মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো সমীকরণে নতুন রেখা টেনেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সরাসরি কোনো দেশকে লক্ষ্য করে করা না হলেও এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় তৈরি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। আর সেই সমীকরণে তুরস্ক ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরাইলের সাম্প্রতিক (১৮ আগস্ট) হামলার পর সৃষ্ট উত্তেজনা কমাতে ইতোমধ্যে জর্ডানে মার্কিন মধ্যস্থতায় সিরিয়া ও ইসরাইলের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে উত্তপ্ত ক্ষেত্র এখন সিরিয়া। আঙ্কারা যেখানে নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাচ্ছে, সেখানে ইসরাইল সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব বিস্তারে নাখোশ।
এই অবস্থায় তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে টানাপোড়েন আরও গভীর রূপ নিয়েছে। আর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এই বাস্তবতাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের গাঁটছড়া ইসরাইলকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, গত ১৮ আগস্ট তুরস্ক সীমান্তের কাছে একটি সিরীয় বিমানঘাঁটি আবু আল-দুহুরে ইসরাইলি বোমা হামলা হয়। এরপর তুরস্ক ও ইসরাইল একে-অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। যা দুটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার লড়াইকে আরও তীব্র করেছে।
ওই হামলার পর তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন দূত টম ব্যারাকের কাছ থেকে ইরাইলের বিরুদ্ধে বিরল সমালোচনা আসে। তিনি ওই হামলাকে ইসরাইলের 'অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা' বলে বর্ণনা করেছেন।
টম ব্যারাকের ভাষ্য ছিল, ‘তুরস্কের সেনা মোতায়েনের যে আশঙ্কা দেখিয়ে ইসরাইল হামলা চালিয়েছিল, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তুরস্ককে যুদ্ধে টেনে আনার পায়াতারা করছে ইসরাইল।’
পরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় অভিযোগ তোলে, ইদলিবের ওই ঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দিতে যাচ্ছিল সিরিয়া। ইসরাইলের অভিযোগ, ঘাঁটিটিতে তুর্কি সেনাদের পরিচালনায় রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কার্যালয় ওই ঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের দাবিটিকে 'অসমর্থনযোগ্য' বলে নাকচ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আল দুহুরে ইসরাইলের ওই হামলাটি সিরিয়া এবং বৃহত্তর অঞ্চল নিয়ে তুরস্ক ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান অসঙ্গতিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরেছে।
তুরস্ক-ইসরাইল টানাপোড়েনের নেপথ্যে
সিরিয়ার প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের জন্য আঙ্কারা দামেস্ককে সামরিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে।
এ কারণে ইসরাইল সিরিয়ার বর্তমান সরকারকে একটি হুমকি হিসেবে দেখে। আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ইসরাইল দেশটিতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এমনকি তারা দক্ষিণ সিরিয়ায় বিভিন্ন অবস্থানে দখলদারিত্বও কায়েম করেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, ইসরাইল সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবকাঠামো স্থাপনেরও বিরোধিতা করে আসছে। যা সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরাইলের সামরিক কার্যকলাপের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করেছে।
ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ২০২৪ সাল থেকে গাজা ইস্যুতে গুরুতরভাবে খারাপ হতে শুরু করে। গত জুনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের একটি ঘোষণায় তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ঘোষণা করেন, তুরস্কের নিরাপত্তা আলেপ্পো থেকে, দামেস্ক থেকে ও বৈরুত থেকে শুরু হয়। আমাদের ভাইদের ওপর যেকোনো হামলায় আমরা চোখ বন্ধ করে থাকব না।'
ইসরাইলের ভাষা এখন আরও কড়া
ইসরাইল তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ভূমিকাকে নিজেদের জন্য একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরছে। এমনকি কিছু ইসরাইলি রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক তুরস্ককে 'নতুন ইরান' বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট পিছিয়ে রয়েছে। এই অবস্থায় তার লিকুদ পার্টি একটি বিতর্কিত নির্বাচনি বিলবোর্ড স্থাপন করেছে।
সেখানে এরদোয়ানের পাশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে দেখানো হয়েছে। বিলবোর্ডে লেখা আছে, 'তারা চায় নেতানিয়াহু হেরে যাক। তাদের জিততে দেবেন না।'
তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস বলছেন, 'তুরস্ক সম্পর্কে ইসরাইলি উদ্বেগের কারণ হলো আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান বৈরী বক্তব্য এবং এরদোয়ানের আঞ্চলিক সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সক্ষমতা।'
রয়টার্স লিখেছে, বিশেষ করে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানে যেকোনো হামলা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। চুক্তিটি তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও নতুন কৌশলগত হিসাব তৈরি করেছে।
এমনকি তুরস্ক দোহায় কাতার-তুরস্ক সম্মিলিত যৌথবাহিনী কমান্ড ও পরিচালনা করে থাকে। কাতারে তিন হাজারের মতো তুর্কি সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। তাছাড়া সোমালিয়ার মোগাদিসুতে পাঁচ শতাধিক সৈন্যসহ একটি সোমালি-তুর্কি টাস্কফোর্স কমান্ডও রয়েছে।
লিন্ডেনস্ট্রস মনে করেন, তুরস্কের যদি কাতারে ও সোমালিয়ায় ঘাঁটি থাকে এবং সিরিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকে- সেটা ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সম্প্রতি ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ তার এক্স পোস্টে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে সিরিয়ায় ইসরাইলের অভিযান নিয়ে আঙ্কারাকে মাথা ঘামানোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
মক্কা চুক্তি কি ইসলামিক ন্যাটো
তুরস্কের সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ইলকের সেজার তুর্কি টুডেকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি ’ভূমিকম্পীয় পরিবর্তন’ ঘটেছে। মক্কা চুক্তির শর্ত (এক দেশে হামলা হলে তিন দেশে হামলা বিবেচ্য) ন্যাটোর ৫নং অনুচ্ছেদের সমতূল্য।
দ্য উইক লিখেছে, নতুন এই জোটের তিনটি দিক থেকে সুবিধা রয়েছে। জোটটিতে রয়েছে সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি, তুরস্কের দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী (ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম) ও অস্ত্রশিল্প এবং পাকিস্তানের যুদ্ধ-পরীক্ষিত সামরিক ও পারমাণবিক অস্ত্রাগার। যা সম্মিলিতভাবে প্রত্যেক দেশের প্রতিপক্ষের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করতে বাধ্য।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক উমাইর জামাল মতপ্রকাশ করেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আপাতত ওয়াশিংটনকে খুব বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদে এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারাতে পারে ওয়াশিংটন।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য উইক