Image description

জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইয়াতসুশিরোর খাবারের দোকান সেনদান শোকুদোতে দিনের কাজ শেষ হওয়ার পথে। হঠাৎ পুরো ভবনটি দুলে উঠল। রান্নাঘরের তাকের সবকিছু মেঝেতে পড়ে গেল। ভেঙে চুরমার হলো বাটি ও গ্লাস।

দোকানের ৭৫ বছর বয়সী সহ-মালিক হিরোকো ওগাতা তখনই সেখানে ছিলেন। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমি আকস্মিক কাঁপুনিতে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে একটি টেবিলের নিচে চলে যাই। কিন্তু টেবিলটি আমাকে নিয়ে তীব্রভাবে ডানে, বাঁয়ে, ডানে, বাঁয়ে নড়ছিল।’

কুমামোতো প্রদেশের মধ্যাঞ্চলের ইয়াতসুশিরোতেই সারা জীবন কাটিয়েছেন ওগাতা। এলাকাটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে ভূমিকম্প নতুন নয়। ২০১৬ সালে পরপর দুটি ভূমিকম্পে ২৭৭ জন নিহত ও ২ হাজার ৮০০ জন আহত হন।

তবে এবারকার কম্পনকে ‘এত বড়’ ভূমিকম্প হিসেবে আগে কখনো অনুভব করেননি ওগাতা।

তিনি বলেছেন, ‘১০ বছর আগের ভূমিকম্পটি এর মতো কিছুই ছিল না। আমার মনে হয়েছিল, আমি মারা যাব।’

মঙ্গলবার রাতে কুমামোতোতে আঘাত হানা ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন কুমামোতো শহরের অ্যায়ন বিপণিবিতানের। সেখানে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সতর্ক করে বলেছেন, জরুরি সেবাদানকারী কর্মীদের ‘সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে’ কাজ করতে হচ্ছে।

‘একটির পর একটি তীব্র ঝাঁকুনি’

অ্যায়ন বিপণিবিতান থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে একটি কেকের দোকানের পেছনের কক্ষে ছিলেন ইউই। ভূমিকম্পের সময় তিনি বুঝতে পারছিলেন না কোনটি ভূমিকম্পের শব্দ আর কোনটি বিস্ফোরণের।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, ‘একটির পর একটি তীব্র ঝাঁকুনি আসছিল। আমি যে চেয়ারে বসেছিলাম, সেটি শুধু আঁকড়ে ধরে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি।’

ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি তৎপরতা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ৪ হাজার ৬০০ কর্মীকে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত করেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দলগুলো ‘সারারাত নিরলসভাবে’ কাজ করবে বলেও তিনি জানান।

তবে কুমামোতো শহরের কয়েক হাজার মানুষ বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছেন। অন্তত ৪৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শহরের কেন্দ্রের ১৭ শতকের কুমামোতো দুর্গের বাইরের দেয়াল ধুলোর মেঘের মধ্যে ধসে পড়ে। ১৯ শতকের ইয়াতসুশিরো মন্দিরের উপাসনাকক্ষও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী মিশাল পোসান বলেছেন, দোকানগুলোতে ‘পানি বা খাবার কিছুই অবশিষ্ট নেই’।

ভূমিকম্পের সময় বাড়িতেই ছিলেন পোসান। তিনি বলেছেন, ‘আমার টেলিভিশন আমার ওপর পড়ে, আয়না ভেঙে যায় এবং আশপাশের সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ পরপর ভূকম্পন অব্যাহত থাকায় তিনি জরুরি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাগ প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন।

আরেক বাসিন্দা বলেছেন, মূল ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পরও শহরে পরপর কম্পন অনুভূত হচ্ছিল। ২০১৬ সালের ভূমিকম্পের কয়েক দিন পর আরও একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, মানুষ আরেকটি ভূমিকম্পের আশঙ্কায় সতর্ক রয়েছে।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থার শিনজি কিয়োমোতোও জনগণকে আরও ভূমিকম্পের বিষয়ে ‘সতর্ক থাকতে’ বলেছেন।

এদিকে ওগাতা ও ইউইয়ের মতো স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। ওগাতা বলেছেন, ‘আমার পুরো জায়গাটি এলোমেলো হয়ে আছে। কোথায় দাঁড়াব, সেটিও জানি না। কিন্তু জীবিকা চালাতে যত দ্রুত সম্ভব দোকানটি আবার চালু করতে হবে। তাই আজ জায়গাটি পরিষ্কার করছি।’

তবে পরপর ভূকম্পনের কারণে কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে। তিনি বলেছেন, ‘এত ঘন ঘন পরবর্তী কম্পন হতে থাকলে বিষয়টি খুবই চাপের হয়ে উঠবে।’

ইউইয়ের কেকের দোকান এখনো বন্ধ। ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করে তিনি দেখবেন, ওভেনসহ যন্ত্রগুলো কাজ করছে কি না। এরপরই তিনি বুঝতে পারবেন, আবার ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হবে কি না।

সূত্র- বিবিসি