দক্ষিণে ওকিনাওয়া। পূর্বে খোলা প্রশান্ত মহাসাগর। উত্তরে হোক্কাইদো ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জ। তারপর জাপান সাগর হয়ে আবার দক্ষিণে। মানচিত্রে রেখাটি টানলে মনে হবে, যেন জাপানকে প্রায় এক চক্কর দিয়ে এল চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি চীন ও রাশিয়ার চারটি যুদ্ধজাহাজ যৌথ টহলে বেরিয়ে যে পথ পাড়ি দিয়েছে, সেই গতিবিধি নিয়েই এখন উদ্বেগ টোকিওতে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণ বলছে, এর বার্তা শুধু জাপানের উদ্দেশে নয়; যুক্তরাষ্ট্রকেও বেইজিং ও মস্কো দেখাতে চাইছে, পূর্ব এশিয়ার তথাকথিত ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’-এর মধ্যে তাদের নৌশক্তিকে আটকে রাখা সহজ নয়। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও রাশিয়া যে সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি দেখাতে পারে, সেটিও মস্কোর বার্তার অংশ।
১৩ জুলাই শুরু, ১৭ দিনের টহল
এর আগে গত ৬ জুলাই চীনের শানডং প্রদেশের ছিংতাওয়ের কাছে শুরু হয়েছিল ‘জয়েন্ট সি-২০২৬’ নৌমহড়া। চীন ও রাশিয়ার দশটি জাহাজ ও বিভিন্ন সহায়ক ইউনিট এতে অংশ নেয়। মহড়ায় যৌথ গোয়েন্দা নজরদারি, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সমুদ্রপথে হামলা এবং অস্ত্রের বাস্তব ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনুশীলন হয়। ১৩ জুলাই মহড়া শেষ হওয়ার পর দুই দেশের কয়েকটি জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে যৌথ টহলের উদ্দেশে রওনা দেয়। এটি ২০১২ সালে শুরু হওয়া ‘জয়েন্ট সি’ ধারাবাহিক মহড়ার দ্বাদশ আয়োজন।
যৌথ টহলে ছিল চীনের তিনটি জাহাজ, টাইপ ০৫৫ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার আনশান, টাইপ ০৫২ডি ডেস্ট্রয়ার কাইফেং এবং টাইপ ৯০৩এ সরবরাহ জাহাজ। সঙ্গে ছিল রাশিয়ার স্টেরেগুশচি শ্রেণির ফ্রিগেট রেজকি। ১৩ জুলাই ছিংতাও ছাড়ার পর প্রায় ১৭ দিন ধরে তারা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, ওখোৎস্ক সাগর ও জাপান সাগরের বিভিন্ন অংশে চলাচল করে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গতিপথ অনুযায়ী, ১৬ জুলাই চার জাহাজ ওকিনাওয়া মূল দ্বীপ ও মিয়াকোজিমার মাঝের জলপথ দিয়ে দক্ষিণে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করে। ১৯ জুলাই তাদের দেখা যায় ওকিনোতোরিশিমার দক্ষিণ-পশ্চিমে। ২১ জুলাই তারা মিনামি-ইওতো ও ইওতো দ্বীপের পূর্ব দিক দিয়ে আরও উত্তরে যায়।
২৩ জুলাই জাহাজগুলো জাপানের প্রধান দ্বীপ হনশুর পূর্ব উপকূলের ইনুবোসাকি অন্তরীপের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে শনাক্ত হয়। ২৫ জুলাই তারা হোক্কাইদোর পূর্ব প্রান্ত নোসাপ্পু অন্তরীপের দক্ষিণ-পূর্ব জলসীমায় পৌঁছায়। অর্থাৎ কয়েক দিনের মধ্যে চীন-রাশিয়ার নৌবহর জাপানের দক্ষিণ থেকে পূর্ব উপকূল ধরে অনেক দূর উত্তরে উঠে যায়।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ভ্রিস প্রণালি অতিক্রমের বিষয়টি। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ একসঙ্গে এই জলপথ অতিক্রম করেছে এই প্রথম। কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাংশ নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে। দ্বীপগুলো মস্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কয়েকটি দ্বীপ নিজেদের ‘উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড’ বলে দাবি করে টোকিও। ফলে এই পথ বেছে নেওয়া শুধু নৌচলাচলের বিষয় নয়, তার রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ২৭ জুলাই সকাল ৮টার দিকে চারটি জাহাজকে হোক্কাইদোর সোয়া অন্তরীপ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শনাক্ত করে জাপানের সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনী। এরপর তারা সোয়া প্রণালি দিয়ে পশ্চিম দিকে জাপান সাগরে প্রবেশ করে। এই পর্যায়ে কার্যত জাপানের দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিক পেরিয়ে পশ্চিমের জাপান সাগরে চলে আসে যৌথ বহর।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তখন সরাসরি বলেছিল, এ ধরনের যৌথ নৌযাত্রাসহ চীন ও রাশিয়ার ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা জাপানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এবং এটি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘গুরুতর উদ্বেগের’ বিষয়। জাপানি যুদ্ধজাহাজ ও টহল বিমান পুরো যাত্রাপথ নজরে রেখেছিল।
২৭ জুলাই পর্যন্ত চীনের তিনটি জাহাজের সঙ্গে ছিল রুশ ফ্রিগেটটি। কিন্তু পরে রুশ জাহাজটি আলাদা হয়ে যায়।
চীনের তিন জাহাজ এরপর জাপান সাগর ধরে দক্ষিণে নেমে আসে। ২ আগস্ট রাত ৯টার দিকে জাপানি বাহিনী তাদের সুশিমা দ্বীপের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শনাক্ত করে। ২ থেকে ৩ আগস্টের মধ্যে জাহাজগুলো সুশিমা প্রণালি দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে গিয়ে পূর্ব চীন সাগরে প্রবেশ করে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এর মধ্য দিয়েই ওই তিনটি চীনা যুদ্ধজাহাজের জাপানি দ্বীপপুঞ্জ পরিক্রমা সম্পন্ন হয়।
তবে কি সত্যিই ‘জাপান ঘেরাও’?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাহাজগুলোর গতিপথ জাপানকে প্রায় বৃত্তাকারে ঘুরে গেলেও এটি সামরিক অর্থে কোনো অবরোধ বা ‘ঘেরাও’ ছিল না। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাদের জাপানি ভূখণ্ডে আক্রমণ বা জলসীমা লঙ্ঘনের কথা বলেনি। বরং জাহাজগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রণালি ও সমুদ্রপথ দিয়ে চলেছে এবং জাপানি বাহিনী সেগুলোর উপর নজর রেখেছে।
কিন্তু সামরিক কৌশলের ভাষায় গতিপথটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়৷ চীন দেখিয়েছে, তার বৃহৎ যুদ্ধজাহাজগুলো নিজ উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রে আটকে নেই; চাইলে জাপানি দ্বীপমালার বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে বেরিয়ে দীর্ঘ দূরত্বে অভিযান চালিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে।
নজরে ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’
পূর্ব এশিয়ার সামরিক ভূগোলে বহুল ব্যবহৃত একটি ধারণা, ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’। জাপানের দ্বীপপুঞ্জ থেকে রিউকিউ ও ওকিনাওয়া, তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত এই দ্বীপমালা চীনের উপকূল ও খোলা প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে একটি প্রাকৃতিক ভূকৌশলগত রেখা তৈরি করেছে। সংকটের সময় এই জলপথগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে চীনা নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ চলাচল কঠিন হতে পারে—এই আশঙ্কা বহু দিন ধরেই চীনা সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই ওকিনাওয়া-মিয়াকো জলপথ দিয়ে বেরিয়ে খোলা প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়া, তারপর জাপানের উত্তর দিক ঘুরে সোয়া প্রণালি দিয়ে ঢোকা এবং শেষে সুশিমা প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সামরিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
বার্তাটি যেন চীনের নৌবাহিনীকে প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের ভেতরে আটকে রাখা যাবে না।
আমেরিকাকেও কি বার্তা?
জাপানে বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং দুই দেশ নিরাপত্তা জোটে আবদ্ধ। ফলে জাপানের চারপাশে চীন-রাশিয়ার যৌথ সামরিক তৎপরতার শ্রোতা শুধু টোকিও নয়, ওয়াশিংটনও।
চীন ও রাশিয়া ২০১৯ সাল থেকে যৌথ দূরপাল্লার বোমারু বিমান টহলও চালিয়ে আসছে। ২০২১ সালে ‘জয়েন্ট সি’ মহড়ার পর তাদের যুদ্ধজাহাজ প্রথমবার যৌথভাবে জাপানের চারপাশে বড় নৌযাত্রা করেছিল। পরবর্তী বছরগুলোতেও যৌথ নৌটহল ও বিমান অভিযান বিস্তৃত হয়েছে। জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুই দেশের যৌথ অভিযান ধীরে ধীরে দীর্ঘতর, বিস্তৃত এবং আরও জটিল হচ্ছে।
২০২৪ সালের জাপানি প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রও চীন-রাশিয়ার বারবার যৌথ বোমারু বিমান উড্ডয়ন ও নৌযাত্রাকে জাপানের বিরুদ্ধে ‘প্রদর্শনমূলক আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ বলেছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়ার আরেক বার্তা
এই অভিযানের আরেকটি দিক মস্কোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ. ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিপুল সামরিক সম্পদ ব্যস্ত। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে মস্কোর সামরিক সক্ষমতা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। এমন সময়ে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের একটি আধুনিক ফ্রিগেট চীনের সঙ্গে জাপান ঘিরে দীর্ঘ যৌথ টহলে অংশ নিয়ে দেখিয়েছে, রাশিয়া এখনও পূর্ব এশিয়ায় শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অর্থাৎ চীনের বার্তা যদি হয় ‘আমরা দ্বীপশৃঙ্খলের বাইরে যেতে পারি’, রাশিয়ার বার্তা, ‘ইউক্রেনে যুদ্ধ করলেও প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আমরা হারিয়ে যাইনি।’
বেইজিং ও মস্কো নিজেদের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বলে না। কিন্তু সামরিক সহযোগিতা যে ক্রমেই গভীর হচ্ছে, তার প্রমাণ যৌথ মহড়া, নৌটহল ও বোমারু বিমান অভিযান।
২০২১ সালে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা ২০২১-২৫ মেয়াদের সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি রোডম্যাপ সই করেছিলেন, যেখানে যৌথ টহল ও মহড়া জোরদারের কথা ছিল। জাপানের প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এই সহযোগিতা এখনও অসম, চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতায় ক্রমেই শক্তিশালী অংশীদার, তবুও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মোকাবিলায় দুই দেশের স্বার্থের বড় মিল রয়েছে। ‘জয়েন্ট সি-২০২৬’ সেই ধারারই আরও দৃশ্যমান রূপ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, চীন-রাশিয়ার এই নৌতৎপরতার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ও তার এশীয় মিত্রদের সামরিক সহযোগিতাও বাড়ছে।
২৬ জুলাই দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক মহড়ায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী, জাপানের সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনী এবং ফিলিপাইনের বাহিনী একসঙ্গে অনুশীলন চালায়।
ফলে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরে ক্রমেই দুটি সমান্তরাল ছবি স্পষ্ট, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাদের আঞ্চলিক অংশীদার; অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয়ে চীন ও রাশিয়া।
এই মুহূর্তে চীন-রাশিয়ার জাহাজ চলাচলকে আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। বরং এটি তিনটি বার্তা বহন করছে বলে সবচেয়ে সতর্ক ব্যাখ্যা করা যায়।
প্রথমত, চীনা নৌবাহিনী পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে দীর্ঘ দূরত্বে অভিযান চালাতে সক্ষম এবং জাপানি দ্বীপমালার একাধিক জলপথ ব্যবহার করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া দেখাতে চাইছে ইউক্রেন যুদ্ধ তাকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করেনি।
তৃতীয়ত, চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোটকে বোঝাতে চাইছে, পূর্ব এশিয়ায় তাদের যৌথ সামরিক উপস্থিতিকে এখন স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
১৭ দিনের যাত্রা শেষে যুদ্ধজাহাজগুলো চলে গেছে। কিন্তু জাপানের চারপাশে তারা যে রেখাটি এঁকে দিয়ে গেছে, সেটিই এখন বড় বার্তা। সমুদ্রপথগুলো আগের মতোই আছে, বদলে গেছে সেই পথ দিয়ে চলা শক্তির সমীকরণ।