ভারত চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে রেল অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি রুপি (প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। প্রকল্পের আওতায় পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ, আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন রেললাইন নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথের উন্নয়ন এবং প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের কাজ করা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দুই বছরে ভারতের মোট রেল অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রায় ২২ শতাংশ সীমান্তভিত্তিক এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হতে পারে। এর মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলের উন্নয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ করা নয়; এমন রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাও এর লক্ষ্য, যা প্রয়োজন হলে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনেও ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা সীমান্ত এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে চীন সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নের গতি বাড়াতে কয়েক বছর ধরে সড়ক, সেতু, টানেল ও অন্যান্য যোগাযোগ প্রকল্পে গুরুত্ব দিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। নতুন এই রেল উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টারই সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় উন্নত রেল যোগাযোগ গড়ে উঠলে পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে, সড়কের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত সেনা ও রসদ সরবরাহ করা সহজ হবে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত সীমান্ত জেলাগুলোর সঙ্গে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সংযোগ জোরদার হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে।
৪৫ হাজার কোটি রুপির এই কর্মসূচির আওতায় ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকাজুড়ে রেল অবকাঠামো উন্নয়নে এটি একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই পরিকল্পনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ভারত সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতাও সীমান্ত অবকাঠামো জোরদারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের লক্ষ্য, হিমালয় অঞ্চল, শিলিগুড়ি করিডর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এমন একটি আধুনিক ও সব মৌসুমে কার্যকর রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যাতে সেনা মোতায়েনের সময় কমে আসে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য হয়।
এর আগে পাকিস্তান সীমান্তে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ, ডোকলাম এলাকার কাছাকাছি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু চালুর মতো একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে মোদি সরকার। এছাড়া গত এক দশকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন যুক্ত হয়েছে এবং দীর্ঘদিন অচল থাকা কয়েকটি অ্যাডভান্সড ল্যান্ডিং গ্রাউন্ড পুনরায় সচল করে সেখানে সামরিক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের রেল খাতে মূলধনি বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। নতুন রেললাইন, বিদ্যুতায়ন, স্টেশন আধুনিকায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি এবার সীমান্তকেন্দ্রিক এই বৃহৎ কর্মসূচির মাধ্যমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটি।
সূত্র: ব্লুমবার্গ