Image description
আরও ভয়াবহ হচ্ছে গ্যাস সংকট

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। এতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ। সরবরাহ বাড়াতে সরকারের দৃশ্যমান বড় কোনো উদ্যোগ না থাকায় আগামী বছর থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে কয়েকশ কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথবা এসব কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। এতে কাজ হারাতে পারেন অসংখ্য শ্রমিক ও কর্মচারী। ইতোমধ্যে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরাও। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতিতে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, গ্যাসের চাপ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সব শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। বিষয়টি বিভিন্ন ফোরামে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৭ কোটি ঘনফুট বাড়ানো হয়েছিল। এতে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, আশুলিয়া, চন্দ্রা, ধনুয়া, রাজেন্দ্রপুর ও কোনাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ শিল্পকারখানায় চরম গ্যাস সংকট দেখা দেয়। একই কারণে রাজধানীর কিছু বাসাবাড়িতেও জ্বলে না গ্যাসের চুলা।

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। শনিবার সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে আবার আমদানি করা এলএনজি ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুট। সরকারি হিসাবে, শুধু তিতাস এলাকায় শিল্পকারখানা ও ক্যাপটিভ সংযোগ আছে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি। এর মধ্যে এখনই কয়েকশ কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসাতে সরকার চেষ্টা করছে। যাতে ওই সময়ে আরও ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। তবে কোন কোম্পানিকে ওই টার্মিনাল বসানোর কাজ দেওয়া হবে তার কোনো সিদ্ধান্ত গত ৫ মাসেও নিতে পারেনি সরকার।

সরকার এখনই নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দিতে চাপে আছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে বছরের পর বছর গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষা করছে ৫৫০টি শিল্পকারখানা। এছাড়া আরও এক হাজার ৩০০টির মতো নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগের আবেদন বছরের পর বছর পড়ে আছে। এই ১৮০০ শিল্পগ্রাহককে সংযোগ দিতে হলে অতিরিক্ত গ্যাসের দরকার হবে ৪০ কোটি ঘনফুটের বেশি।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে ধীরে ধীরে গ্যাসের সরবরাহ দারুণভাবে কমে যাচ্ছে। ভয়াবহ হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। প্রতিবছর দেড় কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস উৎপাদন কমছে বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে। কিন্তু চাহিদা বাড়ছে তার কয়েকগুণ হারে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে (আমদানি করা গ্যাসসহ) ২৬৫ কোটি ঘনফুট। আগামী বছরের জুনে এই সরবরাহ ২৬০ কোটি ৭০ লাখে নামবে। ২০২৮ সালে এই সরবরাহ আরও কমে ২৫৭ কোটি ঘনফুটে পৌঁছবে। অথচ তখন চাহিদা থাকবে ৫০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, ওই বছরের শেষে দেশের ২২ ক্ষেত্রের উৎপাদন নেমে আসবে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুটে। যা এখন আছে ১৬৫ কোটি ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৯ সালে ভোলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তার কোনো ঠিক নেই। এর মধ্যে ভোলা ক্ষেত্রের গ্যাস বরিশাল হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আনার জন্য গ্যাস লাইন বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেই পাইপলাইন কবে বসবে তা এখনো ঠিক হয়নি।

ভোলা ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কূপ খনন করে গ্যাসের উৎপাদন ২০২৯ সালের মধ্যে বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু গত ৪ বছরে ২০টির বেশি কূপ খনন করে ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ বাড়াতে পারেনি সংস্থাটি।

জানা গেছে, গ্যাস সরবরাহ বা উৎপাদন বাড়ানোর মতো বড় কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। মে মাসে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই দরপত্র জমা হবে নভেম্বরে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো বঙ্গোপসাগরে কূপ খননে আগ্রহী হলে তাদের সঙ্গে সমঝোতা এবং অন্যান্য সব প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ সময় লাগবে।

দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ : পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন ২২টি গ্যাসক্ষেত্র আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হয় মার্কিন কোম্পানি শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে। ওই ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগে গ্যাস উৎপাদন হতো দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট। এখন সেই উৎপাদন নেমে এসেছে ৭৪ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। আগামী বছর তা আরও কমে যাবে। তবে সবচেয়ে বেশি কমবে ২০৩০ সালের পর। এ ছাড়া ‘তিতাস ক্ষেত্রে’ উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল ৫৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এখন কমে ৩২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট হয়েছে। হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে ২২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটের উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও এখন তা ১০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে নেমেছে। বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্র ৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটের স্থলে ১ কোটি ৯৪ লাখ ঘনফুট, ফেঞ্চুগঞ্জ ২ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটের স্থলে উৎপাদন করছে ২৬ কোটি ঘনফুট। মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র এক সময় ৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট উৎপাদন করলেও এখন করছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ঘনফুট। বাংগুরা ক্ষেত্রে ১০ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট উৎপাদনের রেকর্ড থাকলেও এখন করছে ৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট এবং সিলেট গ্যাসক্ষেত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটের স্থলে উৎপাদন করছে ৬৭ লাখ ঘনফুট। এভাবে আস্তে আস্তে সব ক্ষেত্রে গ্যাসের প্রদীপ নিভে আসছে।