জোস পল
রিপাবলিকান পার্টির একজন কংগ্রেস সদস্যের চিফ অব স্টাফের সঙ্গে একটি দীর্ঘ এবং ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। আমরা ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং এই সম্পর্কের প্রতি রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যের ‘আশঙ্কা’ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সম্পর্কের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে তারা এ বিষয়ে কিছু বলার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তা-ও আমরা আলোচনা করেছিলাম।
কিন্তু আলোচনার সূচির শেষ বিষয় ছিল ‘শরিয়ামুক্ত আমেরিকা ককাস’-এ ওই কংগ্রেস সদস্যের অংশগ্রহণ। এটি মার্কিন প্রতিনিধিদের একটি নতুন গঠিত দল। ওই দলটি এমন একটি জিনিসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে যাকে তাদের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বর্ণনা করেছেন ‘সহিংসতা, নারীর প্রতি নির্যাতন এবং নির্মম রাজনৈতিক বিজয়ের বাহক হিসেবে। এসবের আইন ও রীতিনীতিগুলোর আমেরিকান সমাজে কোনো স্থান নেই।’
‘ওহ, তা নিয়ে চিন্তা করবেন না,’ হাত নেড়ে কর্মীটি বললেন। “মুসলিমরা কেবল সহজে নিশানা করার মতো লক্ষ্যবস্তু। আসলে লক্ষ্য হলো ভারতীয়রা এবং সামগ্রিকভাবে বাদামী চামড়ার মানুষরা সেই সঙ্গে ইহুদিরাও। এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ রাখার পথে বাধা সৃষ্টি করবে না। প্রকৃতপক্ষে এই ককাসের একমাত্র সদস্য যিনি ইসরায়েল সম্পর্কে এই সব আজেবাজে কথায় বিশ্বাস করেন, তিনি হলেন র্যান্ডি ফাইন।”
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া উসকে দেওয়ার বিষয়টি এখন দৃশ্যমান এবং অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছে, এতটাই যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন প্রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে জর্জ ডব্লিউ বুশের দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকান, যিনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর একটি মসজিদে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘ইসলাম হলো শান্তি’। অন্তর্ভুক্তিমূলক এই ধরনের প্রচেষ্টা রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে প্রকাশ্য ধর্মান্ধতা।
এই ধর্মান্ধতা মুসলিম-বিরোধী হামলায় উদ্বুদ্ধ করেছে। যেমন মে মাসে সান দিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গোলাগুলির ঘটনা। এতে দুজন মুসল্লি ও একজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। সম্প্রতি ডালাস ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওযু করতে ইচ্ছুক মুসলিমদের জন্য ফুট-ওয়াশিং স্টেশন যুক্ত করার একটি প্রস্তাব টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের তীব্র বিরোধিতার মুখে দ্রুত বাতিল করা হয়; গভর্নর দাবি করেছিলেন যে এই ধরনের স্টেশন স্থাপন করা অসাংবিধানিক হবে।
এই সবের উৎস কোথায়? নিশ্চিতভাবে, এর কিছু অংশ ট্রাম্পের ২০১৫ সালের প্রথম দিনের নির্বাচনী প্রচারণার পর থেকে অনুসৃত সেই রাজনীতির প্রতিফলন, যা আমেরিকানদের বিভক্ত করতে চায়। এই ইঙ্গিত দিয়ে যে দেশটির শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের শীর্ষে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কেবল মুসলিমরাই আক্রমণের মুখে পড়ছে না, বরং সমস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ই আক্রান্ত হচ্ছে।
যার প্রমাণ কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস বা হিস্পানিক সংস্কৃতির ওপর তার প্রশাসনের আক্রমণ। কিন্তু যখন ইসলামোফোবিয়ার কথা আসে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরায়েল সরকার জেরুজালেমে একটি সেমিটিজম-বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। এটি বেশ সাধারণ একটি ঘটনা। তবে যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো কারা এতে অংশ নিয়েছিলেন। পোল্যান্ডের পিআইএস, স্পেনের ভক্স, হাঙ্গেরির ফিদেজ এবং ফ্রান্সের রাসেম্বলমেন্ট ন্যাশনালসহ ইউরোপীয় চরম ডানপন্থিদের বিভিন্ন নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন।
যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘উমেরজিহুং’ (পুনঃশিক্ষা) প্রক্রিয়ার পর সেমিটিজম-বিরোধী বিষয়ে আলোচনার জন্য ইউরোপীয় ডানপন্থীদের এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমাবেশ ছিল।
কিন্তু এই চরম ডানপন্থিরা এখন তাদের মিত্র, যেমনটা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাদের বলেছিলেন যে তারা ‘উগ্র ইসলামের আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশীদার। জানুয়ারি থেকে নেতানিয়াহু একই থিম বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি হবে ব্রিটেনের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।
এছাড়া তিনি তার পুনঃনির্বাচনী প্রচারণায় একটি বিলবোর্ডের নিচে প্রচারণা চালাচ্ছেন যার শিরোনাম ‘তাদের জিততে দেবেন না’, যেখানে হিজবুল্লাহ ও ইরানি নেতাদের মুখের পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মুখ প্রদর্শন করা হয়েছে।
ইসরায়েলের ইসলামোফোবিয়া প্রচারের এই কৌশল কেবল নেতানিয়াহুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের নিজস্ব সুনাম যখন ধূলিসাৎ হয়েছে, তখন তারা তাদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেনি। এর পরিবর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র পথ হলো আরও প্রোপাগান্ডা প্রচারণা চালানো।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন জনসংযোগ সংস্থা ‘স্ট্যাগওয়েল গ্লোবাল’ এর একটি ফাঁস হওয়া সমীক্ষায় দেখা গেছে, জনমত পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে ‘উগ্র ইসলাম’ এবং ‘জিহাদবাদ’-এর ভয় তৈরি করা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন তার দেশকে সমর্থন চালিয়ে যাওয়া উচিত তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ অনুপস্থিত। এজন্য, নেতানিয়াহু ক্রমশ এই যুক্তির দিকে ঝুঁকেছেন যে ইসরায়েল হলো ‘উগ্র ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ মডেল।’
এটি তাদের ‘হাসবারা’ কৌশলের অংশ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে কানাডায়, ‘ইউনাইটেড সিটিজেন্স ফর কানাডা’ নাম ব্যবহার করে ইসরায়েল সরকার-অর্থায়িত একটি প্রভাব বিস্তারকারী চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। সেখানে দাবি করা হয় যে দেশটিতে আসা মুসলিম অভিবাসীরা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং তারা সেখানে ইসলামি আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেক ক্ষেত্রে, আমেরিকান ও ইউরোপীয়রা এই ধরনের প্রচেষ্টাগুলো ধরে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আব্দুল এল-সায়েদের মতো বিশিষ্ট মুসলিম কংগ্রেস প্রার্থীদের প্রাথমিক নির্বাচনী বিজয়গুলো ইসলামোফোবিক বক্তৃতার বিরুদ্ধে সামগ্রিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাখ্যান প্রমাণ করেছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে, মুসলিম সম্প্রদায় ক্রমশ নিজেদের অবরুদ্ধ বা কোণঠাসা অনুভব করছে।
ইসরায়েলি সমাজ ইহুদি আধিপত্য এবং জনমিতিক সমজাতীয়তা বজায় রাখার ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো তাদের জনমিতি এবং নেতৃত্ব উভয় ক্ষেত্রেই ক্রমশ বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে।
যদিও ইসরায়েলের জন্য শান্তির পথটি হতে পারত সহজ। তবে তার বর্তমান প্রোপাগান্ডা প্রচারণার মূলে রয়েছে পশ্চিমকে ইসরায়েলের মতো করে তোলার আকাঙ্ক্ষা। এটি পশ্চিমা বহুত্ববাদের জন্য একটি পরীক্ষা। তবে পশ্চিম যদি সেই পরীক্ষায় ব্যর্থও হয়, ইসরায়েলের ধরে নেওয়া উচিত হবে না যে সেই ব্যর্থতা স্বাভাবিকভাবেই জায়নবাদকে আলিঙ্গন করার দিকে নিয়ে যাবে।
ভয় এবং ঘৃণা অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। বর্তমানের এই ইসলামোফোবিক প্রচারণা আরও গভীর ও ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের পশ্চিমা চরম ডানপন্থী মতামতের শেষ দুর্গে তার সমর্থনের পতন রোধ করার যে প্রাথমিক উদ্দেশ্য রয়েছে, তা অর্জনেও এই কৌশল সফল হবে কিনা তা মোটেও স্পষ্ট নয়।
লেখক পরিচিতি
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতির ওপর নজরদারি করা ‘এ নিউ পলিসি’ নামক একটি অলাভজনক, নিরপেক্ষ লবিং ও রাজনৈতিক সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।