Image description

বহু বছর আগে ইরানি এক তরুণ তার মায়ের কাছে একটি অদ্ভুত ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি কখনো বিয়ে করেন, তবে তিনি চান ইসলামি বিপ্লবের নেতার পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হতে।

তখন কেউ ভাবেনি, সেই ইচ্ছা একদিন বাস্তবে রূপ নেবে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের কোনো স্বপ্ন ছিল না।

ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবনাচার, জ্ঞানচর্চা, আধ্যাত্মিকতা এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকেই তার এই ইচ্ছার জন্ম হয়েছিল।

বছর কয়েক পরে সেই ইচ্ছা বাস্তবে রূপ নেয়।

দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিচয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় তিনি বিয়ে করেন নেতার কনিষ্ঠ কন্যা সাইয়্যেদা হোদা খামেনিকে।

খামেনির সেই জামাতা ছিলেন ড. মেসবাহ আল-হোদা বাকেরি কানি।

পরবর্তীকালে তিনি ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামি ব্যবস্থাপনা বিষয়ের গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসেবক হিসেবে পরিচিতি পান।

 

এই বিয়ে অবশ্য শুধু দুটি পরিবারের বন্ধন ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কিছু শর্ত, কিছু প্রত্যাশা এবং একটি অঙ্গীকার। ড. মেসবাহ বাকেরি কানির ভাইদের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, বিয়ের সময় আয়াতুল্লাহ খামেনি তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। বিষয়গুলো হলো—রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার জগৎ থেকে দূরে থাকা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে সম্পদ অর্জনের পথ এড়িয়ে চলা, আর নেতার পরিবারের সদস্য হওয়ার পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা বিশেষ সুযোগ লাভের জন্য কখনো ব্যবহার না করা।

লিখিত কোনো চুক্তি ছিল না এসবের পেছনে। ছিল জীবনযাপনের কিছু নীতি, একজন জামাতার প্রতি একজন পিতা ও একজন নেতার প্রত্যাশা।

ড. মেসবাহ বাকেরি কানি সেই অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা রক্ষাও করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, সংস্কৃতি আর মানুষের সেবাই হয়ে উঠেছিল তার জীবনপথ।

পারিবারিক পরিচয়
ড. মেসবাহ আল-হোদা বাকেরি কানি ১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বাকের বাকেরি কানির পুত্র এবং ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ রেজা মাহদাভি কানির ভাতিজা।

বাকেরি কানি পরিবার ইরানের সুপরিচিত ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবারগুলোর অন্যতম। ধর্মীয় শিক্ষা, জনসেবা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল এই পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তার বড় ভাই ড. আলী বাকেরি কানি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কূটনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আরেক ভাই ড. মোহাম্মদ আমিন বাকেরি কানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা মেসবাহ বাকেরি কানির জীবনেও জ্ঞানচর্চা, নৈতিক শৃঙ্খলা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ শৈশব থেকেই গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তার ভাইদের ভাষায়, তিনি কেবল পিতার নির্দেশ মেনে চলতেন না; পিতার প্রতিটি কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার চেষ্টা করতেন। তাদের ভাষায়, ‘আমাদের পিতার প্রতিটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যই তার কাছে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের একটি সুযোগ হয়ে উঠত।’

শ্বশুর হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মানের নয়। তিনি নেতার চিন্তা, নৈতিক দর্শন এবং জীবনযাত্রার শিক্ষা নিজের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করতেন, এমনটাই বলেন তার ভাইয়েরা।

একাডেমিক জীবন
ড. বাকেরি কানি তেহরানের তারবিয়াত মোদারেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক বিপণন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ইসলামি ব্যবস্থাপনা, ইসলামি বিপণন, রাজনৈতিক বিপণন এবং জননীতি। আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের সঙ্গে ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সংযোগ খুঁজে বের করাই ছিল তার গবেষণার মূল লক্ষ্য।

২০০১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি ইরান ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাময়িকীতে বিশটিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তার গবেষণার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো এবং ইসলামি জননীতি।

ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দুই দশকেরও বেশি সময়ের। ১৯৯৯ সালে তিনি ইসলামি শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা অনুষদে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যবস্থাপনার মূলনীতি, অপারেশনস রিসার্চ, মার্কেটিং ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পরিকল্পনার নীতিমালা এবং ইসলামি জননীতি বিষয়ে পাঠদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডক্টরাল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ইসলামি জননীতিতে গবেষণা’ কোর্সও পরিচালনা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একাডেমিক সংগঠক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট থট সাময়িকীর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইসলামি শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা অনুষদের উপ-ডিন হন। ২০১৪ সালে ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন সেন্টারের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।

২০১৭ সাল থেকে শাহাদাত পর্যন্ত তিনি জিহাদি ম্যানেজমেন্ট ত্রৈমাসিকী এবং গ্রোথ রিফ্লেকশনস সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক ছিলেন। একই সঙ্গে ইসলামি মানবিক বিজ্ঞান কংগ্রেসের ইসলামি ব্যবস্থাপনা কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

একাডেমিক জীবনে প্রবেশের আগে তিনি বুনিয়াদে মোস্তাজাফান ও জানবাজানে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। পরে ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও পরিদর্শন বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের চোখে
তার শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। একজন শিক্ষার্থী তাকে স্মরণ করে বলেছিলেন, তিনি নিয়মের চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রয়োজনে নিয়মকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। শিক্ষক তো তিনি ছিলেনই, পাশাপাশি ছিলেন পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা এবং একজন বিশ্বস্ত বন্ধু।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ পুরইজ্জাত তাকে বর্ণনা করেছিলেন এমন একজন গবেষক হিসেবে, যার কাছে গবেষণা ব্যক্তিগত খ্যাতি অর্জনের উপায় ছিল না; বরং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানের একটি মাধ্যম।

তার সহকর্মীদের মতে, মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিভিন্ন মানুষকে একত্রিত করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা এবং নিজের স্বার্থের আগে অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই তার সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা স্মরণ করেছেন। তিনি নীরবে কাজ করতে পছন্দ করতেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার বাইরে
ড. মেসবাহ বাকেরি কানি ছিলেন একজন প্রভাবশালী আলেম পরিবারের সন্তান, ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিকের ভাই, আর ইসলামি বিপ্লবের নেতার জামাতা। এই তিনটি পরিচয়ের যেকোনো একটি অনেক মানুষের জন্য ক্ষমতা, প্রভাব এবং বিশেষ সুবিধার দরজা খুলে দিতে পারত।

তার ঘনিষ্ঠজনরা বলেন, তিনি সচেতনভাবেই সেই পথ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যবসায়িক উদ্যোগেও নিজেকে যুক্ত করেননি। নিজের পারিবারিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুযোগ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি কখনো। তার পৃথিবী ছিল বই, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় আর মানুষ।

শাহাদাত
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় ড. মেসবাহ বাকেরি কানি শহীদ নেতার বাসভবনের কাছেই নিজের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় নিকটবর্তী স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের কার্যালয়ে একটি বৈঠক চলছিল, যেখানে তার ভাই ড. আলী বাকেরি কানিও উপস্থিত ছিলেন।

একের পর এক বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। আশপাশের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভেঙে যায় জানালার কাচ। প্রথমদিকে পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাসই করতে পারেননি যে তিনি নিহতদের মধ্যে রয়েছেন। পরে জানা যায়, হামলার প্রথম মুহূর্তেই তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।

তার ভাইদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক সমাপ্তি ছিল না। বরং এমন একজন মানুষের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি, যিনি সারাজীবন আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং সেবার পথ অনুসরণ করেছেন। পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রকাশ্য হুমকি সত্ত্বেও তিনি পরিবার ও নেতার সান্নিধ্য ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে রাজি হননি। কখনোই না।

স্মরণ
শাহাদাতের পর ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মোতাহহারি মিলনায়তনে এক স্মরণসভা আয়োজিত হয়। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা তাকে স্মরণ করেন এমন একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে, যার কাছে জ্ঞানচর্চা নৈতিক উৎকর্ষ, বিনয় এবং মানুষের সেবার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল।

আজ কেউ তাকে স্মরণ করেন অধ্যাপক হিসেবে, কেউ গবেষক হিসেবে, কেউবা সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে। আবার অনেকের কাছে তিনি শহীদ নেতার জামাতা। তবে ক্ষমতার এত কাছাকাছি থেকেও তিনি কখনো ক্ষমতার মানুষ হয়ে ওঠেননি, এটাই সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ক্ষমতার প্রভাবের সুযোগ পেয়েও নিজের জন্য ব্যবহার করেননি।

একটি বিয়ে, একটি অঙ্গীকার আর সেই অঙ্গীকার রক্ষা করে যাওয়া একটি জীবন—এভাবেই হয়তো সংক্ষেপে বলা যায় ড. মেসবাহ আল-হোদা বাকেরি কানির গল্প।