ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) টানা ষষ্ঠ রাতে তেহরানে বড় ধরনের হামলার দাবি করেছে পেন্টাগন। জবাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা করেছে ইরান।
গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের শান্তি আলোচনায় ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৮ ইরানি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ।
ইরানে কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় ইরানে সর্বশেষ হামলা চালিয়েছে তারা। তবে ইরানের ঠিক কোন কোন জায়গায় আঘাত হয়েছে, সে সম্পর্কে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি।
তবে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী সারা দেশে অন্তত ছয় সেতু, রেলওয়ে স্টেশন এবং অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন।
ইরানের ফার্স নিউজ জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের ছয়টি সেতুতে আঘাত হানা হয়েছে। আঘাতপ্রাপ্ত সেতুর মধ্যে রয়েছে বন্দর আব্বাসকে খামির ও লারার সঙ্গে যুক্ত করা গারিভেহ সেতু। লাতিদান গ্রামের কাছের একটি সেতুতেও হামলা হয়েছে। কাহুরেস্তান-লার রুটের দুই সেতু ধ্বংস হয়েছে। বন্দর ই-খামির, কেশার ও বন্দর আব্বাসকে যুক্ত করা আংশিক নির্মিত সেতুতেও আঘাত হেনেছে মার্কিন বাহিনী। এছাড়া খামির জেলায় মারু গ্রামের সেতুতে হামলা হয়েছে।
ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সর্বশেষ মার্কিন হামলায় বন্দর আব্বাস ও এর আশপাশের গ্রামগুলোর বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে।
উপসাগরীয় কোন দেশগুলোতে পাল্টা হামলা হয়েছে
শুক্রবার সকালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) উপসাগরীয় এলাকার মার্কিন ঘাঁটিতে ১৩তম দফার পাল্টা হামলার দাবি করেছে। সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা এই পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
শুক্রবার সকালে বাহরাইনে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জনগণকে শান্ত থাকতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানানো হয়।
শুক্রবার ভোরে কাতার কর্তৃপক্ষ প্রায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি আলাদা সতর্কবার্তা জারি করে। ইরান থেকে ছোড়া প্রজেক্টাইল ও অন্তত একটি মিসাইল দেশটিতে আঘাত হানার পর এই সতর্কতা দেওয়া হয়। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব প্রজেক্টাইল মাঝপথেই আটকে দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশপথে বাধা দেওয়ার সময় ওপর থেকে পড়া গোলার টুকরো বা শ্র্যাপনেলের আঘাতে এক শিশু আহত হয়েছে।
শুক্রবার ওমানের ঘানিম অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার কন্ট্রোল রাডার ধ্বংস করার দাবি করেছে আইআরজিসি। বৃহস্পতিবার ওমানের খাসাব থেকে প্রায় ১৯ নটিক্যাল মাইল পূর্বে সাগরে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি এই তথ্য জানিয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, এতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা করেছে তারা। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সির মতে, হামলায় মিসাইল ডিফেন্স রাডার এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগার ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি দুটি হিমার্স সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল লঞ্চারেও আঘাত হানা হয়েছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, তারা দেশটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ইরানি মিসাইল ধ্বংস করেছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব মিসাইল আটকে দেয়। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
সিরিয়ার আল-তানফ সামরিক ঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড সেন্টারেও হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
হরমুজ ও লোহিত সাগরের অনিশ্চয়তায় তেলের দাম বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এমনিতেই সীমিত। এর সঙ্গে লোহিত সাগর বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা যুক্ত হওয়ায় জাহাজ চলাচল আরও হুমকির মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের লোহিত সাগরের রপ্তানি রুট বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে ইরান।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৫৩ ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ দশমিক ৭৬ ডলার। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১ দশমিক ৬৯ ডলার বেড়ে ৮০ দশমিক ৬৪ ডলার হয়েছে। এই সপ্তাহে উভয় বেঞ্চমার্কেরই দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, তেলের নিরাপত্তা এখনো চরম সংকটজনক। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পুরো বিশ্বেরই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।
সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রু হুদিস্তিয়ানু আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, কূটনীতির জন্য বরাদ্দ সময় এখন স্থগিত হয়ে গেছে। তাঁর মতে, কূটনীতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়কেই এই যুদ্ধ থেকে বের হতে হবে। যুদ্ধ কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। তাই তারা একসময় সমাধানের পথ খুঁজবে।
তবে হুদিস্তিয়ানু জানান, এই যুদ্ধের শুরু থেকেই উভয় পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তবে সব উদ্দেশ্য সরে গিয়ে এখন হরমুজ প্রণালিই কেন্দ্রবিন্দু।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ নতুন মোড় পেয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েরই হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা থেকে।
ভায়েজ পরিশেষে বলেন, পুরো সংঘাত এখন একটিমাত্র প্রশ্নের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। আর সেই প্রশ্নটি হলো, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে থাকবে।
ইরানি এবং মার্কিন নেতারা কী বলছেন
ইরানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি কখনোই যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে অস্থিতিশীল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে জো রোগানের পডকাস্টে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইসরায়েল সরকারের বেশ কয়েকজন সদস্য মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। তারা চেয়েছিলেন মার্কিন জনগণ যেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে চুক্তির বিরোধিতা করে।
ভ্যান্স বলেন, তিনি সন্দেহাতীতভাবে জানেন যে ইসরায়েল সরকারের ভেতরে এমন কিছু লোক আছেন যারা যুক্তরাষ্ট্রকে এই নীতি থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলের কিছু লোক সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে চান।