২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড-সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। গত মাসে একই কমিশন আবারও অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে, ইসরায়েলি পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হলো, গাজার শিশুদের নিশানা করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া। বলে রাখা ভালো, কমিশনটি এখন ভারতের এক বিশিষ্ট আইনবিদ বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) এস মুরলীধরের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
৯৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি শিউরে ওঠার মতো। সেখানে গাজায় ইসরায়েলের চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা ও তাদের কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা সুনির্দিষ্ট গণহত্যামূলক অভিসন্ধির নির্মম বিবরণ রয়েছে। অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৪৪ হাজার শিশু, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে।
শিশুদের নিশানা করা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। নিহত বা আহতদের মধ্যে ২৭ শতাংশই শিশু এবং নিহত অনেক শিশুর মাথায় ও ঘাড়ে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা-অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে গর্ভপাত ও সন্তান-প্রসবকালীন জটিলতা ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসরায়েলে চালানো হামাসের জঘন্য, নৃশংস ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হামলার পর থেকে গত আড়াই বছরে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপগুলো ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বর। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রিসভার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় ইসরায়েলি নেতারা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’ এবং ইসরায়েলের সাফল্য বলতে তাঁরা সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘লাখ লাখ মানুষের গাজা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াকে’।
এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ডিসিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের সমর্থন ইসরায়েলি সরকারকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এ নির্মম অভিযান অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছে। তবে বিশ্বের বাকি অংশ তাদের বিবেকের তাড়না বোধ করেছে।
আমেরিকার বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তারা ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ ও দলিল তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষস্থানীয় শক্তিগুলো—ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ—ফিলিস্তিনিদের প্রতি দশকের পর দশক ধরে উদাসীন থাকার পর অবশেষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) টেনে এনেছে। এই দেশটির সঙ্গে অবশ্য ভারতের উপনিবেশ-বিরোধী সংহতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং বেশ কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশ তাদের সম্পর্কের অবনতি বা ছিন্ন করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে মন বিপুল সংখ্যক দেশ গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মোদি সরকারের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেবল নৈতিকভাবেই নিন্দনীয় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যাতীত। ইসরায়েলের কৌশলগত কক্ষপথের দিকে আমরা আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছি এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব ক্রমশ তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান গণ-অসন্তোষ ও গাজায় চালানো অমার্জনীয় বর্বরতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সচেতনতার মধ্যেও ভারত এক নীরব কণ্ঠস্বর হিসেবে রয়ে গেছে। বিচারপতি মুরলীধরের যে প্রতিবেদনটি গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলন উসকে দিয়েছে, এটির ক্ষেত্রেও নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নীরবতা বেছে নিয়েছে। এটি মোটেও বিস্ময়কর নয়—মনে করে দেখুন, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার প্রাক্কালে বিজেপি নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরই বিচারপতি মুরলীধরকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছিল।
উত্তর-ঔপনিবেশিক সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের কারণে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ভারত ছিল অনন্য। এখন আমরা নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক শৃঙ্খলার চরম লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের আমাদের বন্ধুপ্রতিম মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে প্রকাশ্যে প্রদর্শিত মানবমর্যাদার অবমাননার প্রতি ধারাবাহিক উদাসীনতা প্রদর্শনের মাধ্যমে অনন্য হয়েছি।
হিন্দ রজবের মর্মান্তিক কাহিনি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার বর্ণনাতীত নিষ্ঠুরতার প্রতীক। মাত্র পাঁচ বছরের একটি মেয়ে, যে তার পরিবারের সঙ্গে গাজা শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের গাড়িতে ৩৩৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়েছিল। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হন এবং চিকিৎসাকর্মীরা তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করার সময় সে তার আত্মীয়দের মৃতদেহের সাথে গাড়িতে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীর সাথে তাকেও হত্যা করা হয়।
ভারতের নাগরিকরা বিশ্বনাগরিক হিসেবে হিন্দ রজব ও আরও অগণিত ফিলিস্তিনি শিশুর গল্প জানার অধিকার রাখে। তবুও ইসরায়েলের মর্মবেদনার কথা মাথায় রেখে ভারতে এ চলচ্চিত্রটি মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। তারপর তীব্র জনমতের চাপে এখন এটি ছাড়পত্র পেয়েছে।
মোদি সরকারের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেবল নৈতিকভাবেই নিন্দনীয় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যাতীত। ইসরায়েলের কৌশলগত কক্ষপথের দিকে আমরা আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছি এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব ক্রমশ তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েলের যুদ্ধ ও তার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
আমরা ফিলিস্তিন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ঐতিহাসিক মিত্রদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছি। বৈশ্বিক জনমত থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি। আমরা পাকিস্তানের মতো একটি দেশকে (যা নিজেই ভয়ানক সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে) মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিয়েছি—যে ভূমিকাটি সব পক্ষের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আমাদেরই স্বাভাবিকভাবে রাখার কথা ছিল। আমাদের কৌশলগত স্বার্থ ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই পাইনি, যিনি এখন আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে সমালোচিত ও কোণঠাসা।
ভারতীয় জাতীয়তার চেতনার দাবি হলো, আমরা আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের পক্ষে কথা বলি, যাদের সন্তানদের এত নির্মমভাবে নিশানা করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের হিসাব এই দাবি রাখে যে, গাজায় ইসরায়েলি শাসনের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে নির্মমভাবে বাস্তুচ্যুত ও উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমতের প্রতি আমরা সাড়া দিই। মোদি সরকারের এই ধারাবাহিক নীরবতাকে যৌক্তিক বা নৈতিকভাবে কোনো ব্যাখ্যাই করা যায় না।
সোনিয়া গান্ধী: ভারতের কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপার্সন
(ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ করেছেন নাঈমুল আলম মিশু)