তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন চলাকালে ইরানি প্রক্সি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল ‘সিক্রেট সার্ভিস’। উল্লেখ্য, চলতি মাসের ৭ ও ৮ তারিখে এ সম্মেলন অনষ্ঠিত হয়।
কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার বিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে—এমন এক নির্ভরযোগ্য হুমকির তথ্যের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বোয়িং ৭৪৭-৮ মডেলে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন বিমানে চড়ে আঙ্কারায় সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই নতুন বিমানে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো উন্নত আত্মরক্ষামূলক প্রযুক্তি বা অ্যান্টি-মিসাইল ডিফেন্স ব্যবস্থা ছিল না। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সরকার এই হুমকির তথ্য জানার পর সিক্রেট সার্ভিস ট্রাম্পকে জরুরিভিত্তিতে বিমান পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়। এরপর তিনি পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানে করে তুরস্ক ত্যাগ করেন।
প্রথমে নিরাপত্তার কথা স্বীকার না করে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুক্তরাজ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের নতুন বিমানটি দেখানোর সুবিধার জন্য এই পরিবর্তন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন, কাতারি বিমানে কিছু অ্যান্টি-মিসাইল সুরক্ষার ঘাটতি ছিল এবং শিগগির সেটিকে আরও উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ করা হবে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ট্রাম্পকে হত্যার বিষয়ে ইরানের প্রচেষ্টার প্রতি ইঙ্গিত করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা পূর্বেও ইরানের ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য শেয়ার করেছিল, তবে আঙ্কারার বিমান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পাওয়া হুমকিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন সূত্র থেকে।
ইরানের তৎকালীন শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর থেকেই দেশটির সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ট্রাম্পকে নিশানা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
ঘটনাটির পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, নতুন কাতার-প্রদত্ত বিমানটিকে আরও সুরক্ষামূলক আপগ্রেডের জন্য শরৎকালে প্রায় এক মাসের জন্য পরিষেবার বাইরে রাখা হবে।
সামগ্রিকভাবে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, তাদের সুরক্ষিত ব্যক্তিদের ওপর হুমকির মাত্রা বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিক্রেট সার্ভিসের ডিরেক্টর শন কারান একে তাদের ২৪ বছরের কর্মজীবনের মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও অস্থির পরিবেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই ঘটনার আগে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ যখন কাতারের দেওয়া ওই বিমানটির নিরাপত্তা ত্রুটির কথা প্রকাশ্যে এনেছিল, তখন মার্কিন সরকার তথ্য ফাঁসের একটি তদন্ত শুরু করে।
সাংবাদিকরা কীভাবে এই তথ্য পেলেন, তা জানতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও তাদের আত্মীয়দের ফোন রেকর্ড তলব করে গ্র্যান্ড জুরির সাক্ষ্য চাওয়া হয়েছিল। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের সমালোচনার মুখে গত বৃহস্পতিবার বিচার বিভাগ সেই তলব আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।
তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে থাকার সময় ট্রাম্প তাকে হত্যার এই ইরানি প্রচেষ্টা নিয়ে খোলামেলা কথাও বলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা আমাকে হত্যা করতে চায়। আমি তাদের সব তালিকাতেই আছি। এখন পর্যন্ত আমি নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবানই মনে করছি।’
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সাল থেকে ব্যবহৃত পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানগুলো নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। কাতার নতুন এই বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানটি উপহার দেওয়ার পর, সামরিক বাহিনীর নতুন বিমান হাতে না আসা পর্যন্ত এটিকে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প এটিকে তার প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির জন্য রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
অন্যদিকে, বর্তমানে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিক্রেট সার্ভিসের ডিরেক্টর শন কারান।
তিনি জানান, তার ২৪ বছরের কর্মজীবনে বর্তমান সময়ের মতো এতটা অস্থিতিশীল ও ভয়াবহ হুমকির পরিবেশ তিনি আর কখনো দেখেননি। কারানের সঙ্গে ট্রাম্পের নিরাপত্তার বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি ট্রাম্পের দুই মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে তার সিক্রেট সার্ভিস টিমের প্রধান ছিলেন।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পেনসিলভেনিয়ার বাটলারের একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পকে যখন গুলি করে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হয়, তখন কারান তার সুরক্ষায় সেখানেই উপস্থিত ছিলেন।