আকাশে বোমার লড়াই থামেনি পুরোপুরি, হরমুজে উত্তেজনাও কাটেনি। তার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে আর এক যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প৷ এবারের অস্ত্র 'অর্থনীতি'। তেহরানকে সাহায্য করলে কোনও দেশই রেহাই পাবে না বলে তার হুঁশিয়ারি। নাম দিয়েছেন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তার বক্তব্য, ওয়াশিংটনের এই নতুন অভিযানও আগের নীতিগুলোর মতোই ব্যর্থ হবে; বরং আমেরিকার জন্য ডেকে আনবে ‘আরও পরাজয়’।
বুধবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তার দাবি, যুদ্ধ থামানোর জন্য চুক্তির যে সুযোগ তেহরানকে দেওয়া হয়েছিল, তারা তা গ্রহণ করেনি। তাই এ বার ইরানের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। আর ইরানকে অর্থনৈতিক ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে অন্য কোনও দেশ এগিয়ে এলে তাদেরও বড় আর্থিক মূল্য দিতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থা–ইরানকে কোনও ধরনের অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ দিলে সংশ্লিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তেল চোরাচালান, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া সংস্থার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথও বন্ধ করতে চান তিনি।
এই অভিযানকেই ট্রাম্প বলেছেন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’। ‘ডি-ডে’ শব্দটি মূলত ১৯৪৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডি অবতরণের সেই নির্ণায়ক দিনকে বোঝায়। এখানে শব্দটি ব্যবহার করে ট্রাম্প মূলত তেহরানকে কোণঠাসা করতে এক সর্বাত্মক ও নির্ণায়ক অর্থনৈতিক অভিযান বোঝাতে চেয়েছেন।
কিন্তু বৃহস্পতিবার পাল্টা জবাবে সেই ভাষাকেই বিদ্রূপ করেছেন আরাঘচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি ট্রাম্পের ঘোষণাকে ‘তথাকথিত অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ ও ক্রমবর্ধমান সুদের ব্যয়সহ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে মার্কিন জনতার নজর ঘোরাতেই ইরানকে সামনে এনেছেন ট্রাম্প। ব্যর্থ নীতিতে আরও জোর দিলে তার ফল হবে আরও ব্যর্থতা এবং ইরানি জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ বৃদ্ধি–এমনটাই তার বক্তব্য।
আরাঘচি আরও অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটনের এই নীতি আসলে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’, যার প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সুরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নতুন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মূল শিকার হবেন সাধারণ মানুষ।
তেহরানের সরকারি ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমও ট্রাম্পের ঘোষণাকে নতুন কিছু বলে মানতে নারাজ। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির দাবি, সামরিক পথে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার বক্তব্য, বহু বছর ধরেই ইরানের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র; সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ব্যবসা চালানোর পথও এত দিনে শিখেছে তেহরান। ফার্স সংবাদ সংস্থা আবার ট্রাম্পের ঘোষণাকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটন অবশ্য পিছিয়ে আসার কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের উপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ চাপানোর প্রস্তুতি চলছে। সোমবার সাংবাদিক বৈঠক করে নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত জানাবেন তিনি। তার ভাষায়, এক দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ-অবরোধ, অন্য দিকে নতুন নিষেধাজ্ঞা–এই ‘দুই ধাক্কায়’ তেহরানকে নত করতে চায় ওয়াশিংটন। অর্থনৈতিক চাপ সফল হলে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজনও কমতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসেন্ট।
বেসেন্টের বক্তব্যে লক্ষ্য আরও স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে এমন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে ফেলতে চায়, যা অতীতে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে মার্কিন মিত্রদেরও এখন অবস্থান বেছে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালানো দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্তরের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিও রয়েছে।
তবে এখানেই ট্রাম্পের সবচেয়ে কঠিন অঙ্ক চীন। তথ্যবিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের ২০২৫ সালের হিসাবে, সমুদ্রপথে রফতানি করা ইরানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। বেইজিংকে শাস্তির আওতায় আনা হবে কি না জানতে চাইলে বেসেন্ট সরাসরি জবাব এড়িয়ে বলেছেন, কিছু আলোচনা প্রকাশ্যে নয়, ব্যক্তিগত ভাবে করাই ভাল। চীনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়ালে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে বেইজিং, এই ঝুঁকিও রয়েছে ওয়াশিংটনের সামনে।
চাপ ইতিমধ্যেই বাড়ছে ইরানের অন্য বাণিজ্যপথেও। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে, তাদের জলসীমার দিকে দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ তুলে। তেহরান সেই অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে সাজানো বলে দাবি করেছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার অভিঘাত পড়েছে তেলের বাজারেও। বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম দুই শতাংশের বেশি বেড়ে প্রায় এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ছয় মাসের সংঘাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হওয়ায় আগেই চাপে ছিল বিশ্ব জ্বালানি বাজার। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত।
ইরান অবশ্য নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে অপরিচিত নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিভিন্ন মাত্রার মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করছে দেশটি। আর সেই অভিজ্ঞতাকেই এ বার আত্মবিশ্বাসের জায়গা হিসেবে দেখাচ্ছে তেহরান।
ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি নতুন লড়াইয়ের ময়দান এখন অর্থনীতি। ট্রাম্প চাইছেন ইরানের তেল, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ একে একে বন্ধ করতে। তেহরানের পাল্টা দাবি, সেই অস্ত্র আগেও ব্যর্থ হয়েছে, এ বারও হবে। ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ তাই সত্যিই ইরানকে নত করবে, না কি আরাঘচির ভাষায় ওয়াশিংটনের জন্য ‘আরও এক পরাজয়’ হয়ে ফিরবে–নতুন লড়াই এখন সেই হিসাবের।