Image description

সাংবাদিক ও উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীনের ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ টকশোতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের বিষয়ে তার কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা চলছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে টকশোতে রুমিন ফারহানাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’ কি না।

জবাবে রুমিন ফারহানা স্পষ্ট করে বলেন, তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। তবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অন্যায় বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদ করাকে তিনি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান হিসেবে দেখছেন। তার যুক্তি, কোনো রাজনৈতিক দল অন্যায় করেছে বলে সেই দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অন্যায় করা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

সম্প্রতি প্রচারিত ওই টকশোতে খালেদ মুহিউদ্দীন বলেন, গত এক বছরে রুমিন ফারহানার বক্তব্য পছন্দ করা দর্শকদের একটি বড় অংশ আবার অভিযোগ করছেন, তিনি আওয়ামী লীগকে ‘বাঁচিয়ে রেখেছেন’ এবং আওয়ামী লীগের ‘ন্যারেটিভ’ ধরে রাখার কাজ করছেন। এমনকি কেউ কেউ তাকে ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগার’ বলেও মন্তব্য করছেন।

এ বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, যদি এসব অভিযোগ সত্য ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তিনি যেন একটি ‘লাইফ সেভিং মেশিন’। তার ভাষায়, বিএনপি যখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ঢোকে, তখন তিনি বিএনপিকে বাঁচান; আবার আওয়ামী লীগ যখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ঢোকে, তখন তিনি আওয়ামী লীগকে বাঁচান।

এরপর খালেদ মুহিউদ্দীন প্রশ্ন করেন, রুমিন তো সব সময় বিএনপির রাজনীতি করেছেন। তাহলে আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন কেন? তিনি কি গোপনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন? জবাবে রুমিন বলেন, ‘না, আমি আওয়ামী লীগ করি না; অবশ্যই আমি আওয়ামী লীগ করি না।’

তবে এর ব্যাখ্যায় তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দুর্বল অবস্থায় আঘাত করার বিরোধিতা করেন। রুমিন ফারহানা বলেন, প্রতিপক্ষের হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যাওয়ার পর তাকে আঘাত করা কাপুরুষোচিত কাজ। বরং প্রতিপক্ষ যখন সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তখন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকেই তিনি সাহসী রাজনীতি বলে মনে করেন।

রুমিনের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ যখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, তখন যারা এখন তার বক্তব্যের সমালোচনা করছেন, তাদের নিয়ে কথা বলাটা সহজ ছিল না। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে তিনি সেটার প্রতিবাদ করতেই পারেন।

খালেদ মুহিউদ্দীন তখন জানতে চান, রুমিনের বক্তব্যগুলো কি আওয়ামী লীগের পক্ষে যাচ্ছে না? কারণ, তিনি যার প্রতি অন্যায় হচ্ছে, তার পক্ষেই কথা বলছেন। রুমিনের উত্তর, ‘সিম্পল, একদম ভেরি সিম্পল।’ অর্থাৎ তার অবস্থান আওয়ামী লীগের পক্ষে নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

আলোচনায় এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন খালেদ মুহিউদ্দীন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যদি এত বছর ধরে এত অন্যায় করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার কেন করা হবে—এমন প্রশ্ন অনেকেই করেন। অনেকের যুক্তি, অন্যায়ের প্রতিবাদ অন্যায় দিয়েই করা দরকার। এর জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ঘৃণার জবাবে ঘৃণা শুরু হলে সমাজে ঘৃণার চাষ ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। তিনি ইংরেজি একটি প্রবাদ উল্লেখ করে বলেন, ‘অ্যান আই ফর অ্যান আই মেইক্স দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড’—অর্থাৎ ‘চোখের বদলে চোখ নিলে পুরো পৃথিবী অন্ধ হয়ে যাবে।’

রুমিন বলেন, বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো হওয়ার দাবি করে এবং আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে তাদের অন্যায়কে সামনে আনে, তাহলে বিএনপিরও একই ধরনের কাজ করা উচিত নয়। তার মতে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা অন্যায়গুলো যদি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারও ঘটতে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দেওয়ার নৈতিক যুক্তিই দুর্বল হয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি মিথ্যা মামলা ও গায়েবি মামলার প্রসঙ্গ তোলেন। একই সঙ্গে সাবেক সংসদ স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে হয়রানির প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

রুমিনের যুক্তি, অতীতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে, তা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান সময়েও কোনো ব্যক্তিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একইভাবে হয়রানি করা হলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। তা না হলে অতীতে করা প্রতিবাদও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ব্যক্তি দেখে প্রতিবাদ বেছে নেওয়া হলে সেটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান থাকে না। তখন সেটি হয়ে যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি। তার মতে, ন্যায়কে সমর্থন করতে হলে ন্যায় সবার জন্যই সমান হতে হবে।

রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার সমর্থকেরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অন্যায়ের বিরোধিতা করা কোনোভাবেই সেই প্রতিপক্ষের রাজনীতিকে সমর্থন করা নয়। অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিষয়ে রুমিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিএনপির প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রুমিন ফারহানার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। নেটিজেন সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রুমিন ফারহানার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অন্যায়ের বিচার হতে হবে, কিন্তু প্রতিশোধের রাজনীতি দিয়ে নয়। তবে আওয়ামী লীগের বিষয়ে তার অবস্থান নিয়ে বিএনপির সমর্থকদের প্রশ্ন থাকাটাও স্বাভাবিক।’

মাহমুদ হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ভালো। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিষয়ে কথা বলার সময় অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবে, কেন এখন এত জোর দিয়ে তাদের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে।’ তানজিলা রহমান’ আবার বলেন, ‘কোনো দলকে সমর্থন করা আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এক বিষয় নয়। রুমিন ফারহানার বক্তব্যের এই জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব কী হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।’

নেটিজেন রাকিব আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতিতে ন্যায়বিচারের কথা বলা সহজ, কিন্তু নিজের দলের লোকের অন্যায় হলেও একইভাবে প্রতিবাদ করা কঠিন। রুমিন যদি সব পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই অবস্থান নেন, তাহলে তার বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।’

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের মূল বিষয়টি অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে ঘিরেই। তিনি স্পষ্ট করেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একই সঙ্গে তিনি এটিও বলতে চেয়েছেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী অন্যায় করেছে বলে তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অন্যায় করা গ্রহণযোগ্য নয়।