Image description

অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। যিনি শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে চলতি দায়িত্বে আছেন। গত ১৬ এপ্রিল তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে মাউশি’র ডিজি পদে নিয়োগ পান। এক সপ্তাহ পরে তাকে চলতি দায়িত্বে ডিজি করা হয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিচালক (মাধ্যমিক) পদে থাকাকালেই ড. সোহেল লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্যে নেমে পড়েন। ডিজির চেয়ারে বসার পর তাঁর অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রভাব আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের চলতি সংখ্যার প্রধান প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বশেষ মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে “শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার উন্নয়ন” শীর্ষক একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণের বিল পরিশোধের নথি আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রীর কথা বলে তিনি ঘুষের দাবিতে এ নথিটি আটকে রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। জানা জানায়, ৩০ লাখ টাকার কার্যাদেশে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদে ২২ লাখ টাকার বিলের মধ্যে ডিজি সোহেল প্রথমে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তা দিতে অস্বীকৃতি জানান প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী জয়নুল আবেদীন (জয় সরকার)। এক পর্যায় তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগও দেন। কিন্তু এতে বিশেষ কোন লাভ হয়নি। তার নথিটি ছাড়েননি মাউশির ডিজি অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। উল্টো নথি আটকে রেখে ডিজি বলেন, আমার ভাগের ৩ লাখ টাকা কমিয়েছি। মন্ত্রীর জন্য ৭ লাখ টাকা দিতেই হবে। মূলতঃ মন্ত্রীর নামে ৭ লাখ টাকা ঘুষ আদায় না হওয়ায় ২২ লাখ টাকার ডটুমেন্টারি নির্মাণের বিলটি গত প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে ডিজির টেবিলে আটকে আছে।

জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বাজেট শাখার স্মারক নং- ৩৭.০০,০০০০,০০০,০৬৪.৯৯.০০০৫.২৪.০১, তারিখ- ১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি. চিঠির আলোকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রধান কার্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুকূলে ‘৩২১১১২৬-অডিও-ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাণ’ অর্থনৈতিক কোডের অধীনে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তৎকালীন মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই ডকুমেন্টারি নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন) প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রখ্যাত চিত্রনাট্য পরিচালক ও বাংলাদেশ ফিল্ম ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য জয়নুল আবেদীন (জয় সরকার)-কে স্ক্রিপ্ট তৈরি ও ডকুমেন্টারি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রাথমিক বাজেট ৪১ লাখ ৯০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ৩০ লাখ টাকায় চূড়ান্ত করা হয়। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জয় সরকারের অনুকূলে কার্যাদেশ ইস্যু করা হয়। উল্লেখ্য, জয় সরকার বিএনপির সাংস্কৃতি সংগঠন- জাসাসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক পদে আছেন। কার্যাদেশ অনুযায়ী “শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার উন্নয়ন” শীর্ষক ডকুমেন্টারি নির্মাণ এবং তা কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর তিনি শিক্ষা অধিদপ্তরে বিল দাখিল করেন। ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদ দিয়ে যার নিট বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ টাকা।

জানা যায়, জয়নুল আবেদীন ওরফে জয় সরকারের এ বিলটি শাখা থেকে উপস্থাপিত হওয়ার পর পরিচালক পর্যন্ত অনুমোদিত হয়ে ডিজির টেবিলে গিয়ে যখন পৌঁছে ওই সময় ডিজি পদে ছিলেন বি এম আব্দুল হান্নান। তিনি পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন)- এর অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিজি পদে ছিলেন। কিন্তু জয় সরকারের ডকুমেন্টারি নির্মাণের বিলটি মহাপরিচালকের (ডিজি) টেবিলে যাওয়ার মুহূর্তে বি এম আব্দুল হান্নানের ওএসডির আদেশ জারি হয়। গত ১৩ এপিল তাকে ডিজি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ১৬ এপ্রিল অতিরিক্ত দায়িত্বে মহাপরিচালক হন শিক্ষামন্ত্রীর তখনকার পিএস ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। ড. সোহেলের হাতে পড়ার পরই ডকুমেন্টারির বিল পরিশোধের নথিটি আটকে যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাস’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক জয় সরকারের ২২ লাখ টাকার এ বিল অনুমোদনে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন ডিজি খান মইনুদ্দিন সোহেল। জয় সরকার অত্যন্ত হতাশ হন। তিনি নানাভাবে চেষ্টা-তদবির করেন বিল ছাড়িয়ে নিতে। মন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাত করেন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

অবশেষে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন জয়নুল আবেদীন (জয় সরকার)। মুখ্যসচিবের পিএস এ বিষয়ে অধিদপ্তরের ডিজি খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কিন্তু ডিজি সোহেল এতে উল্টো ক্ষেপে যান বলে জানা যায়। তবে তিনি এক পর্যায়ে ঘুষের অংক কিছুটা কমিয়ে বলেন, “ঠিক আছে, আমার ভাগের ৩ লাখ টাকা বাদ দিলাম, কিন্তু মন্ত্রীর ৭ লাখ টাকা দিতেই হবে। এতে আমার কিছুই করার নেই।” অর্থাৎ, খোদ শিক্ষামন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তিনি এই ঘুষের টাকা দাবি করছেন, যা সংশ্লিষ্ট মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

এ ব্যাপারে জয় সরকারের মন্তব্য হলো, “একটি সৃজনশীল কাজের জন্য বাজেট কমানোর পরেও যেভাবে শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে মন্ত্রীর নামে ঘুষের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার কাজেও যদি ১০ লাখ অথবা ৭ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়, তবে কাজের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তিনি বলেন, আমি দুর্নীতির কাছে নতি স্বীকার করিনি বলেই আমার নথিটি আটকে রয়েছে।”

শীর্ষনিউজ