সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী–পাকিস্তানের তিন সামরিক শাখার উপর আরও স্পষ্ট একক কমান্ড। সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দেশটির অতিসংবেদনশীল পরমাণু ও কৌশলগত অস্ত্র পরিচালনার শীর্ষ কাঠামোও। বিরোধীদের ওয়াকআউট, সরকারের শরিক দলের আপত্তি এবং সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা না হওয়ার অভিযোগের মধ্যেই ২০ আগস্ট একই দিনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও সিনেট পাস করেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। রাষ্ট্রপতির সম্মতি এবং সরকারি গেজেট প্রকাশের পর সেগুলি ইতিমধ্যেই আইনে পরিণত হয়েছে। ফলে গত বছর সংবিধান সংশোধন করে প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যে বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, এ বার তার আইনি ও প্রশাসনিক ভিতও প্রায় সম্পূর্ণ হল।
আইন দুটি হল ‘ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’। বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রথমে জাতীয় পরিষদে বিল দুটি তোলেন। পরে সিনেটেও সেগুলো পাস হয়। পাকিস্তানের সংসদের সরকারি নথি বলছে, ওই দিনই রাষ্ট্রপতির সম্মতি মেলে এবং আইন দুটি গেজেটেও প্রকাশিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস বা সিডিএফ-এর পদ ঘিরে। নতুন আইনে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ গঠনের আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। এটিই হবে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর এবং তা থাকবে সিডিএফ-এর কমান্ড ও কর্তৃত্বের অধীনে। সিডিএফ জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং তিন বাহিনীসংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সামরিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করবেন।
এই পদে বর্তমানে রয়েছেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। গত নভেম্বরে পাকিস্তানের ২৭তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পুরনো চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি-র পদ বিলুপ্ত করে সিডিএফ পদ তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে ঠিক হয়, সেনাপ্রধানই সমান্তরাল ভাবে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের দায়িত্ব পালন করবেন। মুনির হন পাকিস্তানের প্রথম সিডিএফ।
নতুন আইনে তার দপ্তরের ক্ষমতার সীমাও স্পষ্ট করা হয়েছে। তিন বাহিনীর যৌথ অভিযান, বহু ক্ষেত্রভিত্তিক সামরিক সমন্বয়, কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব থাকবে সিডিএফ-এর হাতে। আইন অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর উপর তার ‘অপারেশনাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ থাকবে, যদিও তিনি এ ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। নির্দিষ্ট পর্যায়ের সামরিক সদস্যের অবসর, চাকরিতে রাখা বা অব্যাহতি-সংক্রান্ত কিছু ক্ষমতাও সিডিএফকে দেওয়া হয়েছে।
পরমাণু কমান্ডে কী বদল
দ্বিতীয় আইনটি আরও সংবেদনশীল। পাকিস্তানের ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (এনসিএ) হল দেশটির পরমাণু নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পদের উপর সর্বোচ্চ তদারকি সংস্থা। এর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, পরমাণু নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পদ নিয়ে সর্বোচ্চ নজরদারি চালায় এই সংস্থা।
পুরনো ২০১০ সালের আইনে এনসিএর সদস্য ছিলেন চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি। কিন্তু গত বছরের সাংবিধানিক সংশোধনে সেই পদই উঠে যাওয়ায় পুরনো আইনের সঙ্গে নতুন সামরিক কাঠামোর অসঙ্গতি তৈরি হয়েছিল। নতুন সংশোধনীতে তাই ওই পদের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন প্রতিরক্ষা কমান্ডের সঙ্গে এনসিএর কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
একই সাংবিধানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছে কমান্ডার অব ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড-এর নতুন চার তারকা পদ। পাকিস্তানের কৌশলগত বাহিনী যার সঙ্গে দেশটির পরমাণু সক্ষমতাও যুক্ত, তার কার্যকর সমন্বয় দেখবে এই কমান্ড। গত জুলাইয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আমের রাজাকে চার তারকা জেনারেল পদে উন্নীত করে দেশের প্রথম ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডার নিয়োগ করেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
সরকারের যুক্তি, এর লক্ষ্য তিন বাহিনীর মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয়। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার সংসদে বলেছেন, পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমের সুফল দেখেছে। সেই সমন্বয়কে কোনও একটি অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নিয়ে আসাই নতুন আইনের উদ্দেশ্য।
কিন্তু আইন পাসের ধরন নিয়েই সংসদে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। বিল দুটি বৃহস্পতিবারের জাতীয় পরিষদের মূল কার্যসূচিতে ছিল না। একই দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা সেগুলি অনুমোদন করে, পরে সংসদে তোলা হয়। সরকারের শরিক পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, তিনি আইনের বিষয়বস্তুর বিরোধী নন, কিন্তু যেভাবে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তা আনা হয়েছে, তাতে তার আপত্তি রয়েছে। তার প্রশ্ন, আইনটি বিতর্কিত না হলে, পদ্ধতির কারণে সেটিকে বিতর্কিত করা হচ্ছে কেন? যদিও পরে তার দলের আইনপ্রণেতারা বিলের পক্ষেই ভোট দেন।
সিনেটে আপত্তি আরও তীব্র হয়। বিরোধীদলীয় নেতা আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস প্রশ্ন তোলেন, গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিল সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে না পাঠিয়ে সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে এত দ্রুত পাস করা হচ্ছে কেন। পিটিআই ও জেইউআই-এফ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। এএনপির আইমাল ওয়ালি খানও বিলগুলি কমিটিতে পাঠিয়ে আলোচনা করার দাবি জানান।
এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। ২০২৫ সালের ২৭তম সংশোধনীর সময়ই বিরোধীরা অভিযোগ করেছিল, নতুন ব্যবস্থা পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করছে। সরকার পাল্টা যুক্তি দিয়েছিল, আধুনিক যুদ্ধে স্থল, আকাশ, সমুদ্র, সাইবার ও কৌশলগত শক্তিকে একসঙ্গে পরিচালনার জন্য একক সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।
এ বার সেই সাংবিধানিক পরিবর্তন কাগজে-কলমে সামরিক প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নেমে এল। তিন বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে পরমাণু ও কৌশলগত বাহিনীর শীর্ষ কাঠামো–সবটাই নতুন ছকে সাজাচ্ছে পাকিস্তান। আর সেই নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, এমন এক সময়ে, যখন দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব নিয়েই বিতর্ক তুঙ্গে।