ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় এবং ব্যাপক আকারের সামরিক অভিযান শুরু করার বিষয়ে নিজের শীর্ষ নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের অতি সুরক্ষিত সিচুয়েশন রুমে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই নতুন হামলাগুলো বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে চলমান মার্কিন বিমান হামলার চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও বিস্তৃত হবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প এই যুদ্ধের তীব্রতা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান যাতে ইরান শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো, ইরানকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করা যাতে তারা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দিতে এবং ট্রাম্পের দেওয়া পারমাণবিক শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়।
এমন এক সময়ে ট্রাম্প এই বৈঠকে বসেছিলেন, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি অঞ্চল এবং ইরানের দক্ষিণ উপকূলে টানা চতুর্থ দিনের মতো হামলা চালাচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার সিস্টেম, জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা। এর উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা একেবারেই ভেঙে দেওয়া।
এর জবাবে ইরানও জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার বিকালে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ইরান এ অঞ্চলে সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত ১২ জন বেসামরিক ক্রু সদস্য নিহত, নিখোঁজ অথবা আহত হয়েছেন। তবে এই চরম উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন সামরিক বাহিনী গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩০০টি জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত সমন্বয় করতে সক্ষম হয়েছে।
সিচুয়েশন রুমের ভেতরে কী আলোচনা হলো
মঙ্গলবারের ওই বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে হরমুজ প্রণালির বাইরে ইরানের ভেতরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বড় ধরনের বিধ্বংসী হামলা চালানোর নতুন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অবশ্য এই বৈঠকের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
‘বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু উড়িয়ে দেওয়া হবে’
সিচুয়েশন রুমের বৈঠকের আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, আগামী দিনগুলোতে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার পরিধি আরও অনেক বাড়াবে। তিনি জানান, আগামী তিন দিন মার্কিন বাহিনী ইরানকে অত্যন্ত ‘কঠোর’ আঘাত করবে এবং এরপর হামলার মাত্রা নাটকীয়ভাবে আরও বৃদ্ধি পাবে।
ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের জন্য সত্যিই ভয়াবহ হয়ে উঠবে। কারণ, আগামী সপ্তাহে আমাদের হামলার তালিকায় যুক্ত হবে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলো। তারা যদি আলোচনার টেবিলে এসে চুক্তি না করে, তবে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতু ধ্বংস করে দেব।’
নজরে ভূগর্ভস্থ ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও প্রকাশ করেন যে, ইরান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামক একটি গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সন্দেহজনক কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা, ইরান এই গভীর ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিটি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ব্যবহার করতে চায়, যা সাধারণ বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা অসম্ভব।
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমাগুলো মাটির অনেক গভীরে গিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম। তিনি বলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এই বোমার আঘাত সইতে পারবে কিনা তা আসলে কেউ জানে না। তা ছাড়া, তারা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আদৌ কিছু করছে কিনা তা-ও নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না। এটি কেবল একটি আলোচনার বিষয়। সেখানে আমাদের ক্যামেরা বসানো আছে এবং খুব কম কার্যক্রমই চোখে পড়েছে। তবে সেখানে যদি সামান্যতম সন্দেহজনক কিছুও ঘটে, আমরা সেখানে অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানব।’
‘চুক্তি না করলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’
চলমান পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের আলোচনার টেবিলে আসার কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
ইরানকে দেওয়া নিজের শেষ সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি, তোমাদের জন্য ভালো হবে একটা চুক্তি করে ফেলা। অন্যথায়, তোমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’