টানা এক বছর তদন্তের পর ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য অনুশীলনের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে আগামী সম্পাহ থেকে লাতিন আমেরিকার দেশটির বেশকিছু আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে এক বিবৃতিতে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার।
সিএনএন জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আমদানি শুল্কের আইনি ভিত্তি বাতিল করে। এরপর শুল্ক পুনর্বহালের যে প্রতিশ্রুতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছিলেন, এটি তার প্রথম বাস্তবায়ন।
ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২২ জুলাই থেকে এই ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে।
জেমিসন গ্রিয়ার জানান, মার্কিন তদন্তে উঠে এসেছে যে ডিজিটাল বাণিজ্য, ইথানল বাজারে মার্কিনদের প্রবেশাধিকার এবং ব্রাজিলে অবৈধভাবে আমাজন বন উজাড়ের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে দেশটির সরকারি নীতি মার্কিন স্বার্থের চরম ক্ষতি করছে।
ব্রাজিল সরকারের তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট লুলা এবং তার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে আলোচনা করেনি। তার অর্থনৈতিক নীতি আমেরিকান ও ব্রাজিলিয়ান উভয় দেশের জনগণের জন্যই ক্ষতিকর।’
তিনি আরও বলেন, গত এক বছর ধরে লুলা দেশের কল্যাণে একটি টেকসই চুক্তিতে আসার চেয়ে নিজের অহংকারকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। আর এই নতুন শুল্কই হচ্ছে তার সেই একগুঁয়েমির মাশুল।’
যুক্তরাষ্ট্রের এমন আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। এই শুল্ককে ‘অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।’
লুলা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, ব্রাজিল তার নিজস্ব ‘পারস্পরিকতা আইন’-এর অধীনে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে ইউএসটিআর-এর কার্যালয় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই বাড়তি শুল্ক ব্রাজিলের বড় রপ্তানি খাতগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কফি, গরুর মাংস, অ্যাভোকাডো, ব্রাজিল বাদাম, পেট্রোলিয়াম তেল ও বিমানের যন্ত্রাংশের মতো প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য প্রতিনিধি গ্রিয়ার অবশ্য জানিয়েছেন, এই সংকট নিরসনে এখনও ব্রাজিলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে ওয়াশিংটন।
শুল্কের বোঝা পৌঁছাতে পারে সাড়ে ৩৭ শতাংশে
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের কুখ্যাত ‘বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা’র অধীনে গত বছরের জুলাই মাসে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এই প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছিল ওয়াশিংটন। মূলত মার্কিন বাণিজ্য ও বাজার প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে, এমন বিদেশি কার্যক্রমের রাশ টানতেই এই ধারা ব্যবহার করা হয়।
সে সময়েই ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। ট্রাম্প সে সময় ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বন্ধ না করলে চরম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন।
এখানেই শেষ নয়, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগসংক্রান্ত ইউএসটিআর-এর আরেকটি পৃথক ‘ধারা ৩০১’ তদন্তের অধীনেও ব্রাজিলের নাম রয়েছে। আগামী সপ্তাহে শেষ হতে যাওয়া ওই তদন্তের আওতায় ব্রাজিলের পণ্যের ওপর আরও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হতে পারে। তেমনটি ঘটলে ব্রাজিলের মোট শুল্কের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশে।
সাধারণত চীনের মতো যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ৩০১ ধারা প্রয়োগ করা হয়। গত বছর চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে ব্রাজিলের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গত বছর ব্রাজিলের সাথে পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত ছিল ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।