Image description

ইরানকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন আগামী সপ্তাহ থেকে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন ও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পাল্টা জবাবে শনিবার ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে—তারা যদি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে, তাহলে তেহরান তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইয়ের এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তেহরানের বার্তা স্পষ্ট—ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক অভিযান যদি আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়, তাহলে এর প্রতিক্রিয়াও শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফও জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তেহরান নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে একাধিক বার্তা পেয়েছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের চাপের বিপরীতে ইরান আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি বিকল্প কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপকে এখন সামরিক অভিযানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য শুধু ইরানের সরকার ও আর্থিক ব্যবস্থা নয়; তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক নেটওয়ার্ককেও চাপের মধ্যে আনা।

এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ইরানের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য যদি নতুন করে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযানে যুক্ত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে আরও বড় সংঘাতে যাওয়ার প্রয়োজন কমাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হবে, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন যে অর্থনৈতিক চাপকে যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে দেখছে, তেহরান সেটিকেই যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

এই সংকটের প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও স্পষ্ট। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে নিজের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য দেখাতে চাইলেও ইরান, গাজা ও ইউক্রেন—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই বড় ধরনের স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়।

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানি ও পেট্রলের দাম নিয়ে উদ্বেগ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কারণ মার্কিন ভোটারদের কাছে পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে তার রাজনৈতিক দায় সরাসরি হোয়াইট হাউসের ওপর পড়তে পারে।

এ কারণেই ইরান সংকট এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই যত ঘনিয়ে আসছে, ইরান ইস্যুতে দ্রুত ফল দেখানোর চাপও তত বাড়ছে।

তবে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মিসরসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মতো প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ এবং ইরানের পাল্টা আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া—দুটিই একই সঙ্গে বাড়ছে। এর সঙ্গে যদি হরমুজ প্রণালিতে নতুন উত্তেজনা যুক্ত হয়, তাহলে সংকটটি শুধু ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন—তিন ক্ষেত্রেই এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের চোখে তাই আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ যদি তেহরানকে আরও কঠোর অবস্থানে নিয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নতুন করে সামরিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।