Image description

ঢাকা থেকে প্যারিসের দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার হাজার মাইল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল ৩৬ দিনে সেই দূরত্ব যেন মুছে গিয়েছিল। ঢাকার রাজপথের প্রতিটি খবর, প্রতিটি স্লোগান আর প্রতিটি মৃত্যুর সংবাদ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আন্দোলিত করছিল প্যারিসের বাংলাদেশিদের।

দেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক অনন্য প্রবাসী অধ্যায় লেখা হয়েছিল ফরাসি রাজধানীতে।  প্রতিবাদ, মানববন্ধন, রেমিট্যান্স শাটডাউন থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বরে হাজারো মানুষের জমায়েত যেন হয়ে উঠেছিল এক টুকরো ঢাকা, সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশের আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শহর প্যারিসও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ ও সংহতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

সেসময়ের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকা--- প্যারিস যেন ক্রমেই কাছাকাছি চলে এসেছিল প্রবাসীদের কাছে । সারাক্ষণ চোখ থাকতো দেশের খবরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন ও স্বজনদের মাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি আপডেটের সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল প্যারিসের বাংলাদেশিদের আবেগ, উদ্বেগ এবং কর্মসূচি।

অস্থির অপেক্ষা

৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দিলে ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও শুরু হয় তীব্র অপেক্ষা ও অস্থিরতা।

২০২৪ সালের আগস্টে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিক্ষোভের ছবি।

এর আগেই আন্দোলনের সমর্থনে ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’-এর মতো কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন প্রবাসীদের অনেকে। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও রেন, গ্রেনোবল, লিওঁ, লিল ও নন্তসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে একের পর এক সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও স্থানীয় কমিউনিটির সদস্যরা।

৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানাতে প্যারিসের ঐতিহাসিক ‘প্লাস দ্য লা রিপাবলিক’-এ প্রতিবাদ সমাবেশের প্রস্তুতিও আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্সের গ্রীষ্মকালীন সময় অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে প্যারিসের সময়ের ব্যবধান চার ঘণ্টা। বাংলাদেশ চার ঘণ্টা এগিয়ে। ফলে ৫ আগস্ট ঢাকায় যখন ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলাচ্ছিল, প্যারিসে তখন মাত্র সকাল।সেই সকালটি তাই অন্য সব সকালের মতো ছিল না। প্রবাসী বাংলাদেশিদের চোখ ছিল ঢাকা অভিমুখে।

প্যারিসেই ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

সেই সময় প্যারিসকে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে আরও বিশেষভাবে যুক্ত করেছিল আরেকটি ঘটনা। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিককে ঘিরে তিনি ফরাসি রাজধানীতে ছিলেন। প্যারিসে তার অবস্থানের কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদেরও তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের পরিস্থিতি যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হচ্ছিল, তখন একই শহরে ড. ইউনূসের উপস্থিতি প্যারিসকে ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্রেও পরিণত করে।

প্যারিসে পিনাকী ভট্টাচার্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিদের নজর ফ্রান্সের দিকে থাকার আরেকটি কারণ ছিলেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য।

২০১৮ সাল থেকে ফ্রান্সে অবস্থানরত পিনাকী ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। ইউটিউব ও ফেসবুকে তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারীর কাছে জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের আন্দোলন হয়ে ওঠে তাঁর প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়।

এ সময় তিনি ফরাসি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লো মোন্দ, ওয়েস্ট ফ্রঁন্স, লা ক্রোয়া, লো পারিজিয়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম রেড়িও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল (আরএফআই) এবং ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে ঢাকার রাজপথে যা ঘটছিল, তা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হয়ে থাকেনি। প্যারিসেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল।

প্রতিবাদের প্রস্তুতি বদলে গেল বিজয় উদ্‌যাপনে

৫ আগস্টকে সামনে রেখে ফ্রান্সপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই স্মরণকালের বড় একটি বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আগের রাত কেটেছিল উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষায়।

কিন্তু প্যারিসে সকাল হতে হতেই বাংলাদেশে দুপুর গড়িয়ে যায়।

ঢাকা থেকে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার খবর ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-এর ঢাকা ব্যুরোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে মুহূর্তেই বদলে যায় প্যারিস। যে জমায়েত হওয়ার কথা ছিল প্রতিবাদের, সেটিই রূপ নিতে শুরু করে বিজয় উদ্‌যাপনের প্রস্তুতিতে।

স্থানীয় সময় বিকেল চারটার দিকে ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ফ্রান্সের নিজস্ব বিপ্লব, আন্দোলন ও প্রতিবাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই চত্বর সেদিন ভরে ওঠে বাংলাদেশের পতাকা আর বাংলাদেশিদের স্লোগানে।

হাজারো মানুষ জড়ো হন সেখানে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ভিন্নতা ভুলে নানা শ্রেণি-পেশার প্রবাসীরা অংশ নেন সেই সমাবেশে। কেউ সঙ্গে এনেছিলেন বাংলাদেশের পতাকা, কেউ প্ল্যাকার্ড। কেউ মিষ্টি বিতরণ করছিলেন, কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন।

কয়েক সপ্তাহের উৎকণ্ঠা, ক্ষোভ আর অসহায় অপেক্ষার পর সেদিন প্যারিসের বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় একটি অংশের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। রিপাবলিক চত্বরের সেই জমায়েতে বক্তব্য দেন পিনাকী ভট্টাচার্য। পরে তিনি ফরাসি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের-এর ইংরেজি সম্প্রচারের একটি লাইভ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। একই সন্ধ্যায় ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও। একদিকে রিপাবলিক চত্বরে হাজারো প্রবাসীর জমায়েত, অন্যদিকে প্যারিস থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এই দুই ঘটনা মিলে ৫ আগস্টের প্যারিসকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে স্মরণীয় করে তোলে।

পিনাকী ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক ইউনূসের সে সময় প্যারিসে অবস্থান বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে ফরাসি রাজধানীর গুরুত্বে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল।

আন্দোলনের পেছনে ছিল বহু মানুষের শ্রম

তবে প্যারিসের জুলাই-আগস্টের গল্প শুধু পরিচিত কয়েকটি মুখের গল্প নয়। পুরো জুলাই ও আগস্টজুড়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপ সমাবেশ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিল। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, কবি-সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন অবস্থান থেকে অনেকে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান এবং কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন।

কেউ কর্মসূচির অনুমতির জন্য কাজ করেছেন, কেউ প্রচারণায়ন কেউ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কেউ ব্যানার-প্ল্যাকার্ড তৈরি করেছেন। আবার কেউ দূর শহর থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে প্যারিসের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।

এই সম্মিলিত অংশগ্রহণই প্যারিসের আন্দোলনকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয় বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৃহত্তর সামাজিক অংশগ্রহণের ঘটনায় পরিণত করেছিল।

৫ আগস্টের নাটকীয় পরিবর্তনের পরদিন, ৬ আগস্ট, প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ঘিরেও তৈরি হয় নতুন পরিস্থিতি ।

ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের বাংলাদেশিরা সেখানে উপস্থিত হন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সাড়ে চার হাজার মাইলের দূরত্ব যেদিন মুছে গিয়েছিল

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজপথের আন্দোলন দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরের মতো প্যারিসেও প্রবাসীরা বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন।

তবে প্যারিসের অভিজ্ঞতায় ছিল কিছু স্বতন্ত্র উপাদান ।  ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বরে বড় সমাবেশ; ফরাসি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহ এবং একই সময়ে শহরটিতে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পিনাকী ভট্টাচার্যের উপস্থিতি।

সেদিন ঢাকার সঙ্গে প্যারিসের সাড়ে চার হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্বের যেন আর কোনো অর্থ ছিল না।

৫ আগস্ট বিকেলে রিপাবলিক চত্বরে যখন বাংলাদেশের পতাকা হাতে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, তখন ঢাকার সঙ্গে প্যারিসের সাড়ে চার হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্বের যেন আর কোনো অর্থ ছিল না। কারণ সেই ৩৬ দিনে বাংলাদেশের প্রতিটি উত্তাল মুহূর্তের সঙ্গে দূর প্যারিসেও বদলাচ্ছিল মানুষের দিন, রাত, উদ্বেগ আর অপেক্ষা।

প্যারিসের সঙ্গে বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক সময়ের সংযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে মাত্র তিন দিন পর। ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্যারিস থেকে ঢাকা ফিরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী থাকা প্যারিস কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্দোলন ও সংহতির কেন্দ্রই ছিল না; বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনার সঙ্গেও শহরটি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে যায়।ঢাকার রাজপথের পাশাপাশি প্যারিসেও ফুসে উঠেছিল আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ।