গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) যাত্রা শুরু হয়েছিল নিছক মশকরা হিসেবে। কিন্তু ভারতের লাখ লাখ অসন্তুষ্ট তরুণের হাত ধরে এটি এখন একটি শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাধর ডানপন্থি সরকারের জন্য এটি এখন সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক শেষ করা ৩০ বছর বয়সি ভারতীয় তরুণ অভিজিৎ দিপকে এই সিজেপি প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি এক শুনানিতে দেশের বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিজিৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজার ছলে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘সব তেলাপোকা একসঙ্গে জড়ো হলে কেমন হয়?’
তার ওই ডাকে বিপুল সাড়া মেলে। অভিজিৎ ব্যঙ্গাত্মক ককরোচ জনতা পার্টির জন্য একটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খোলেন। মূলত মোদির ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) খোঁচা দিতেই তিনি এই দলের জন্ম দেন। সরকারের কড়া সমালোচনা করে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন তিনি। দলটির স্লোগান ছিল, ‘ব্যবস্থা যাদের গুনতে ভুলে গেছে, এটি তাদের রাজনৈতিক দল।’

মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তারা ক্ষমতাসীন বিজেপিকেও পেছনে ফেলে দেয়। মোদি সরকার সমালোচনার বিষয়ে অত্যন্ত অসহিষ্ণু। তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি।
কোন দাবিগুলো সামনে আনছে সিজেপি?
সিজেপি যখন সমর্থন জোগাড় করতে শুরু করে, তখন অভিজিৎ ভারতের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর একটি জ্বলন্ত সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসেন। সেটি হলো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। কর্তৃপক্ষ বারবার সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে এসব প্রশ্ন বিক্রি করে দিয়েছে।
সফল হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক চাপ থাকে। মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার আসনের বিপরীতে ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করেন। অত্যন্ত কঠিন এই মেডিকেল পরীক্ষাটি নিট (এনইইটি) নামে পরিচিত। এই পরীক্ষার কোচিংয়ের খরচ জোগাতে অনেক পরিবার তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে। অনেকে বড় অঙ্কের ঋণের বোঝাও ঘাড়ে চাপে। ভারতে এখন সরকারের উচ্চশিক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় হয় প্রাইভেট টিউশনে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধারাবাহিক চক্র লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর জেরে বেশ কয়েক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন। শুধু নিট পরীক্ষাই নয়, অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে।
সমালোচকেরা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, তারা এই পরীক্ষাবিপর্যয়ের দায় এড়িয়ে গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি তাদের সমর্থকদের জড়ো করতে শুরু করে।
ভারতের জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়ালদের (তরুণ প্রজন্ম) অনেকের জন্যই সিজেপি একটি কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং চাকরির বাজারে তাদের নিয়মতান্ত্রিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া বৃহত্তর হতাশার কথা দলটি তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে ২৫ বছরের কম বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার।

সিজেপি প্রথম কবে রাজপথে নামে?
জুনের শুরুতে সিজেপি প্রথমবারের মতো রাজপথে নামে। দিল্লিতে তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে অভিজিৎ এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। প্রথমে দিল্লিতে এবং পরে সারা দেশে তারা এই কর্মসূচি পালন করে।
ওই মাসের শেষের দিকে সিজেপির সমর্থকেরা দিল্লিতে তাদের দ্বিতীয় বড় বিক্ষোভের আয়োজন করে। এবার তারা ঘোষণা দেয়, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা সরবে না। ভারতের লাদাখ রাজ্যের বিশিষ্ট প্রকৌশলী ও শিক্ষা অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক এই বিক্ষোভে যোগ দেন। অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য গত বছর সরকার তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করেছিল।
সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গান্ধীজির আদর্শে অনশন শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি খাবার গ্রহণ করবেন না।
জুলাই মাস পর্যন্ত বিক্ষোভ ও ওয়াংচুকের অনশন চলতে থাকে। একাধিক জ্যেষ্ঠ বিরোধীদলীয় নেতা তাদের সঙ্গে দেখা করতে যান। তবে মোদি সরকার সিজেপি বা ওয়াংচুকের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। উল্টো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তাদের ‘সন্ত্রাসীদের বি-টিম’ বলে উড়িয়ে দেন।
সোনম ওয়াংচুক কীভাবে সমর্থন জোগাড় করলেন?
অনশনের দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হওয়ার পর ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এতে সরকার ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৮ দিন পর দিল্লির একটি আদালত প্রতিদিন তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেন।
রোববার (১৯ জুলাই) ভোরে, অনশনের ২০তম দিনে, দিল্লি পুলিশ ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। তারা তাকে একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। পুলিশের এই পদক্ষেপে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পুলিশ জানায়, ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তার স্ত্রী এই ঘটনাকে ‘বেআইনি আটক’ বলে তীব্র নিন্দা জানান।
হাসপাতালের বিছানা থেকে ওয়াংচুক সিজেপির সমর্থকদের সোমবার (২০ জুলাই) পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা করার আহ্বান জানান। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই কর্মসূচি পালনের কথা বলেন।

সোমবারের বিক্ষোভ কতটা বিশাল ছিল?
সিজেপির সোমবারের এই বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। ভোরবেলাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী মধ্য দিল্লির রাস্তায় জড়ো হতে শুরু করেন। আগের রাতে ক্যাম্প করে থাকা শত শত মানুষের সঙ্গে তারা যোগ দেন।
ভিড়ের বড় অংশই ছিল শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য তরুণেরা। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরাও বিপুল সংখ্যায় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারীদের পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার অনুমতি দেয়নি। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয় পুলিশ। কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পার্লামেন্ট থেকে প্রায় এক মাইল দূরের একটি নির্দিষ্ট বিক্ষোভস্থলে বিক্ষোভকারীদের আটকে রাখে পুলিশ। তা সত্ত্বেও দলে দলে বিক্ষোভকারীরা আসতে থাকেন। দুপুর গড়ানোর আগেই সেখানে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ জড়ো হন।
বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ সহিংস হয়ে ওঠে। তারা লাঠিপেটা করে এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। সিজেপি নেতা ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকেরা পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। সংঘর্ষে বিক্ষোভকারী ও পুলিশ, উভয়পক্ষই আহত হয়। অভিজিৎ পুলিশের এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান।
পরবর্তী পরিস্থিতি কী?
কয়েক সপ্তাহ ধরে সিজেপির আন্দোলনকে অবজ্ঞা করে আসছিল মোদি সরকার। অবশেষে সোমবার সকালে তারা একটি বৈঠকের প্রস্তাব দেয়। মাত্র ১০ মিনিটের ওই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সিজেপির পক্ষ থেকে তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়। সিজেপির মুখপাত্র জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ‘কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি’।
বিক্ষোভ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। সোমবার গভীর রাতে পুলিশ দিল্লির বিক্ষোভ ক্যাম্পটি পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। তবে অভিজিৎ জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী তার পদে বহাল থাকা পর্যন্ত তারা সেখান থেকে সরবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দলটির এক পোস্টে বলা হয়, ‘এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শেষ হচ্ছে না!’
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত
লেখক: হ্যানা এলিস-পিটারসেন, দ্য গার্ডিয়ানের দিল্লি প্রতিনিধি।