অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পর এবার ধর্মান্তর ঠেকানো এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি কেনাবেচায় বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর বন্ধে কঠোর আইন করার পাশাপাশি জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনা হবে। তবে এসব বিধিনিষেধের আওতায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে জমি কেনাবেচার বিষয়টি সরাসরি পড়বে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই ইউসিসি আনব—এক দেশ, এক আইন। এরপর আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকাতে কঠোর আইন করা এবং জমি কেনাবেচায় নতুন আইনি বিধিনিষেধ আনা।’
ধর্মান্তর এবং বিজেপির ভাষায় ‘ল্যান্ড জিহাদ’—এই দুটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে দলটির রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম অংশ। তবে প্রস্তাবিত ভূমি আইনে ঠিক কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, তা স্পষ্ট করেননি শুভেন্দু অধিকারী। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে জমি বা সম্পত্তি কেনাবেচায় এতে কোনো বাধা থাকবে কি না, সেটিও তিনি জানাননি
তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যের ভূমি আইন নিয়ে তুলনা শুরু হয়েছে। এসব রাজ্যে সংরক্ষিত জনগোষ্ঠী ও নির্দিষ্ট এলাকায় কিছু জমি কেনাবেচায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জমি নিয়ে এই উদ্যোগের সঙ্গে জনসংখ্যার পরিবর্তন, অবৈধ অভিবাসন এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিজেপির বৃহত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে বিজেপি দাবি করে আসছে, অনুপ্রবেশের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর জনসংখ্যার চিত্র বদলে যাচ্ছে। একইসঙ্গে স্থানীয় মানুষ ‘বহিরাগতদের’ কাছে জমি হারাচ্ছেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে দলটি। এখন ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেস সরকার নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় সেই রাজনৈতিক বক্তব্যই নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে চলে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের সভায় বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বীরভূমসহ বিভিন্ন জেলার সংসদ সদস্য, বিধায়ক, মন্ত্রিসভার সদস্য, জেলা প্রশাসক এবং প্রায় ৭৫ জন বিডিও উপস্থিত ছিলেন। সভায় শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন সংগঠন বাঁকুড়া ও জঙ্গলমহল অঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। এসব সংগঠন অবৈধ ধর্মান্তর এবং ‘মৌলবাদী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ সময় তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, ‘অবৈধ’ ওবিসি তালিকা বাতিল করা হয়েছে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা বন্ধ করা হয়েছে এবং মহররমের সময় তলোয়ার বহন ঠেকানো হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘দুটি কাজ এখনও বাকি—ধর্মান্তর নিয়ে একটি আইন এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে আরেকটি আইন। আমি দুটিই করছি।’
প্রস্তাবিত ইউসিসি বিল পর্যালোচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর এসব মন্তব্য করলেন তিনি। চার সদস্যের ওই কমিটিকে খসড়া ইউসিসি বিল পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে চার সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে। এরপর বিলটি বিধানসভায় উত্থাপন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২৯ জুন বিধানসভায় এই উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রস্তাবিত ইউসিসির আওতায় বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনগুলোর পরিবর্তে অভিন্ন আইন কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যেসব শ্রেণির ক্ষেত্রে সংবিধানগত সুরক্ষা রয়েছে, তা বহাল থাকবে।
এদিকে আগস্টে চলমান বাজেট অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিলটি পাস হলে ইউসিসি বাস্তবায়নের পথে ভারতের চতুর্থ রাজ্য হবে পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপির জন্য এই সময়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের ইশতেহারে দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ইউসিসি কার্যকর করা হবে।