Image description

চিকিৎসক নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুর ঘটনায় তার চিকিৎসক স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ইআরকি ডটকমের সম্পাদক সিমু নাসেরের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আবেদনে বিচারক মামলা প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

বুধবার (১৯ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবু শাহিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

আবু শাহিন জানান, বাদীপক্ষের আবেদনে সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ দেন।

ডা. ধীপ্রা তাবাসসুম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। গত ৪ জুন ধানমন্ডির শ্বশুরবাড়িতে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় ডা. ধীপ্রার। বারডেম হাসপাতালে আনার পথেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নির্যাতন, অবহেলা ও পরিকল্পিতভাবে পোস্টমর্টেম ছাড়াই লাশ দাফন ও আলামত গোপনের অভিযোগ তোলেন ধীপ্রার বন্ধুরা।

পরে গত ১৬ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধির ৩০৪(ক)/১৯৩/১৯৭/২০১/১০৯/৩৪ ধারায় মামলার আবেদন করেন মো. মশিউর রহমান শাহ। মামলায় নিহতের স্বামী, শ্বশুরসহ ৪ জন নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল।

প্রধান আসামিরা হলেন—নিহতের শাশুড়ি ডা. সিদ্দিকা সুলতানা, স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ (বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিয়াক বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল) এবং ইআরকি সম্পাদক সিমু নাসের।

ওই সময় অভিযোগপত্রে বলা হয়, পড়াশোনা করার সময় ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার সাথে সহপাঠি ডা. রহমত রশীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে বর্তমানে দুই বছর বয়সী একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ডা. ধীপ্রার পরিবার অপেক্ষাকৃত কম স্বচ্ছল হওয়ায় বিয়ের পর থেকেই আসামিরা তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে। ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি তীব্র ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন এবং সন্তান প্রসবের পর পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকেন।

এতে আরও বলা হয়, ২ ও ৩ নম্বর আসামি নিজেরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও ডা. ধীপ্রার চিকিৎসার খরচ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন। এমনকি তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণেও আসামিরা অন্যায়ভাবে বাধা প্রদান করেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে ডা.ধীপ্রা ‘ফিমেইল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপেও তাঁর ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা পোস্ট করেছিলেন।

অভিযোগে বাদী আরও বলেন, গত ২ জুন থেকে একাধারে তিন দিন আসামিরা ডা. ধীপ্রাকে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখে। এমনকি এই তিন দিন তাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং তাঁর দুই বছরের সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ জুন খবর পেয়ে ডা. ধীপ্রার মা ধানমন্ডির ‘বসতী গ্রীন’ আবাসন এলাকার ৪/এ রোডের ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মেয়েকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলে স্বামী তালা খুলে দেয়।

ঘর থেকে মুক্ত হয়েই ডা.ধীপ্রা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, মা, আমি ভাত খাব। এই কথা বলার সাথে সাথেই তিনি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

আলামত ধ্বংস ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে আরও বলা হয়, ডা. ধীপ্রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে না নিয়ে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করতে থাকেন। পরবর্তীতে শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদের প্রভাব বলয় ব্যবহার করে চিকিৎসার নামে দূরবর্তী বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই ডা. ধীপ্রার মৃত্যু হয়।

অভিযোপত্রে বলা হয়, মৃত্যুর পর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা তাদের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি মিথ্যা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করান এবং দাফন সম্পন্ন করেন। এটি ডা. ধীপ্রার স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আলামত ধ্বংসের একটি চেষ্টা।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এবং নিহতের পিতা-মাতা অত্যন্ত ধর্মভীরু ও অসহায় হওয়ার কারণে শুরুতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হয়েছিল। আজ বিজ্ঞ আদালতের কাছে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে জেলহাজতে আটকে রাখার এবং সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানানো হয়েছে।