ড. মো. সাইদুল ইসলাম
ঘরে আগুন লেগেছে। আগুন নেভানো দরকার। কিন্তু বাড়ির কর্তা আগুন নেভানোর বদলে উঠানে নাটকের আয়োজন করেছেন। ঢোল বাজছে, লোক জড়ো হচ্ছে, তর্ক হচ্ছে, হাতাহাতিও হচ্ছে। সবাই ব্যস্ত উঠান নিয়ে; এখন কেউ আর জিজ্ঞেস করছে না: ঘরের আগুনের কী হলো?
রাজনীতিতে এই কৌশল নতুন নয়।
ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করে না; ক্ষমতা মানুষের মনোযোগও পরিচালনা করতে চায়। জনগণ কী নিয়ে কথা বলবে, সংবাদমাধ্যম কোন প্রশ্নকে বড় করে তুলবে, Facebook কোন বিতর্কে উত্তপ্ত হবে এবং কোন প্রশ্নটি এসবের নিচে চাপা পড়ে যাবে—আধুনিক রাজনীতিতে এগুলো ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক যোগাযোগে agenda-setting, framing, symbolic politics, diversionary politics, manufacture of consent, hegemony এবং political spectacle-এর মতো ধারণা দিয়ে এই প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়। আমি এখানে আরও সহজ দুটি অভিব্যক্তি ব্যবহার করছি—ideological guise এবং semantic cover।
অর্থাৎ, বাস্তব সমস্যার ওপর নতুন একটি আদর্শিক চাদর বিছিয়ে দেওয়া। এমন একটি ভাষ্য বা spectacle তৈরি করা, যার আকর্ষণে মানুষ আসল সমস্যাটি ভুলে গিয়ে তার উপস্থাপনা বা অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘরের ভেতরে জমছে একের পর এক প্রশ্ন: অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, গ্যাস, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি, মাদক, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, এবং রাজনৈতিক দলীয়করণ।
এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হবে। কিন্তু ঘরের এসব প্রশ্ন যত বড় হচ্ছে, উঠানের নাটকও যেন তত জমে উঠছে।
আমার পর্যবেক্ষণে, বর্তমানে অন্তত তিনটি বিষয় সেই নাটকের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করেছে: একাত্তর কার্ড, ইসলাম কার্ড এবং ভায়োলেন্স কার্ড।
*প্রথম দৃশ্য: আবার সেই একাত্তর*
একাত্তর আমাদের ইতিহাস। আমাদের স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ, বেদনা ও জাতীয় স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একাত্তরকে সম্মান করা আর একাত্তরকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতি দেখলে একটি পরিচিত pattern চোখে পড়ে। বর্তমানের প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় বর্তমান দিয়ে না দিয়ে অতীত দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একাত্তর এসেছে।
নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একাত্তর এসেছে।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একাত্তর এসেছে।
দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবারও একাত্তর।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” ধীরে ধীরে একটি powerful political discourse-এ পরিণত হয়েছিল। একটি ঐতিহাসিকভাবে মহৎ ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দলীয় political legitimacy তৈরির ভাষায় ব্যবহৃত হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সরকারের সমালোচককেও কখনো কখনো স্বাধীনতাবিরোধী narrative-এর মধ্যে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
এখানেই ইতিহাসের প্রতি সবচেয়ে বড় অবিচারটি ঘটে। কারণ ইতিহাসকে যত বেশি দলীয় অস্ত্র বানানো হয়, ইতিহাসের সর্বজনীন মর্যাদা তত কমে। আর এই narrative-এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্যগুলোর একটি জামায়াতে ইসলামী।
এটি সত্য যে ১৯৭১ সালে জামায়াত অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই অবস্থানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনা অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে পাঁচ দশক পরের প্রতিটি সদস্যের অপরাধ বা নৈতিক দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করা যায় না। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর বিষয়ে দায় হতে হয় ব্যক্তিনির্ভর এবং প্রমাণনির্ভর।
শেখ হাসিনা সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে due process, fair trial এবং রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছিল। তাই ১৯৭১-এর অপরাধের বিচার প্রয়োজন—এই নীতিগত অবস্থান এবং সেই বিচারপ্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সংগত ছিল—এই দুটি আলাদা প্রশ্ন।
এখানে Miranda Fricker-এর epistemic injustice ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর যদি একটি পরিচয় এমনভাবে আটকে দেওয়া হয় যে তার বর্তমান বক্তব্য, পরিবর্তন, নতুন নেতৃত্ব কিংবা নতুন প্রজন্মকেও পুরোনো stereotype-এর ভেতর দিয়েই বিচার করা হয়, তাহলে সত্য অনুসন্ধানের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, দলটির উপর চলতে থাকা সিম্বলিক এবং ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স অনেকটা নর্মালাইজ হয়ে যায়।
১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০২৬ সালের জামায়াতকে সমাজবৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ অভিন্ন ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ে নেতৃত্ব বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে দলটির রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমানও বিভিন্ন সময়ে ১৯৭১ নিয়ে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমাপ্রার্থনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ হয়তো বলতেই পারেন: এটি যথেষ্ট নয়। সেই বিতর্কের অধিকার অবশ্যই আছে।
কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: একটি ঐতিহাসিক বিতর্কের সমাপ্তির শর্ত কী?
যদি অবস্থান পরিবর্তনও যথেষ্ট না হয়, প্রজন্ম পরিবর্তনও যথেষ্ট না হয়, ক্ষমাপ্রার্থনাও যথেষ্ট না হয়; তাহলে সমস্যাটির সমাধান আসলে চাওয়া হচ্ছে, নাকি সমস্যাটিকে জীবিত রাখাই রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক?
আরও সহজ প্রশ্ন আছে।
২০২৬ সালের গ্যাস সংকটের উত্তর ১৯৭১ কীভাবে দেয়?বিদ্যুতের উত্তর? বেকারত্বের উত্তর? চাঁদাবাজির উত্তর? অর্থনীতির উত্তর?
দেয় না।
ঘরে আগুন লাগলে বাড়ির ইতিহাস নিয়ে সেমিনার করে আগুন নেভানো যায় না।
*দ্বিতীয় দৃশ্য: আকিদার বাহাস*
উঠানের নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যটি আরও আকর্ষণীয়।এবার মঞ্চে ইসলাম।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি কখনোই একরৈখিক ছিল না। জামায়াত, জমিয়ত, হেফাজত, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ধারার মধ্যে আকিদা, রাজনৈতিক কৌশল, মওদূদীর চিন্তা, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র এবং ইসলামী আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।
মতপার্থক্যে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো, ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্য কখনো কখনো ক্ষমতার বাজারে political commodity হয়ে উঠতে পারে।
Max Weber-এর status competition এবং Pierre Bourdieu-র field ও symbolic capital ধারণা এখানে অসাধারণভাবে কার্যকর। একই religious field-এর বিভিন্ন actor শুধু ধর্মীয় সত্যের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন না; অনুসারী, সামাজিক কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, রাজনৈতিক access এবং symbolic capital নিয়েও প্রতিযোগিতা করতে পারেন।
তখন প্রশ্ন শুধু “কার ব্যাখ্যা সঠিক?” থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়: কার অনুসারী বেশি? কার রাজনৈতিক access বেশি? ক্ষমতার দরজায় কার প্রবেশাধিকার বেশি? কে কাকে “ভ্রান্ত” ঘোষণা করতে পারে?
এখানেই theology আর politics একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
বাংলাদেশে “আকিদা”, “মিয়ারে হক”, “মওদূদীবাদ”—এসব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বহু দশক ধরে এসব আলোচনা হয়েছে। কিন্তু পুরোনো বিতর্ক যখন বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্তে হঠাৎ নতুন প্রাণ ফিরে পায়, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আমার আগ্রহ তখন theological verdict-এ নয়।
আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়: Why now? এখন কেন? দেশে এত সমস্যা থাকতে হঠাৎ এই বিতর্ক এত জরুরি হয়ে উঠল কেন? কার রাজনৈতিক লাভ হচ্ছে? কোন আলোচনা এর ফলে চাপা পড়ছে?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাক্ষাৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে একজন ধর্মীয় নেতার সাক্ষাৎ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একেবারেই স্বাভাবিক; এটিকে নিজে কোনো গোপন রাজনৈতিক পরিকল্পনার প্রমাণ বলা যায় না।
কিন্তু ব্যক্তিগত সাক্ষাতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৃহত্তর political pattern; Michel Foucault আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন: ক্ষমতা শুধু মানুষকে চুপ করিয়ে দিয়ে কাজ করে না; কী নিয়ে কথা বলতে হবে সেটি নির্ধারণ করেও ক্ষমতা কাজ করে।
অর্থাৎ silence যেমন রাজনৈতিক, speech-ও রাজনৈতিক।
দেশে গ্যাস নিয়ে প্রশ্ন আছে, আলোচনা হচ্ছে আকিদা নিয়ে। অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ আছে, আলোচনা মওদূদী নিয়ে। চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে, আলোচনা কে “প্রকৃত” ইসলামপন্থী তা নিয়ে।
তখন নাগরিকের দায়িত্ব হলো তর্কে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে একবার জিজ্ঞেস করা: আমি যে বিষয়টি নিয়ে এত উত্তেজিত, সেটিই কি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা? নাকি আমি উঠানের নাটক দেখছি, আর ঘরের আগুন ভুলে যাচ্ছি?
*তৃতীয় দৃশ্য: এবার মারামারি*
Political spectacle-এর সবচেয়ে কার্যকর উপাদান সম্ভবত সহিংসতা।
কারণ অর্থনীতি boring, GDP boring, Foreign reserve boring, Gas supply-এর technical report আরও boring!
কিন্তু মারামারি? সেটা কখনো boring নয়। একটি ৮০ পৃষ্ঠার অর্থনৈতিক রিপোর্ট হয়তো কয়েক হাজার মানুষ পড়বে না। কিন্তু ৩০ সেকেন্ডের একটি মারামারির ভিডিও কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
সেখানে রক্ত আছে। চিৎকার আছে। নায়ক আছে। ভিলেন আছে। প্রতিশোধ আছে।Facebook-ready narrative আছে। এটাই attention economy, যা আমি আগের একটা লেখায় (আমার দেশ, ২৮শে জুলাই, ২০২৬) বিস্তারিত লিখেছি।
Guy Debord-এর society of the spectacle যেন social media যুগে নতুন জীবন পেয়েছে। রাজনীতিতে এখন ঘটনা ঘটাই যথেষ্ট নয়; ঘটনাকে viral spectacle-এ পরিণত করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘ ও লজ্জাজনক ইতিহাস রয়েছে। যে দল ক্ষমতায় গেছে, তার ছাত্রসংগঠনের একটি অংশ অনেক সময় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একই সংস্কৃতি যদি শুধু নতুন জার্সি পরে ফিরে আসে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অর্থ কোথায়?
সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের সংঘর্ষ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির কিংবা অন্য যে পক্ষই জড়িত থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের আরেকটি প্রশ্নও পাশাপাশি করতে হবে: সহিংসতা থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে কে?
যেদিন দেশের মানুষ গ্যাস নিয়ে কথা বলার কথা, সেদিন যদি পুরো Facebook ছাত্রদের মারামারিতে ব্যস্ত থাকে। যেদিন অর্থনীতি নিয়ে সরকারের জবাবদিহি চাওয়ার কথা, সেদিন যদি পুরো জাতি কে কাকে মেরেছে তা নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়! তার মানে, attention displacement ইতোমধ্যে ঘটে গেছে।
এটি পরিকল্পিত কি না, সেটি প্রমাণের প্রশ্ন। কিন্তু এর political consequence বুঝতে কোনো conspiracy theory প্রয়োজন নেই। ঘরের আগুন থেকে চোখ উঠে গেছে। সবাই এখন উঠানে।
*সমস্যাটি এখানেই: নাটক দিয়ে আগুন নেভে না*
Ideological guise এবং semantic cover-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো: এগুলো বাস্তব সমস্যার সমাধান করে না। একাত্তরের বিতর্ক দিয়ে গ্যাস উৎপাদন বাড়ে না। আকিদার বাহাসে বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে না। Facebook-এর মারামারির ভিডিও দেখে দ্রব্যমূল্য কমে না। বিরোধী দলকে গালি দিলে বিনিয়োগ বাড়ে না।নতুন শত্রু তৈরি করলে বেকারের চাকরি হয় না।Narrative দিয়ে কিছু সময় perception manage করা যায়, কিন্তু lived experience manage করা যায় না।
মানুষের পকেটের নিজস্ব sociology আছে। বাজারে গিয়ে একজন নাগরিক যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, কোনো press conference দিয়ে সেটি বদলানো যায় না।একজন ব্যবসায়ী যদি গ্যাস না পান, তাকে ইতিহাসের বক্তৃতা দিয়ে কারখানা চালাতে বলা যাবে না। একজন তরুণ যদি চাকরি না পান, তাকে ideological enemy দেখিয়ে দীর্ঘদিন সন্তুষ্ট রাখা যাবে না।
এখানেই Jürgen Habermas-এর legitimation crisis প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যখন রাষ্ট্রের narrative আর নাগরিকের everyday experience-এর মধ্যে দূরত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন সংকট শুধু policy failure-এ সীমাবদ্ধ থাকে না; legitimacy-র সংকটে পরিণত হয়।
*Diversion-এরও একটি ফাঁদ আছে*
Attention diversion-এর আরেকটি সমস্যা আছে। এটি addictive বা আসক্তিকর; নেশার সাগরে ডুবিয়ে দেয়।
একবার কোনো সরকার বুঝতে পারে যে একটি controversy দিয়ে মূল সমস্যা থেকে কয়েক দিন attention সরানো যায়, তখন পরবর্তী সংকটে আরও একটি controversy প্রয়োজন হয়।তারপর আরও একটি। আরও বড় শত্রু। আরও ভয়ংকর অভিযোগ। আরও তীব্র polarization! আর এভাবেই তৈরি হয় diversionary spiral।
এরপর দেখা যায়, সরকার আর সমস্যার সমাধান করে না; controversy manage করে। রাষ্ট্র পরিচালনা ধীরে ধীরে governance থেকে narrative management-এ পরিণত হয়।
এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত, যা আওয়ামী লীগের শাসনামলে শেষদিকে আমরা দেখেছি।
এইটা চরম বিপজ্জনক এজন্য যে, একটি সরকারের communication machinery যত শক্তিশালীই হোক, শেষ পর্যন্ত একটি নির্মম সত্যের সামনে তাকে দাঁড়াতেই হয়: Performance-এর কোনো semantic substitute নেই।
*নাটক বন্ধ করুন, আগুন নেভান*
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন প্রয়োজন খুব সাধারণ কয়েকটি কাজ।
1. একাত্তরকে তার প্রাপ্য সর্বোচ্চ ঐতিহাসিক মর্যাদা দিন। কিন্তু বর্তমানের প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার অস্ত্র বানাবেন না।
2. ইসলামকে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক সংহতির উৎস হতে দিন। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় আকিদা ও ফতোয়াকে গোলাবারুদ বানাবেন না।
3. আর ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির বা অন্য যে সংগঠনই হোক, সহিংসতার বিরুদ্ধে zero tolerance প্রতিষ্ঠা করুন।
সবচেয়ে বড় কথা, সরকারের উচিত ideological guise-এর প্রয়োজনটাই শেষ করে দেওয়া।
কীভাবে?
গ্যাস দিন। বিদ্যুৎ দিন।চাঁদাবাজি বন্ধ করুন। মাদক নিয়ন্ত্রণ করুন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করুন। বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করুন। চাকরি সৃষ্টি করুন। পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখুন।বিশ্ববিদ্যালয়কে পেশিশক্তির জায়গা না বানিয়ে জ্ঞানচর্চার জায়গা হতে দিন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন। মানুষের জীবন সহজ করুন।
তাহলে একাত্তর কার্ড লাগবে না। ইসলাম কার্ড লাগবে না।ভায়োলেন্স কার্ডও লাগবে না।কারণ একটি সফল সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী propaganda হলো তার সাফল্য।
*শেষ পর্যন্ত মানুষ ফলাফল চায়*
বাংলাদেশের মানুষ অনেক গল্প শুনেছে। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের গল্প শুনেছে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের গল্প শুনেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গল্প শুনেছে। ইসলামী রাজনীতির গল্প শুনেছে।উন্নয়নের মহাসড়কের গল্প শুনেছে। ষড়যন্ত্রের গল্প শুনেছে। ভারত-পাকিস্তানের গল্প শুনেছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের গল্প শুনেছে।
মানুষ এখন সম্ভবত একটু কম গল্প এবং একটু বেশি রাষ্ট্র চায়। একটা চাকরি চায়।নিরাপদ জীবন চায়। সহনীয় বাজার চায়। গ্যাস-বিদ্যুৎ চায়। চাঁদাবাজিমুক্ত ব্যবসা চায়। নিরাপদ ক্যাম্পাস চায়।
ন্যায়বিচার চায়। এবং নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়।
তাই সরকারের প্রতি প্রশ্নটি জটিল হওয়ার প্রয়োজন নেই: একাত্তর নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। আকিদা নিয়েও আলেমরা আলোচনা করবেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু আগে বলুন: আজকের বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর সমাধান কী?
কারণ ইতিহাস দিয়ে বর্তমানের ব্যর্থতা অনন্তকাল ঢাকা যায় না। ধর্মীয় আবেগ দিয়ে অর্থনীতির হিসাব মেলানো যায় না। আর রাজনৈতিক সংঘর্ষের ধোঁয়ায় মানুষের চোখ কিছুক্ষণের জন্য ঝাপসা করা গেলেও ঘরের আগুন তাতে নেভে না।
শেষ পর্যন্ত মানুষ rhetoric নয়, result চায়; spectacle নয়, governance চায়।
তাই নাগরিকেরও একটি দায়িত্ব আছে। উঠানে যখন খুব বেশি ঢোল বাজে, যখন হঠাৎ সবাইকে একটি নতুন বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলা হয়, যখন পুরোনো কোনো আবেগকে নতুন করে উত্তপ্ত করা হয়; তখন সঙ্গে সঙ্গে সেই নাটকের অংশ না হয়ে একটি প্রশ্ন করুন:
ঘরের ভেতরে কী হচ্ছে?
কারণ ক্ষমতার রাজনীতিতে কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবরটি সেটি নয়, যেটি নিয়ে সবাই কথা বলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবরটি হতে পারে: যেটি নিয়ে কেউ কথা বলছে না।