Image description

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ নিজেদের নিরাপত্তায় নতুন ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছে।

‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তিটি গতকাল শুক্রবার সৌদি আরবের মক্কা নগরে স্বাক্ষরিত হয়।

বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ জোরদার করা। এতে বলা হয়েছে, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তাদের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এটি তিনটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব দিক উন্নত করার সুযোগ তৈরি করবে।’

 তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে হাঁটছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে হাঁটছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কাছবি: এএফপি

বাস্তবে এই চুক্তি কেমন রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে বাড়তে থাকা প্রশ্নগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করছে।

রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মিডল ইস্ট ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিচসেন আল-জাজিরাকে ই–মেইলে জানান, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন নিরাপত্তা অংশীদারত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে দিন দিন সংশয় পোষণ করে আসছে।’

কোটস বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত, যুদ্ধের পরবর্তী পরিচালনা এবং সংকট সমাধানে ঘন ঘন অবস্থান বদলানোর চেষ্টা—এসবই সেই উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এসবই নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে বহুমুখী করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেছে।’

তবে উলরিচসেন আরও যোগ করেন, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপিত বা বাতিল করা নয়, বরং বাড়তি কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করা।

মার্কিন ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো এই চুক্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চুক্তিটি ইরান যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা শেষে এই তিন দেশের নিজেদের নতুন করে সাজানোর একটি প্রচেষ্টা।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তোসি আল-জাজিরাকে বলেন, এটিকে প্রথম বড় ভূরাজনৈতিক সংকেত বলা যেতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের আগ্রাসনের কারণে আঞ্চলিক ব্যবস্থা নতুন রূপ নিচ্ছে।

তোসি বলেন, এই চুক্তির গুরুত্ব আনুষ্ঠানিক একটি সামরিক জোটের চেয়েও বেশি কিছু প্রকাশ করছে। আঞ্চলিক দেশগুলো কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন করছে, সে বিষয়টিও এই চুক্তির মাধ্যমে উঠে এসেছে।

তোসি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের জোটের কথা উল্লেখ করেন। বহু দশক ধরে যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে এই দুই দেশ শক্তিশালী সম্পর্ক উপভোগ করে আসছে। তবে এই চুক্তি এমনই ইঙ্গিত দিতে পারে যে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা জোটের পরিধি বৃদ্ধি করতে চাইছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কথা বলছেন। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কথা বলছেন। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কাছবি: এএফপি

তোসি ব্যাখ্যা করে বলেন, মূলত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা অংশীদারত্বের পরিধি বৃদ্ধি করছে এবং অঞ্চলভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে। এটিই শর্তসাপেক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সংবাদমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্ররা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, কোনো আঞ্চলিক সহযোগীদের ওপর এর প্রভাব কেমন পড়বে, তা না ভেবেই গত ফেব্রুয়ারিতে তারা ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছিল।

ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরান জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টসহ বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।

অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির মূল পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করার তেহরানের সিদ্ধান্ত স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভারী মূল্য চাপিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অনেকটাই বজায় রেখেছে। বিপরীতে ওয়াশিংটন তার মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ জোগাতে হিমশিম খেয়েছে। কারণ, এই আকাশ প্রতিরক্ষার সিংহভাগই ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল।

‘আদর্শগত প্রতিরোধ’

যুদ্ধের লাগিয়ে দেওয়ার পর সৃষ্টি পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিনের ওয়াশিংটন-নির্ভরতা আরও বেশি চাপের মুখে পড়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ব্রেট ম্যাকগার্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরিবর্তনশীল ও সম্পূর্ণ নতুন শুরুর অধ্যায়।’

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শুক্রবারের এই নিরাপত্তা চুক্তিকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা এবং ইরানকে ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এসব দেশ সবই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। তারা জানে, এমন কোনো কাঠামো নেই, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে।’

ফারুক আরও যোগ করেন, এই চুক্তিকে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে পা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ভুল হবে।

তিন দেশের নেতার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তারা। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা
তিন দেশের নেতার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তারা। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা

বিশ্লেষক ফারুক উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম যখন ইরানে আগ্রাসন চালায়, তার পর থেকেই এই তিন দেশই সাধারণত মধ্যস্থতা ও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে এসেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক বলেন, এসব দেশের মধ্যে মিল হলো, তারা কেউ-ই আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে চায় না। এতে চুক্তিটির গুরুত্ব ‘আদর্শগত প্রতিরোধ’-এর কাছাকাছি বলে মনে করেন তিনি।

ফারুক ব্যাখ্যা করেন, যুদ্ধ শেষে ইরান আরও কঠোর এবং তার লক্ষ্য অর্জনে শক্তি প্রয়োগে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

ফারুক বলেন, এখানে শুধুই প্রতিরোধের বিষয় নয়, বরং কৌশলগত সহযোগিতার ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।