শর্ট ইনিংস খেলেছেন উপদেষ্টারা। মাত্র আঠারো মাসের দায়িত্ব। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসা বিলের অঙ্কটা বেশ লম্বা। নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীরাও চিকিৎসা বিল নেন। আইনগতভাবেই সেটা। তবে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যাদের হাতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নের দায়িত্ব, তারাই যদি চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কী বার্তা যায়? অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্নই উঠেছে। আইনগত বৈধতা থাকলেও নৈতিকতা ও জনআস্থার জায়গায় বিতর্ক রয়েছে।
এসব বিতর্ক একপাশে ফেলে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন একাই নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এমনটাই জানিয়েছে।
হেফাজত ইসলামের সাবেক নায়েবে আমির চিকিৎসা নিয়েছেন থাইল্যান্ডে। হৃদরোগ খালিদ হোসেনের। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বলেছিল হার্টে যে সমস্যা, তার চিকিৎসা দেশে নেই। বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত অপারেশনের ঝুঁকি রয়েছে। তারা থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের কাছে এমনটাই দাবি খালিদ হোসেনের।
খালিদ হোসেন সরকারের অনুমোদন নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত বছরের শেষদিকে এবং চলতি বছরের প্রথমদিকে তিনি থাইল্যান্ডে যান। অপারেশন করান। প্রথমবার সঙ্গে ছিল চিকিৎসকও। পরের দফায় মেয়ে ও তার স্বামী। খালিদ হোসেন জানালেন, তার এখনো সমস্যা হয়। কিন্তু খরচ বেশি বলে যেতে পারছেন না।
প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা করাতে বিভিন্ন দেশে যান। মেডিকেল ট্যুরিজমের আওতায় ভারতে যান ১৫ থেকে ১৭ লাখ বাংলাদেশি। যদিও এ পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের আগের। তারপর পরিস্থিতি পাল্টালেও চিকিৎসার জন্য দেশটিতে যেতে চান রোগীরা। ভারতের পরই থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর যান চিকিৎসা নিতে। সেই সংখ্যাটাও কম নয়।
ওপরের পরিসংখ্যান দিয়ে খালিদ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অতীতের সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ব্যর্থ কি না। উত্তরে অকপট খালিদ হোসেন, ‘নিশ্চয়ই ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা কেন এত বছরেও একটি ভালো হাসপাতাল করতে পারলাম না। আমরা মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মতো হাসপাতাল করতে পারিনি। ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা লুট হয়, পাচার হয়। দেশে চিকিৎসা থাকলে এত খরচ হতো না। চিকিৎসা বাবদ আমার নিজেরও অনেক টাকা খরচ হয়েছে। দেশে চিকিৎসা থাকলে কেউ যাবে? এটা প্রমোদ ভ্রমণ নয়।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্যাবিনেটে আপনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। উপদেষ্টা পর্ষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি কেন? এ প্রশ্নের উত্তরও প্রস্তুত ছিল, উপদেষ্টা বা মন্ত্রীরা ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করতে পারেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। ইচ্ছা থাকলেই এখনে কিছু করা যায় না।
শুরুতে ১৬ উপদেষ্টা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরে আরও কয়েকজন যুক্ত হন বিশেষ সহকারী বা অন্য নামে। অন্তর্বর্তীদের আঠারো মাসের শাসনামলে তাদের অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা বিল নিয়েছেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও রয়েছেন এ তালিকায়।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন ৭৯ লাখে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আঠারো মাসে বিদেশে চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি কোষাগার থেকে বিল নিয়েছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিদেশে চিকিৎসা খরচের এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। তিনি ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। বিদেশে চিকিৎসা বাবদ ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা নিয়ে প্রথম অবস্থানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়ের প্রতিনিধিকে বললেন, ‘আমি খুব সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। একপর্যায়ে শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দেশে চিহ্নিতই করা যাচ্ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরকারের অনুমোদন নিয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছি। সেখানে আমি তিনবার চিকিৎসা নিয়েছি।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন এই উপদেষ্টা। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ০.০০০১৮৯ শতাংশ। প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা করাতে বিভিন্ন দেশে যান।
খালিদ হোসেন ও সালেহউদ্দিন আহমেদের বাইরে তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদেশে চিকিৎসা বিল নিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা।
৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা নিয়েছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ নিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা। ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা নিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম। খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা।
এ ছাড়া পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ নিয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ টাকা। ৩১ হাজার ৫২ টাকা নিয়েছেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান ২১ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন চিকিৎসা বাবদ নেন ৪ হাজার ১৬০ টাকা।
দেশের চিকিৎসা বিলও দেয় না মন্ত্রীরা
মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের চিকিৎসার বিষয়টি তদারকি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তারা বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে তার বিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেয়। পরে তা মন্ত্রীদের অ্যাকাউন্টে যোগ হয়।
দেশেও মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা বিনা খরচেই চিকিৎসা নেন। তারা সাধারণত সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মন্ত্রীদের কাছ থেকে সেই বিলের টাকা নেন না।
সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদসচিব আগামীর সময়ের এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে দেশি হাসপাতালে মন্ত্রীদের চিকিৎসার বিল বড় অঙ্কের হয়ে যায়। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই বিলের একটা কপি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে দেন। এটা আনুষ্ঠানিকতা। কর্তৃপক্ষ যেন বলতে পারে তারা বিল পাঠিয়েছে। অডিট মোকাবিলা করার জন্য তারা এটা করে থাকে।’
‘মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের চিকিৎসা বিল মেটানোর জন্য আইন আছে। কিন্তু এটা ধরে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। অর্থবছর ধরে একটা বরাদ্দ থাকে। সেখান থেকে প্রয়োজন মতো বিল পরিশোধ করা হয়।’—যোগ করেন তিনি।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানালেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ব্যক্তি অসুস্থ হলে সরকার তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। জরুরি প্রয়োজন হলে বিদেশেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো মাসিক বা বার্ষিক চিকিৎসা ভাতা নয়।
চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘অসুস্থতার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার দাখিলের শর্তে সরকার চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করে। যদি এমন হয়ে থাকে যে অর্থ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। তাহলে যিনিই অর্থ গ্রহণ করে থাকুন না কেন, তা নিয়মবহির্ভূত। একই সঙ্গে যারা এ অর্থ অনুমোদন ও ছাড় করেছেন, তারাও অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন না।’
‘বিষয়টির সুনির্দিষ্ট তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায় নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কী প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।’—যোগ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, ‘বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত। বিল-ভাউচার ছাড়া কীভাবে অর্থ ছাড় করা হলো, তা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’