Image description

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে সরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন। আজ শনিবার (২২ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে তার মন্ত্রিত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে।

 

জহির উদ্দিন স্বপনকে কেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হলো, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তার মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি। ফলে আলোচনায় থাকা বিভিন্ন কারণের কোনটি সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

 

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন। পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। আরেক প্রজ্ঞাপনে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা হিসেবে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

 

এই পরিবর্তনটি এসেছে সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় প্রথম বড় রদবদলের পর। গতকাল শুক্রবার বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পড়ান। তাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাচিং প্রু জেরী ও রশিদুজ্জামান মিল্লাত। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। পরে তাদের দপ্তর বণ্টন করা হয়।

 

নতুন বণ্টনে আন্দালিভ রহমান পার্থ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এর মধ্য দিয়ে জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও জানিয়েছিলেন, স্বপন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হচ্ছেন।

 

জহির উদ্দিন স্বপন চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। মন্ত্রী হওয়ার পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নিয়ে বেশ কিছু সংস্কারের কথা বলেছিলেন তিনি।

 

দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৫ মার্চ তিনি একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের গুরুত্বের কথা বলেছিলেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিলে তিনি বলেন, বারবার মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা গড়ে ওঠে না। তার ভাষ্য ছিল, এক দিন একটি মন্ত্রণালয় এবং পরদিন অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

 

ওই অনুষ্ঠানে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়কে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, বেতন-কাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে একটি রূপরেখা তৈরির কথাও জানিয়েছিলেন। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি কথা বলেন।

 

এরপর কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সক্রিয় ছিলেন জহির উদ্দিন স্বপন। ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনায় তিনি সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা ও টেলিভিশনের দর্শক পরিমাপের পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনার কথা বলেন। আগস্টেও তিনি গণমাধ্যম কমিশন, সাংবাদিকতার মান ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ১৭ আগস্ট তিনি জানান, স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

 

এ অবস্থায় হঠাৎ মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে কয়েকটি ব্যাখ্যা ঘুরছে। একটি সূত্রের ভাষ্য, জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাজে বেশি যুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ কারণে তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে।

 

আরেকটি আলোচনায় বলা হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কিছু বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন পাচ্ছিলেন না। ফলে তাকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।

 

আরও একটি দাবি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। সেটি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের নিবন্ধন বা অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়। এ নিয়ে সম্প্রতি দৈনিক দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বলে আলোচনা রয়েছে। পরে প্রতিবেদনটি সংবাদপত্রটির ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কেন প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে দেশ রূপান্তর কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে ওই প্রতিবেদনে আলোচিত বিষয়কে জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব পরিবর্তনের কারণ হিসেবে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই।

 

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সাধারণত দুটি বিষয় আলাদা করে দেখার প্রয়োজন মনে করেন। একটি হলো মন্ত্রিসভার সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস। অন্যটি হলো কোনো মন্ত্রীর কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন। জহির উদ্দিন স্বপনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

 

তবে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। বরং মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমেছে, এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা কঠিন। বরং দায়িত্বের ধরন বদলেছে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কাজে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

 

এ ছাড়া জহির উদ্দিন স্বপন বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। তিনি দলটির মিডিয়া সেলের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং দলের নীতিনির্ধারণী পরিসরেও ছিলেন। মন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তার সক্রিয়তা ছিল। ফলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তাকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় আসতে পারে।

 

অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আন্দালিভ রহমান পার্থকে দেওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। পার্থ বিএনপির জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

সরকারের ছয় মাস পূর্তির পর এই রদবদলে একাধিক রাজনৈতিক হিসাব কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত করা, জোটের অংশীদারদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন হয়েছে। ফলে শুধু জহির উদ্দিন স্বপনের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার মন্ত্রণালয় পরিবর্তনকে যুক্ত করা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

 

সব মিলিয়ে জহির উদ্দিন স্বপনের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ছাড়ার নির্দিষ্ট কারণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের কথাও সরকারিভাবে বলা হয়নি। তাই বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আলোচনাকে আপাতত সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখতে হবে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ২১ আগস্ট মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বদলেছে। ২২ আগস্ট তার পদত্যাগ গ্রহণ করে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। এখন তার নতুন দায়িত্বে কী ভূমিকা থাকে, সেটিই দেখার বিষয়।