঠাৎ ছেড়ে দিয়েছিল পানি।
হিমবাহ গলে পাহাড়ের ওপর তৈরি হচ্ছে এমন শত শত হ্রদ। এগুলোর পানি কোথায়, কখন এবং কীভাবে বেরিয়ে যাবে, তা সবসময় সম্ভব নয় অনুমান করা।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য বলছে, তাদের ২০২০ সালের তালিকায় কোশি, গান্ডাকি ও কার্নালি অববাহিকায় রয়েছে ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ হ্রদ। এর মধ্যে ৪৭টিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল বিপজ্জনক হিসেবে। তাদের মধ্যে ২৫টি তিব্বতে, ২১টি নেপালে এবং একটি রয়েছে ভারতে।
নেপালে ১৬২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫৭৯ জন। ছবি : রয়টার্সবিপদের আরেকটি বড় কারণ আগাম সতর্কতার ঘাটতি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের দুর্যোগের পর নেপালের আবহাওয়া বিভাগের মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন, তিব্বত অঞ্চল থেকে তথ্য পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই নেপালের। তবে চীন থেকে পাওয়া যায় বৃষ্টির কিছু পূর্বাভাস। কিন্তু হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা এই বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে না।
২০২৫ সালে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সীমান্ত থেকে বন্যা নেপালে প্রবেশের প্রায় এক ঘণ্টা আগে তারা খবর পেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো পূর্বাভাসব্যবস্থা থেকে আসেনি সেই সতর্ক বার্তা।
এরপর থেকে চীনের সঙ্গে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় নেপাল সরকার। একই বছরের জুলাইয়ে জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড নেপালের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অনুদান অনুমোদন করে। তবে সীমান্তের দুই পাশে এখনো গড়ে ওঠেনি কার্যকর ‘রিয়েল টাইম’ সতর্কতা ব্যবস্থা।
নেপালের ঝুঁকির আরেকটি কারণ আরও গভীরে। দেশটি অবস্থিত ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় প্লেটের সংঘর্ষস্থলে। দুটি প্লেট বছরে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিমিটার করে। এই সংঘর্ষ থেকেই প্রায় ৫ কোটি বছর আগে সৃষ্টি শুরু হয় হিমালয়ের।
এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান। হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন ও দ্রুত বেড়ে ওঠা পর্বতমালাগুলোর একটি। পর্বতমালাটি বছরে উঁচু হচ্ছে প্রায় ৫ মিলিমিটার করে।
তিনটি ব্যাখ্যার মধ্যে মূল বিষয়টি একই। হিমালয়ের কোনো একটি স্থানে বন্ধ হয়ে যায় নদীর প্রবাহ। পরে জমতে থাকে পানি। আর সেই বাধা ভেঙে গেলে মুহূর্তে নেমে আসে বিশাল পানির ঢল।
এই চলমান ভূতাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে ভূমিকম্পের। বড় ভূমিকম্পে দুর্বল হয়ে যায় পাহাড়ের ঢাল। তবে বড় ভূমিকম্প না হলেও ছোট কম্পন অনেক সময় ধসিয়ে দিতে পারে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা পাহাড়ি ঢালকে।
গতকালের ঘটনাতেও ঘটতে পারে এমন কিছু। এমনকি ভূমিকম্প নয়, শুধু ভূমিধসের কারণে তৈরি কম্পনও পাহাড়ি ঢাল ধসিয়ে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে নেমে আসতে পারে আকস্মিক বন্যা।
গবেষণা বলছে, এমন বন্যায় ঝুঁকিতে রয়েছে চীন ও নেপালের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার মহাসড়ক, ১০৩টি সেতু, দুটি বড় বন্দর এবং দুই দেশের ৩ হাজার ৩০১টি ভবন।
সূত্র : এনডিটিভি