মুহাম্মদ নূরে আলম
ভূমিকা
ইউরোপে তখন শিল্পবিপ্লবের জোয়ার। আর এদিকে প্রায় ছয়শো বছরের দাপুটে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পড়ন্তবেলা। আজকের দিনে আমরা যে আধুনিক তুরস্ক দেখি, তৎকালে এটিই ছিল মুসলিমদের সর্বশেষ খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর পূর্বসূরিদের গৌরবময় ইতিহাসের সাথে পেয়েছিলেন একদল দুর্নীতিপরায়ণ আমলা, শূন্যপ্রায় রাজকোষ, সেই সাথে মূলধারার ধর্ম থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি শিক্ষিত কুচক্রী মহল; যাদের লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবেই হোক খলিফাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইউরোপের আদলে তুরস্ককে গড়ে তোলা। একদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্দশা, অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ একরকম নড়বড়ে অবস্থায় মসনদে বসেন।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের এমন ক্রান্তিকালে তুর্কি মুসলিমদের আলোর দিশারি হয়ে আবির্ভাব ঘটে একজন মহামানবের। তিনিই হলেন যুগের বিস্ময় বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর কথা। দিকে দিকে সেকুলার কামালবাদের জয়ধ্বনি। সব আশা শেষ! বিশ্বাসীরা হাল ছেড়ে দিলো, পরাজয় মেনে নিলো এই বুঝি। লাঞ্ছনা, অপমান আর অপদস্থতার এক জীবন তাদের। ধীরে ধীরে ইসলামকে জীবন থেকে মুছে ফেলার সব আয়োজন চূড়ান্ত হচ্ছে। মুসলমানিত্ব মানেই যেন পরীক্ষা। ঘুমিয়ে যাচ্ছে উম্মাহ। হাল ছেড়ে দিচ্ছে সবাই।
কিন্তু নাহ! তিনি জেগে উঠলেন, দায়িত্ব নিলেন সবাইকে জাগানোর। শেষ থেকেই যেন শুরু। ধ্বংসস্তূপ থেকেই ফিনিক্স পাখির ঠোঁট বের হলো। আমরা বলছি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, কুরআনের জীবনমুখী ও বৈজ্ঞানিক ধারাভাষ্যকার, শ্রেষ্ঠ দা’য়ী, রাষ্ট্রচিন্তক ও জ্ঞানতত্ত্ববিদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির কথা। জাহেলিয়াতের ভরা যৌবনেও যিনি সত্যের মশাল বয়ে নিয়েছেন বিচক্ষণতার সাথে। জোয়ার দেখেও যিনি এতটুকু হীনম্মন্যতায় ভোগেননি; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তির রাজপথ নির্মাণ করেছেন দক্ষ কারিগর হয়ে।
বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে আবির্ভূত হওয়া সেই সকল মানুষদের একজন, যারা জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারে মশাল হাতে আলোর মিছিল শুরু করেছিলেন। তাঁর হাতে সূচিত সেই আলোর মিছিলই আজ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি ইসলামি সমাজে নেমে আসা অন্ধকারকে কুরআনের আলো দিয়ে বিদূরিত করতে হয়। দেশ ও জাতির বিপর্যয় ও ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতির অবক্ষয়ের সময়েও ঈমানের নূর ছড়িয়ে দিয়ে সেই অন্ধকারকে দূর করতে হয়। আরও দেখিয়েছেন, ভালোবাসা দিয়ে কীভাবে মানুষকে আল্লাহর পথে আনতে হয়।
তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলিম। দেশের জন্য লড়াকু সৈনিক, ইসলামের খাদেম। শরিয়াহর অতন্দ্র প্রহরী। কুরআনের জন্য সারাজীবন কারাপ্রকোষ্ঠে কাটিয়ে দেওয়া এক যুগশ্রেষ্ঠ উস্তাদ; যিনি অন্ধকারের কারাপ্রকোষ্ঠকেই বানিয়েছিলেন আলোর মাদরাসা। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি আধুনিক তুরস্কের রূপকার। আজকের তুরস্কের ভেতর থেকে এই বিশাল পরিবর্তনের নেপথ্য পুরুষ এই নুরসি।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার, যুগ সংস্কারক, বিখ্যাত রিসালায়ে নুর-এর লেখক বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির সংগ্রামী জীবনী পড়তে আপনাদের স্বাগতম।
ব্যক্তিত্ব ও জীবনী
দুর্গতি, দুর্দশা ও অন্ধকার সময়ে উম্মাহকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক পথ দেখিয়েছেন—এমন আলিমের সংখ্যা ইসলামের ইতিহাসে কম নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম উম্মাহর চরম দুর্দিনে, তুরস্কের কঠিন অবস্থার সন্ধিক্ষণে একজন অমিত মনোবলসম্পন্ন মহাপুরুষের জন্ম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক উসমানীয় খিলাফতের ক্ষীয়মাণ দশায় ১৮৭৭ সালে (১২৯৩ হিজরি) ফজরের আজানের সময় পূর্ব তুরস্কের বিতলিস প্রদেশের নূরস নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সাঈদ নুরসি। পিতা সুফি মির্জা সাহেব ছিলেন একজন অত্যন্ত আল্লাহভীরু দ্বীনদার ব্যক্তি ও পরিচ্ছন্ন জীবনে অভ্যস্ত।
বাবা-মায়ের চতুর্থ সন্তান সাঈদ নুরসিদের পরিবারটি ছিল কুর্দি গোত্রভুক্ত। মূলত ‘বদিউজ্জামান’ হলো তাঁর উপাধি। ছোটবেলা থেকেই সাঈদ নুরসি ছিলেন স্বাধীনচেতা। ১৮৮২ সালে তাগ গ্রামে মুহাম্মদ এফেন্দির মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন সাঈদ নুরসি। অসাধারণ মেধা ও প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। এরপর ১৮৮৮ সালে শাইখ আমিন এফেন্দির মাদরাসা এবং পরে আরো বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে শাইখ মুহাম্মাদ জালালির কাছ থেকে শিক্ষাসনদ লাভ করেন।
তুরস্কের বিতলিসে অবস্থিত শাইখ মুহাম্মদ জালালির তত্ত্বাবধানে তিনি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা অধ্যয়ন করেন। শাইখ জালালির নিকট থেকে শিক্ষাসনদ লাভ করার পূর্বেই তিনি পারিপার্শ্বিক নানাবিধ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং এমনভাবে অধ্যয়ন করেন যে, এগুলো থেকে কোনো প্রশ্ন করে তাঁকে আটকানো যেত না। খুব অল্প সময়েই তাঁর এই অসাধারণ মেধার খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি যতবারই জ্ঞানের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, ততবারই সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। ফলে লোকমুখে তিনি ‘বদিউজ্জামান’ হিসেবে পরিচিতি পান। সেই সময় উস্তাদ জালালির তত্ত্বাবধানে সাঈদ নুরসি প্রতিদিন কোনো ব্যাখ্যা ও টিকার সাহায্য ছাড়াই দুর্বোধ্য গ্রন্থসমূহ থেকে ২০০ পৃষ্ঠা পড়তেন।
অল্প বয়সেই ধর্মতত্ত্ব নিয়ে জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। এ কারণে সুফি দর্শনে প্রভাবিত হলেও সুফি তরিকায় পুরোপুরি যোগ দেননি। কোনো বিষয় মুখস্থ করতে তাঁর বেশি সময়ের প্রয়োজন হতো না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে সাঈদ ধর্মতত্ত্বের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। এ সংক্রান্ত যেকোনো বিতর্কে তাঁর যুক্তিগুলো ছিল অখণ্ডনীয়, যা সে সময়ের আলেম সমাজকে বেশ অবাক করেছিল। পরবর্তীতে তাঁকে ‘বদিউজ্জামান’ উপাধি প্রদান করা হয়। এর অর্থ হলো সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বা জামানার অনন্য পুরুষ। ইংরেজিতে বলা হতো ‘দি মোস্ট ইউনিক অ্যান্ড সুপিরিয়র পারসন অব দ্য টাইম’ (The Most Unique and Superior Person of the Time)।
বদিউজ্জামান যে সময়টায় শিক্ষাজীবন শুরু করেন, তখন উসমানীয় সাম্রাজ্যের মাদরাসাগুলোর ভীষণ দরিদ্রাবস্থা। অধিকাংশ মাদরাসা চলতো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনুদানে অথবা জনগণের জাকাত ও সদকার মাধ্যমে। তবে নুরসি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই জাকাত বা সদকার অর্থ গ্রহণ করতেন না এবং পুরো জীবন এই আদর্শে অটল ছিলেন।
১৯২১ সালের আগ পর্যন্ত নুরসির যে জীবন, তখন তিনি কিছুটা হলেও বিশ্বরাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বিশ্লেষকরা এই সময়টাকে ‘নুরসির প্রথম অধ্যায়’ নামে অভিহিত করেছেন। আর ১৯২১ সালের পরের থেকে জীবনের বাকি অংশটিকে তাঁরা ‘নুরসির দ্বিতীয় অধ্যায়’ নামে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়টিতেই বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি অন্যসব বৈষয়িক বিষয়াদি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে কুরআনের সাধনায় ব্যস্ত করতে শুরু করেন। এই সময়েই তিনি তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘রিসালায়ে নুর’ গ্রন্থটিও রচনা করেন।
ইয়ং টার্কিশ মুভমেন্ট ও সাঈদ নুরসি
মারদিনে অবস্থানকালে কামালের তাত্ত্বিক লেখাগুলোর সাথে সাঈদ নুরসির পরিচয় ঘটে। মূলত কামাল ছিলেন ‘ইয়ং টার্কিশ মুভমেন্টের’ অন্যতম নেতা। মানুষের অধিকার, মুক্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে লেখা কামালের পুস্তকগুলো তরুণ সাঈদ নুরসির মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৮৯২ সালের দিকে তিনি ইয়ং টার্কিশ মুভমেন্টে যোগ দেন। তখন থেকে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শুরু করেন। ১৮৭৬ সালে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই তথাকথিত প্রগতিশীল মহল ইউরোপীয় সংস্কৃতি আমদানির আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে। এটিকে তারা একটি আন্দোলনে রূপান্তরিত করে নাম দেয়—নিও-অটোম্যানিজম বা নব-উসমানীয়বাদ। সুলতান হামিদ নিজেও নব-উসমানীয়দের একজন ছিলেন। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি সবসময় মুক্ত ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু নব-উসমানীয়দের মধ্য থেকেই যখন ‘ইয়ং টার্কস’ (Young Turks) নামের সর্বনাশা আন্দোলন ৬০০ বছরের উসমানীয় সাম্রাজ্যের কণ্ঠরোধ করতে আরম্ভ করে, তখনই সাঈদ নুরসি প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন।
অসাধারণ মেধাবী সাঈদ নুরসি
তৎকালীন সময়ের অটোম্যান আলেমরা শিশু-কিশোরদের জন্য যে সিলেবাস বা কারিকুলাম নির্ধারণ করেছিলেন, নুরসি মাত্র তিন মাসের মধ্যে তার পুরোটাই আত্মস্থ করে ফেলেন। তাঁর প্রতিভা দেখে শিক্ষক মোল্লা ফেতুল্লাহ তাঁকে ‘বদিউজ্জামান’ বা ‘যুগের বিস্ময়’ নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। তাঁর মেধা ও মুখস্থবিদ্যার কদর করতেন পূর্ব তুরস্কের প্রায় সব আলেমই। সেই সময় পর্যন্ত ইসলামিক বিজ্ঞানের ওপর যে ৯০টি রচনাবলি ছিল, বদিউজ্জামান নুরসি তার সবটাই বেশ কম সময়ের মধ্যে মুখস্থ করে ফেলেন। অথচ সাধারণভাবে তৎকালীন যেকোনো ছাত্র এই একই কোর্সটি সুসম্পন্ন করতে গড়ে ১৫ বছর সময় নিতেন। শিক্ষাসনদ লাভের পর সাঈদ নুরসি তাঁর বড় ভাই মোল্লা আব্দুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার জন্য সিরভান নামক স্থানে যান। তাঁদের প্রথম সাক্ষাতের কথাবার্তা ছিল এ রকম— আব্দুল্লাহ: তুমি এখান থেকে যাওয়ার পর আমি শরহে শামসি শেষ করেছি। এই সময়ে তুমি কী পড়েছ? নুরসি: আমি প্রায় ৮০টি বই পড়েছি। আব্দুল্লাহ: কী বলছ! নুরসি: এগুলো ছাড়াও আরও অনেক বই পড়েছি। অল্প সময়ে এত অধ্যয়নের ঘটনা আব্দুল্লাহর কাছে অসম্ভব মনে হলো, তাই তিনি বইগুলো থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলেন। অবশেষে ছোট ভাই সাঈদ নুরসির ব্যাপারে তাঁর এই কৌতূহলী অনুসন্ধান বিস্ময়ে পরিণত হলো। নুরসি ঠিকঠাক উত্তর দিলেন। জ্ঞানার্জনের স্পৃহা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে নুরসি বললেন, “অন্তরের রোগ বা প্রবৃত্তিকে বিনাশ করতেই নিয়মিত অধ্যয়ন চালিয়ে গিয়েছি।”
বিজ্ঞানের উপরে জ্ঞান অর্জন
নিজ এলাকার পড়াশোনা শেষ করার পর সাঈদ নুরসি চলে যান ভ্যান নামক পূর্ব তুরস্কের একটি প্রদেশে। সেই সময়েই নুরসি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারেন যে, বর্তমান সভ্যতার ক্রীড়নকেরা আধুনিক বিজ্ঞানের নানা দিক আবিষ্কার করেছেন, সেগুলো আসলে মুসলমানদের ভালোভাবে জানতে হবে। কেননা বিজ্ঞানের উৎকর্ষকে ভিত্তি করে যদি ইসলামের বার্তা মানুষের কাছে না পৌঁছানো যায়, অর্থাৎ ইসলামকে যদি বিজ্ঞানময় হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা না যায়, তাহলে দাওয়াতি কাজে খুব একটা সফল হওয়া যাবে না। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বিজ্ঞানের নানা শাখা ও অগ্রগতিকে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। এবারও বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গণিতশাস্ত্র, প্রাণিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, মহাকাশ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল এবং দর্শনের ওপর বেশ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি ভ্যান প্রদেশে জীবনের যে ১৫টি বছর পার করেন, তার পুরো সময়টাই স্থানীয় উপজাতি ও গ্রামবাসীদের শিক্ষক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। তিনি সেই এলাকায় একটি মাদরাসা চালু করেন, স্থানীয়ভাবে যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হরহর’। এই ১৫ বছর সময়ের মধ্যেই সাঈদ নুরসি যুক্তিবিদ্যা বিশারদ ইসমাইল গেলেনবেভির ‘বুরহান’ নামক বইটির ওপর একটি নিরীক্ষাধর্মী বিশ্লেষণও রচনা করেন। ইউরোপীয় আধুনিক বিজ্ঞান এবং ইসলামের প্রথাগত বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধন করার উদ্দেশ্যে উস্তাদ নুরসি উভয় ধারার বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নুরসি তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘রিসালায়ে নুর’ লেখার কাজে হাত দেন। এই বইটিতে ইসলামের বৈজ্ঞানিক চেতনাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে যে উদ্দেশ্যে তিনি ‘মাদরাসাতুজ জাহারা’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তার অনেকটাই এই রিসালায়ে নুরের মাধ্যমেই পূরণ হয়ে যায়। ইস্তাম্বুলে নুরসি আরও বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করেন। সেই সময়গুলোতে তিনি আসলে রাজনৈতিক ময়দানে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার মধ্য দিয়ে ইসলামের খেদমত করতে চেয়েছিলেন। ইস্তাম্বুল থেকে আবার ভ্যানে ফিরে আসার পর তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ইসলাম সম্বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেন। তিনি গ্রামবাসীকে সেই সময়ে যে বিষয়গুলো সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন, সেগুলোকে পরবর্তীতে এক জায়গায় করে ‘আল মুনাজারাত’ নামক একটি বইও রচনা করেন। এরপর নুরসি চলে যান দামেস্কে। সেখানে তিনি উমাইয়া মসজিদে বেশ কিছু খুতবা প্রদান করেন। সেই খুতবাগুলো পরবর্তীতে ‘দ্য দামেস্কাস সারমন’ নামক একটি বইতে সন্নিবেশিত হয়েছে।
স্বপ্নে রাসূল (সা.)-কে দেখলেন সাঈদ নুরসি
সাঈদ নুরসির জীবনে সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনা হলো তাঁর শিক্ষাজীবনের কোনো এক শীতকালের ঘটনা; যখন তিনি ঘন বরফাচ্ছন্ন নুরস গ্রামে অবস্থান করছিলেন। একরাতে স্বপ্ন দেখলেন, কিয়ামত সংঘটিত হয়েছে এবং কর্মফলের ফয়সালা হচ্ছে। সাঈদ ভাবলেন—যেহেতু কর্মফলের ফয়সালা হচ্ছে, তাহলে এখানে তো প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) অবশ্যই থাকবেন। নুরসি পুলসিরাতের নিকট অবস্থান নিলেন। কারণ, তিনি ভাবলেন—রাসূলুল্লাহ (সা.) তো অবশ্যই এখান দিয়ে যাবেন। নুরসি চিন্তা করলেন, রাসূল (সা.)-এর দেখা পেলে তিনি তাঁর হাত মোবারক চুম্বন করে সম্মান প্রদর্শন করবেন। অবশেষে অপেক্ষমাণ নুরসি রাসূল (সা.)-এর দেখা পেলেন এবং তাঁর হাত মোবারক চুম্বন করে ইলমের জন্য দুআ চাইলেন। রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, “তোমাকে কুরআনের ইলম দেওয়া হবে এই শর্তে, তুমি আমার উত্তরসূরি আলিমদের পাল্টা কোনো প্রশ্ন করবে না।” এই ঘটনা ও স্বপ্ন সাঈদ নুরসিকে বিমোহিত করে। প্রথমত, রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা এবং আল-কুরআনের জ্ঞান লাভের সুসংবাদ। অন্যদিকে বিতর্কের সময় আলিমদের পাল্টা প্রশ্ন করার ব্যাপারে রাসূল (সা.)-এর সতর্কবাণী। এই সতর্কতার কারণে নুরসি কোনো সময়, কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো আলিমকে পাল্টা প্রশ্ন করেননি।
ভ্যান প্রদেশের গভর্নরের বাসভবনে বসবাস ও জেহরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
ভ্যান প্রদেশের গভর্নরের আমন্ত্রণে তাঁর বাসভবনে বসবাস করতে শুরু করেন সাঈদ নুরসি। এ সময় সেখানকার আর্কাইভ ও লাইব্রেরির বইপত্রগুলো অধ্যয়ন করতে থাকেন। বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত—এসব বিষয়ের ওপর জ্ঞান অর্জন করার সাথে সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সরকারি ভাষার ওপরও দক্ষতা লাভ করেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই নুরসি তুরস্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে পেরেছিলেন। একটি ইসলামি সাম্রাজ্য, যারা প্রায় ছয়শো বছর ধরে মুসলিম জাতির নেতৃত্বে ছিল, সেই দেশে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের অনীহা তাঁকে বেশ চিন্তিত করে তোলে। শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপ আকস্মিকভাবে অনেকটা এগিয়ে যায়। এদিকে সময়োপযোগী সংস্কারের অভাবে পিছিয়ে পড়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য তথা তুরস্ক। ফলে তুর্কি জনমনে ইউরোপের প্রতি প্রবল আগ্রহের জন্ম হয় এবং তারা ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনযাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। থিওলজি তথা ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে এসে সাঈদ নুরসি পরিবর্তিত সময়ের সাথে সময়োপযোগী চিন্তার পরিচিত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে, শুধুমাত্র সনাতন শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে মুসলিম জাতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
নুরসি জাতির এই সমস্যা বুঝতে পেরে যথাযথ সমাধানের পথ বের করেন। তিনি অনুধাবন করেন, এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি যুগোপযোগী আধুনিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুবিধাও থাকবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি ‘মাদরাসাতুজ জাহারা’ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালান। কারণ তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। নুরসি মাদরাসাতুজ জাহারার মডেল সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের নিকট তুলে ধরেন, আর এ কারণে তিনি তৎকালের তথাকথিত সেকুলার গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। কারণ তারা নুরসিকে সেকুলার তুরস্ক গড়ার পথে প্রতিবন্ধকতা মনে করত। এর যথেষ্ট কারণও ছিল; কেননা সেসময় তুরস্কের ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির ইসলামকে পুনর্জীবিত করার প্রচেষ্টা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাই পূর্ব তুরস্কে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার চিন্তা করতে থাকেন, যেখানে ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থাও থাকবে। পরবর্তীতে তাঁর সেই চিন্তানুযায়ী ১৯১৩ সালে ভ্যান প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। জেহরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা ঐ অঞ্চলে ইসলাম সম্পর্কে খুবই উচ্চতর দর্শনের সূত্রপাত ঘটায়।
১৯০৯ সালে উসমানীয় সরকার তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ আনে ও বিচারের মুখোমুখি করে। কারণ তিনি তখন Committee of Union and Progress (CUP)-এর সাথে মিলে উদারবাদী সংস্কার আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং মুক্তি পান। উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষদিকে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্যে আন্দোলন শুরু করেন তিনি এবং সুলতান আবদুল হামিদকে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, সনাতনী মাদরাসা শিক্ষার সাথে সুফিজম ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় করে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা।
ইসলামের দাওয়াত প্রচারে নুরসির অভিনব পন্থা
ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকার যে বাড়িতে নুরসি সেই সময়ে থাকতেন, তার দরজায় তিনি একটি পোস্টার লাগিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল: ‘এখানে সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়, সব প্রশ্নের উত্তরও এখানেই মেলে—যদিও এখানে কেউ কোনো প্রশ্ন করে না।’ ধীরে ধীরে ইস্তাম্বুলের আলেমদের সাথেও নুরসির পরিচয় হয়। তাঁরা নুরসির কাছে নানা ধরনের জিজ্ঞাসা নিয়ে আসতেন, নুরসিও তার বেশ সুন্দর উত্তর দিতেন। ফলে নুরসির ব্যাপারে তাঁরা সকলেই সন্তুষ্ট ছিলেন এবং চারিদিকে তাঁর বেশ সুনামও ছড়িয়ে পড়ে। আসলে নুরসি তাঁর ঘরের দরজায় পোস্টারটি লাগিয়েছিলেন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আর তাঁর সেই কৌশল বেশ কাজেও দিয়েছিল। কিন্তু যে সরকারি মহলের সহযোগিতা পাওয়ার আশায় তিনি ইস্তাম্বুলে এসেছিলেন, তা তিনি পাননি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও রাশিয়ায় বন্দিজীবন
সাঈদ নুরসি যখন মাদরাসাতুজ জাহারা নিয়ে চিন্তা করছিলেন, তখন তুরস্কে ধেয়ে আসছিল আরেক বিপদ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি সুলতান জার্মানির পক্ষ হয়ে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলে শাইখুল ইসলামের কার্যালয় থেকে এই যুদ্ধকে জিহাদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জিহাদের ব্যাপারে যে ক’জন ফতোয়া প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সাঈদ নুরসি অন্যতম। নুরসি ফতোয়া দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে যদিও তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিরোধী ছিলেন, তবে পরবর্তীতে খিলাফতের বিপন্ন অবস্থা দেখে নিজেই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। জ্ঞান অর্জনে তিনি যেমন তুখোড় ছাত্র ছিলেন, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিলেন প্রচণ্ড সাহসী সৈনিক। তিনি ছিলেন একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার; আর ব্যাটালিয়নের অধিকাংশ সদস্যই ছিল তাঁর ছাত্র। তুরস্কের পূর্বাঞ্চলকে রাশিয়ান দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত রাখার জন্য তিনি সেই যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।
যুদ্ধের দিনগুলোতে যখন চারিদিকে গোলাগুলির বিকট শব্দ, তখনও ট্রেনে বসে তিনি শ্রুতিলিখন এবং অনুলিখনের মাধ্যমে ‘সাইনস অব মিরাকুলাস ইনিমিটেবিলিটি’ বা ‘ইশারাতুল ইজাজ’ নামক একটি বই রচনা করেন, যা পবিত্র কুরআনের পর্যালোচনা ও ভাষ্য হিসেবে আজও সর্বজনস্বীকৃত হয়ে আছে। তুরস্কের পূর্বদিকে পাসিনলার ফ্রন্টে রাশিয়ান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাহিনী নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধের একপর্যায়ে বন্দি হয়ে রাশিয়ান কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্বাসিত হন। দুই বছর পর সেখান থেকে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
১৯১৮ সালে ইস্তাম্বুলে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। সে সময় ইস্তাম্বুলের বুদ্ধিজীবী সংগঠন ‘দারুল হিকমাহ আল ইসলামিয়া’র সদস্য হিসেবে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বর্তমান তুরস্কের মূল ভূখণ্ড ছাড়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমস্ত অঞ্চল মিত্রশক্তি ভাগাভাগি করে নেয়। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। এরপর গ্রিসের আক্রমণের শিকার হয় মূল ভূখণ্ডও। কামাল পাশার কৃতিত্বে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। এরপরই কামাল পাশা ১৯২৪ সালের ১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফতের অবসান ঘটান। খিলাফত পতনের পর কামাল পাশা সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মবিরোধী কার্যক্রম শুরু করেন। সেই সাথে নুরসির জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। একদিকে কামাল পাশার ধর্মকে মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির ইসলামকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।
১৯২২ সালের ৯ নভেম্বর গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে (Grand National Assembly) বদিউজ্জামান নুরসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানানো হয়। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলেও সাঈদ নুরসি ইসলামের প্রতি অনেক সাংসদের উদাসীন মনোভাব দেখে হতাশ হন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, পার্লামেন্টে যেসব ডেপুটি কাজ করছেন, তাঁদের অধিকাংশই ধর্ম সম্বন্ধে খুবই অসচেতন এবং ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে তাঁদের তেমন একটা আগ্রহও নেই। এমনকি তাঁদের অধিকাংশই নিয়মিত নামাজও আদায় করেন না। এই পরিস্থিতি দেখে নুরসি তাঁদের সামনে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য দেন, যাতে তিনি নামাজের গুরুত্ব ও ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এরপর দেখা যায় যে, পার্লামেন্টের অনেক ডেপুটি নামাজ পড়তে শুরু করেছেন। কিন্তু নুরসির এই কার্যক্রম এবং পার্লামেন্ট ডেপুটিদের ওপর তাঁর এই প্রভাব সেকুলার নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে অসন্তুষ্ট করে তোলে। নুরসিকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে আতাতুর্ক তাঁকে প্রথমে পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার এবং গোটা পূর্ব তুরস্কের ধর্মীয় প্রকল্পগুলোর প্রধান হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু নুরসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরই তিনি মূলত আধ্যাত্মিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন।
রাশিয়ার জেনারেলের কাছে নুরসির সাহসিকতা এবং মৃত্যুদণ্ড রদ
রাশিয়ার সেনারা যখন বিতলিস অঞ্চলটি দখল করে নেয়, তখন তারা নুরসিকে আহত অবস্থায় আটক করে সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে একটি কারাগারে নুরসি আড়াই বছর বন্দি ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়টাতে তিনি কাজ করার মতো বা কিছু লেখার মতো অবস্থায় ছিলেন না, পরিবেশও ছিল না তেমন। কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও নুরসি তাঁর সহযাত্রী অন্যান্য বন্দিদের মাঝে নিয়মিতভাবে ধর্মীয় আলোচনা করতেন।
একদিন রুশ জেনারেল নিকোলাস বন্দিশিবির পরিদর্শনে এলে সকল বন্দি দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু বদিউজ্জামান নুরসি না দাঁড়িয়ে বসে থাকলেন। রুশ জেনারেল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “বোধ হয় তুমি আমাকে চিনতে ভুল করেছ?” নুরসি বসেই উত্তর দিলেন, “তোমাকে চিনব না কেন! তুমি নিকোলাস।” রুশ জেনারেল ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “যদি তুমি জেনে-বুঝে আমাকে সম্মান প্রদর্শন না করে থাকো, তাহলে তুমি রাশিয়ার ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছ।”
ইসলামি আন্দোলনের বিপ্লবী নায়ক বদিউজ্জামান নুরসির নির্ভীক কণ্ঠের এমন সাহসী উচ্চারণের কথা শুনে বন্দিশিবিরের অন্যান্য বন্দিরা পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গেল। রাগে, ক্ষোভে ও অপমানে রুশ জেনারেল নিকোলাসের চেহারা লাল বর্ণ হয়ে উঠল। প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল তাঁর চোখে। এই পরিস্থিতিতে বন্দিশিবিরের অন্যান্য বন্দিরা ভাবল, এখনই বোধ হয় নুরসিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করার জন্য নেওয়া হবে। কিন্তু উস্তাদ নুরসির চোখে-মুখে ছিল না কোনো ভীতির চিহ্ন। তিনি চিন্তাহীন চিত্তে দুনিয়া ও আরশের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন।
রুশ জেনারেল নিকোলাস রাগান্বিত হয়ে নুরসিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে প্রস্থান করলেন। মৃত্যুদণ্ডের আদেশেও নুরসির মুখের স্নিগ্ধ হাসির সামান্যতম কমতি ছিল না। তিনি দৃপ্ত পায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বেদির দিকে এগিয়ে চললেন। রুশ জেনারেল আশ্চর্য হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাঁর সৌম্য-শান্ত সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু পরে তাঁকে হত্যা করা হবে—এটি জানার পরও নুরসির মুখে ফুটে ছিল স্বর্গীয় হাসি। তারপর উস্তাদ নুরসি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। অন্যদিনের চেয়ে তিনি তুলনামূলক দ্রুততার সাথে নামাজ আদায় করলেন। রুশ জেনারেল অবাক হয়ে নামাজের ভেতরে উস্তাদ নুরসির একাগ্রতা লক্ষ করছিলেন। নামাজ আদায়ের এই দৃশ্য রুশ জেনারেল নিকোলাসের মনে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে।
অবশেষে নিকোলাস সাঈদ নুরসির মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে দিলেন। আর সাইয়্যেদ বদিউজ্জামান নুরসিকে বললেন, “যে ইসলাম তোমাকে এতটা নির্ভীক ও আত্মমর্যাদাশীল করেছে, আমি সেই ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।” শেষ দিকে অবশ্য নুরসি কারাগার থেকে মুক্ত হন এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ, ওয়ারশ ও ভিয়েনা পাড়ি দিয়ে তিনি ১৯১৮ সালের ২৫ জুন আবারও ইস্তাম্বুলে এসে পৌঁছান। এর পরপরই সেখানকার প্রশাসন তাঁকে ‘দারুল হিকমাহ আল ইসলামিয়া’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়।
কামাল আতাতুর্কের সাথে সাঈদ নুরসির আদর্শিক সংঘাত
১৯২৪ সালের ১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত বিলুপ্তির পরের বছরই কামাল পাশার নীতিনির্ধারকেরা জুব্বা ও ইসলামি টুপি পরিধান নিষিদ্ধ করেন। সেসময় টুপি-জুব্বা পরার কারণে অনেক মুসলমানকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হতো, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হয়। ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদরাসাকে ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত করা হয়। এর বাস্তব উদাহরণ ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়া মসজিদ, যেটিকে জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছিল। ১৯২৮ সালে সকল প্রকার ধর্মীয় বই ছাপানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ১৯৩৩ সালে কামাল পাশা তুরস্কের সকল মসজিদে আরবি ভাষায় আজান ও কুরআন তিলাওয়াত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
উক্ত সময়েই তুরস্কে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। আধুনিকতা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির নামে ইসলামের সাথে প্রকাশ্যে শত্রুতা ও চরম বিরোধিতা শুরু হয়। উন্নতি ও অগ্রগতির দোহাই দিয়ে তুর্কিদের মেরুমজ্জায় ঢোকানো হয়েছিল সাংঘাতিক বিষ। শুরু হয়েছিল আল্লাহর দ্বীন ও শরিয়াহকে নিভিয়ে ফেলার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। আর এসবের উদ্দেশ্য ছিল একটি; তা হলো—ইসলামের সঙ্গে তুর্কি জাতির সম্পর্ক চিরতরে মূল উৎপাটন করা এবং তুর্কিদের হৃদয়ের ঈমানের নূরকে চিরতরে নিভিয়ে ফেলে নাস্তিকতার আঁধারে নিমজ্জিত করা।
কামাল পাশার একের পর এক ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডে তুর্কি জনমনে প্রচণ্ড ঘৃণার জন্ম নিলেও প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি। এমন সময় নুরসি তাঁর ‘রিসালায়ে নুর’ এর কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যিনি কখনোই নিজ দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। কারণ তিনি মনে করতেন, এতে করে মুসলিমরা এক ভাই আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে জড়াবে। তাই তিনি রিসালায়ে নুরের মাধ্যমে কুরআনের প্রকৃত মাহাত্ম্য তুলে ধরার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
অতঃপর সাঈদ নুরসির বিরুদ্ধে শুরু হয় কারানির্যাতন ও নির্বাসন। এই কারাগার থেকে সেই কারাগার। এখান থেকে সেখানে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী আছে যে, বিপ্লবীরা নির্ভয়ে তাঁদের বিপ্লব চালিয়ে গিয়েছেন, কারো হুমকিতে দমিত হননি। যেখানে যে পরিস্থিতিতে ছিলেন, সেখানে নিরালায় বিপ্লবের বীজ বপন করেছিলেন। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁকে যেখানেই শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়েছিল, সেখানেই ফুটিয়েছিলেন প্রশান্তির ফুল। কারাবাস ও নির্বাসনের ২৭ বছরে রচনা করেছিলেন বিখ্যাত অমর গ্রন্থ ‘রিসালায়ে নুর’। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি সত্যের যে চারাগাছ রোপণ করে গিয়েছিলেন, তা আজ ফুলে-ফলে সুশোভিত। লাখ লাখ পথভ্রষ্ট মানুষ সেই ফুলের ঘ্রাণে ব্যাকুল হয়ে ফিরে এসেছে আল-কুরআনের ছায়ায়।
যুদ্ধের সময় নুরসি ‘The Six Steps’ (হুতুওয়াত-ই সিত্তাহ) শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। নুরসির এই লেখায় তুর্কি সৈনিকদের মনোবল চাঙ্গা হয়। স্বীকৃতিস্বরূপ কামাল আতাতুর্ক তাঁকে আঙ্কারায় আমন্ত্রণ জানান ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। কিন্তু নুরসির ধর্মীয় প্রভাবে নয়া তুর্কি প্রজাতন্ত্রে কামালবাদী সেকুলার আদর্শ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। মুসলিম জনগণের ধর্মীয় চেতনাকে জোর করে মুছে দিয়ে সেক্যুলারিজম চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী ছিলেন সাঈদ নুরসি। মূলত তখন থেকেই কামাল আতাতুর্কের সাথে সাঈদ নুরসির আদর্শিক সংঘাত শুরু হয়। সরকার সর্বক্ষেত্রে ইসলাম ও আল-কুরআনকে নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষিতে তিনি ঘোষণা করেন, “আমি পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করব আল-কুরআন নিঃশেষ হয়ে যাবার মতো কিছু নয়। এটি হলো এক শাশ্বত জীবনব্যবস্থা; এক অফুরান আলোর উৎস।” সাঈদ নুরসি অবশ্য তারপর থেকে নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন।
বদিউজ্জামান নুরসির নির্বাসন জীবন ও ‘রিসালায়ে নুর’ রচনা শুরু
১৯২৪ সালের পর থেকে তুরস্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় বই ছাপানো দণ্ডনীয় অপরাধ ছিল, তাই রিসালায়ে নুরের পাণ্ডুলিপি হাতে লিখেই প্রচার করা হতো। এতে অংশ নেন রিসালায়ে নুরের হাজার হাজার ছাত্র। কেউ লেখার কাজ করতেন, কেউ ছিলেন প্রচারের দায়িত্বে। ওদিকে সরকারও বসে ছিল না। রিসালায়ে নুরের ছাত্রদের ওপর নানা রকম অত্যাচার শুরু হয়। বারবার আদালাতে হাজির করা হয় নুরসিকে। কখনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অপরাধে, কখনো বা সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে। অথচ আদালত কখনোই নুরসি বা রিসালায়ে নুরকে রাষ্ট্র বা সংবিধানবিরোধী প্রমাণ করতে পারেনি। তবুও নুরসিকে জীবনের অধিকাংশ সময় নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। থাকতে হয়েছে পুলিশের নজরবন্দি হয়ে।
১৯২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শেখ সাঈদ নামে এক নকশবন্দি শেখের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হলো। এটি ‘শেখ সাঈদ বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। মূলত কুর্দিদের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের জন্যে অনেক আগে থেকেই একটা গুঞ্জন ছিল; তবে তা খুব বেশি বড় ছিল না। বিদ্রোহী নেতা শেখ সাঈদ বদিউজ্জামান নুরসির সমর্থন লাভের ব্যর্থ চেষ্টা করেন; বরং নুরসি এ বিদ্রোহের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে তুরস্ক সরকার এই ছোট্ট ঘটনাকে ইস্যু করে ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ একটা আইন পাস করে। আগে থেকেই নুরসিকে আটক করার সুযোগ খুঁজছিল নয়া স্বৈরসরকার। এই আইনের মাধ্যমে ডাইরেক্টরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে অনেকের সাথে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসিকেও কারাবন্দি করে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়।
১৯২৬ সালের দিকে ইস্পার্তায় নির্বাসনে পাঠানো হয় বদিউজ্জামান নুরসিকে। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানকার মানুষগুলো তাঁর ভক্ত হয়ে যেত এবং তাঁর ছাত্রে পরিণত হতো। এ কারণে তাঁকে আরও দুর্গম এলাকা ‘বারলায়’ নির্বাসন দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে তাঁর ছাত্রসংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এই বারলাতেই বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘রিসালায়ে নুর’ রচনার দুই-তৃতীয়াংশ কাজ সম্পন্ন করেন।
তুরস্ক জুড়ে রিসালায়ে নুরের ব্যাপক প্রভাব এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা
রিসালায়ে নুরের তাফসিরটির রচনা সম্পূর্ণ হলে তাঁর ছাত্ররা নিজ হাতে এর অসংখ্য কপি তৈরি করেন। এমনকি তাফসিরটি আরবি ছাড়াও স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তারপর ‘নুরস পোস্টাল সিস্টেম’-এর মাধ্যমে পুরো তুরস্কে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তুরস্ক জুড়ে রিসালায়ে নুরের ব্যাপক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এতে কর্তৃত্ববাদী সেকুলার স্বৈরসরকার বুঝতে পারে যে, বদিউজ্জামানের আন্দোলনকে তারা থামিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য তাঁর ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে শুধু বাকস্বাধীনতা নয়, চলাফেরার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
রিসালায়ে নুর গ্রন্থের যুক্তিগুলো জনে জনে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইতোমধ্যে সাঈদ নুরসি শুধু একজন আলেম হিসেবেই নন, সংস্কারক হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। সরকারের নানা চাপের ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ১৯৩৫ সালের এপ্রিল মাসে আবারো অসংখ্য ছাত্রসহ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একইসাথে রিসালায়ে নুরকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর যত কপি পাওয়া গেছে সবগুলো জব্দ করা হয়। এসবের ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং সুযোগ পেলেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটত। বদিউজ্জামান নুরসিকে যেখানেই নেওয়া হতো, সেখানেই জনতার ভিড় জমে যেত।
সেক্যুলারিজমের মূলনীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে পুনরায় কারাবাস
সাঈদ নুরসি ও তাঁর গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৬৩ ধারা অর্থাৎ সেক্যুলারিজমের মূলনীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। তারপর তাঁদেরকে এসকিশেহির (Eskişehir) কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারাগারে বদিউজ্জামান নুরসিকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাখা হয়, যাতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এছাড়া জেলকোড অনুযায়ী কারাগারে তাঁদের প্রাপ্য ন্যূনতম সুবিধাও প্রদান করা হতো না। শারীরিক নির্যাতনে তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজন মারাও যান।
পরবর্তীতে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও শুধু পোশাক সংক্রান্ত জিজ্ঞাসাবাদে আল-কুরআনের আয়াত ব্যবহারের অজুহাতে বদিউজ্জামান নুরসিকে ১১ মাস এবং তাঁর ছাত্রদেরকে ৬ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। তিনি আদালতের সামনে দৃঢ়ভাবে তাঁর ওপর আরোপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করেন। এতে বিচারকগণ সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে কারাদণ্ডের রায় প্রদান করতে বাধ্য হন। এত অত্যাচার ও অপবাদের পরও বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি আপোস করেননি। সর্বস্ব দিয়ে রিসালায়ে নুরের কার্যক্রম চালু রেখেছিলেন। তিনি সবসময়ই একটা কথা বলতেন, “সময় এখন ঈমান রক্ষার, মতবাদ রক্ষার নয়।”
কারামুক্তির পরও গৃহবন্দি জীবন এবং হত্যার চেষ্টা
কারামুক্তির পরও বদিউজ্জামান নুরসি ও তাঁর ছাত্রদের ওপর নজরদারি রাখা হয়। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে রিসালায়ে নুর তাফসিরটি অধ্যয়ন এবং প্রচারের অভিযোগে অসংখ্য সাধারণ মানুষ গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। কাস্তামনু শহরে বদিউজ্জামান নুরসির বাসায় নজরদারি ও বারবার তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে মানুষকে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু এতেও রিসালায়ে নুরের জনপ্রিয়তা ও তাঁর ভক্তদের দমন করা যায়নি। তাই তাঁকে আবারো গ্রেফতার করে দেনিজলি (Denizli) কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসকিশেহির কারাগারের চেয়ে এই কারাগার ছিল আরও ভয়ানক। এখানে খাবারে বিষ মিশিয়ে সাঈদ নুরসিকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় প্রশাসন। তবে বিষক্রিয়ায় তিনি শারীরিকভাবে আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েন।
রিসালায়ে নুর খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন
১৯৪৪ সালের ২২ এপ্রিল রিসালায়ে নুর খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি আঙ্কারা ফৌজদারি আদালতে সর্বসম্মত রিপোর্ট পেশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, রিসালায়ে নুরের বিষয়বস্তুর ৯০ শতাংশই হলো ঈমানের সত্যতা এবং এর বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা সম্পর্কিত গবেষণামূলক ব্যাখ্যা। এই গ্রন্থটিতে গবেষণা ও ধর্মীয় মূলনীতি থেকে কোনো ধরনের বিচ্যুতি নেই। ধর্মকে স্বার্থ হাসিলের জন্যে ব্যবহার এবং কোনো সমিতি বা দল গঠনের অথবা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করার মতো আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো আলামত এ গ্রন্থে পাওয়া যায়নি।
১৯৪৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে সকল বন্দিকে মুক্তি প্রদান করা হয়। সাথে সাথে বেড়ে যায় রিসালায়ে নুরের প্রচার ও প্রসার। তুর্কি জনগণের কাছে গ্রন্থটি নতুন করে আবেদন সৃষ্টি করে। দেশব্যাপী সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনেকের ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে রিসালায়ে নুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
‘Fifth Ray’ বা ‘পঞ্চম আলোকরশ্মি’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে হাদিসের ব্যাখ্যায় শেষ জামানায় দাজ্জালের আগমন সম্পর্কিত আলোচনায় নুরসি দাজ্জাল বলতে কামাল আতাতুর্ককে বুঝিয়েছেন—এমন অভিযোগে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করে আফিয়ান (Afyon) কারাগারে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু আফিয়ান কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত ২০ মাসের কারাদণ্ড উচ্চ আদালত খারিজ করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দেয়। কিন্তু বিচারকাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হয় এবং পুরো ২০ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর বদিউজ্জামানকে মুক্তি দেওয়া হয়। ফলে বিনা বিচারে তিনি ২০ মাসের দণ্ড ভোগ করতে বাধ্য হন। অবশ্য কারাবাসের মধ্যেও তাঁর অধ্যয়ন চলতে থাকে এবং সেখানেও তাঁর ছাত্র তৈরি হয়ে যায়।
১৯৫০ সালের নির্বাচনে কামালবাদী শাসনের পতন
জীবনের শুরুর দিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও এবং উসমানীয় খেলাফতের পতনোন্মুখ সময়ে খেলাফত রক্ষার্থে সরাসরি রণাঙ্গনে লড়াই করলেও কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠা পাবার পর যখন তিনি আধ্যাত্মিক মিশন শুরু করেন, তখন আর রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্তি রাখেননি। আতাতুর্ক সরকার তুরস্কের মানুষের ঈমানি যে চেতনাকে বিস্মৃত করে দিয়েছিল, তিনি চেয়েছিলেন সেই চেতনাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে এবং মাত্র দুই দশকের মেহনতে তিনি বিস্ময়করভাবে তা পেরেছিলেনও। নুরসির কর্মধারা রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখলেও তাঁর এই মিশনের বদৌলতে মানুষের মধ্যে যে বোধ ও বিশ্বাসের পুনর্জাগরণ হয়েছিল, এর প্রভাবেই পঞ্চাশের দশকে তুরস্কের নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল সেকুলার গোষ্ঠীকে। এ কারণে তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক প্রতিষ্ঠিত সেকুলার শাসনের পতনের নেপথ্য নায়ক বিবেচনা করা হয় সাঈদ নুরসিকে।
১৯৫০ সালের সাধারণ নির্বাচনে কামালবাদী শাসনের পতন হলে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৫৬ সালের জুন মাসে রিসালায়ে নুরের ওপর আদালত চূড়ান্তভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন দেন। ১৯৫০ সালের নির্বাচনেও তিনি কট্টরপন্থী সেক্যুলারিজমের (কামালবাদ) বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছিলেন। কারণ, ডেমোক্র্যাটরা ধর্ম ও মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে ছিল অনেকটা উদার। এ ব্যাপারে তাঁর ছাত্ররা প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দেন, “ডেমোক্র্যাট পার্টি পরাজিত হলে কট্টর সেকুলার এবং জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতা দখল করবে। ফলে সামাজিক ও জাতীয় জীবনে এক বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। সুতরাং তারা যাতে ক্ষমতা দখল করতে না পারে, তাই আমি আদনান মেন্দারিসকে অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের দেশ, ইসলাম ও কুরআন রক্ষার স্বার্থে সমর্থন দিয়েছি।”
বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনের সময় থেকেই বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে পুনরায় ডেমোক্র্যাটরা জয়লাভ করে। কামালবাদী সেকুলার দল আরপিপি নিজেদের বিপর্যয়ের জন্যে সাঈদ নুরসির আন্দোলনকে দায়ী করতে থাকে। ফলে কামালবাদী দলের সাথে নুরসি আন্দোলনের সমর্থক ও পাঠকদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু বদিউজ্জামান নুরসি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন।
ততদিনে তুরস্কে ধর্মচর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা অনেকটা শিথিল করা হয়। তুরস্কের গণমানুষের কাছে বদিউজ্জামান নুরসি অসম্ভব জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর এবং পরবর্তী বছরের জানুয়ারি মাসে ৮৩ বছরের বয়োবৃদ্ধ নুরসি পর্যায়ক্রমে একাধিকবার আঙ্কারা, ইস্তাম্বুল ও কোনিয়া সফর করেন। রিসালায়ে নুর আন্দোলনের সর্বশেষ অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং রিসালায়ে নুর সেন্টার পরিদর্শন করতেই তিনি এসব সফর করেছিলেন।
সাঈদ নুরসির ইন্তেকাল
সারাটি জীবন কুরআনের চর্চায় লিপ্ত থাকার পর ১৯৬০ সালের ২৩ মার্চ (২৫ রমজান) উস্তাদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পুরো উরফার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। পরের দিন ২৪ মার্চ উলু মসজিদে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। তারপর তাঁকে হালিলুর রহমান নামক মসজিদসংলগ্ন গোরস্তানে দাফন করা হয়। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির কবরস্তানে প্রতিদিন প্রচুর লোক জমায়েত হতো।
এর ঠিক দুই মাস পর তুরস্কে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যার পরপরই তুরস্কে নতুন করে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। আবারো ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করা হয়। জান্তা সরকার সাঈদ নুরসির কবর স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। একদল পথভ্রষ্ট সেনাকর্মকর্তা ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই আবারও উস্তাদ নুরসির কবরকে আক্রমণ করে। তারা এই মহান কুরআন সাধকের মৃতদেহ সেই গোরস্তান থেকে উঠিয়ে নেয় এবং অজানা একটি জায়গায় নিয়ে যায়—যার পরবর্তী গন্তব্য সম্বন্ধে নিশ্চিতভাবে আর কিছু জানা যায়নি। কারো কারো মতে, নুরসির লাশ উরফা থেকে এগিরদিরে (Eğirdir) স্থানান্তর করা হয়। এখন পর্যন্ত এগিরদিরের পাহাড়ঘেরা অজ্ঞাত স্থানে শায়িত আছেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মানুষটি।
মৃত্যুর আগ দিয়ে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছাত্র এবং রিসালায়ে নুর রচনার নেপথ্যের অন্যতম সহযোগী সাইয়্যেদ আহমেদ হুসরেভ এফেন্দিকে তাঁর পরবর্তী দায়িত্বশীল হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যান। তাঁর একমাত্র দায়িত্ব হবে নুরসির মৃত্যুর পর রিসালায়ে নুরের এই প্রকল্পটিকে পূর্বের গতিতেই অব্যাহত রাখা। নুরসি যতদিন জীবিত ছিলেন, তখনই হুসরেভ এফেন্দি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে ‘উস্তাদ আল সানি’ বা দ্বিতীয় গুরু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হুসরেভ এফেন্দি ছিলেন খুবই দক্ষ একজন ক্যালিগ্রাফি শিল্পী। নুরসি জীবিত থাকা অবস্থায় হুসরেভ এফেন্দি রিসালায়ে নুর অনুলিপিকরণ এবং বিতরণের মূল দায়িত্বে ছিলেন। সকল ছাত্রের মধ্যে নুরসি একমাত্র তাঁকেই রিসালায়ে নুরে কোনো ধরনের সংযোজন, সংশোধন বা বিয়োজনের অধিকার দিয়েছিলেন।
আর তিনি সেই দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। বিশেষ করে নুরসি যতদিন জেলে ছিলেন, তিনি তখন রিসালায়ে নুর নামক প্রকল্পটি যোগ্যতার সাথেই অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন। উস্তাদ নুরসির ইন্তেকালের পর হুসরেভ এফেন্দি আগের মতোই তাঁর কাজ অব্যাহত রাখেন। তিনি রিসালায়ে নুরের মূল চেতনা রক্ষার ব্যাপারে একটুও আপস করেননি। বরং রিসালায়ে নুরকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে এবং গোটা তুরস্কের মানুষের ঈমান ও আমলকে সুরক্ষা ও তা আরও মজবুত করার ব্যাপারে তিনি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
‘রিসালায়ে নুর’ বা নুর জামাত
সাংগঠনিক কোনো কাঠামো নেই এই মিশনের। নেই নেতৃত্ব কিংবা কর্তৃত্বের কোনো ঝামেলা। তুর্কি দরবেশ আলেম বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি (রাহি.)-এর চিন্তা ও গবেষণাকে গভীর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে আত্মস্থ করে এর আলোকে নিজের ব্যক্তিজীবনকে পরিশুদ্ধ করাই মিশনে সম্পৃক্ত লোকজনের প্রধানতম লক্ষ্য।
ব্রিটিশ কলোনি সচিব গ্ল্যাডস্টোন তুর্কিদের পদানত করার ব্যাপারে বলেছিলেন, “মুসলমানদের হাতে যদি কুরআন থাকে তবে তাদের পদানত করা যাবে না। তাদের ওপর বিজয়ী হতে হলে হয় কুরআন তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে, অথবা কুরআনের প্রতি তাদের ভালোবাসার বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে।” এ কথার প্রতিউত্তরে নুরসি বলেছিলেন, “কুরআন অমর ও অনস্তমিত সূর্য, যা কখনো মুসলমান তথা কল্যাণকামী মানুষ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না।”
এরপরই তিনি কুরআনভিত্তিক আধুনিক, মানবিক ও মরমি ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হন এবং ছয় হাজার পৃষ্ঠার বিশাল গবেষণার ভাণ্ডার গড়ে তোলেন, যা ‘রিসালায়ে নুর’ নামে পরিচিত। ‘রিসালায়ে নুর’ তাঁকে তুর্কিদের কাছে তো বটেই, পুরো পৃথিবীতে অমর করে দিয়েছে। বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি রচিত ও আট খণ্ডে সমাপ্ত বিশাল কলেবরের গবেষণাগ্রন্থ ‘রিসালায়ে নুর’ অধ্যয়ন, চর্চা এবং এর ওপর আলোচনা করা এ মিশনের মূল কাজ। আধ্যাত্মিক সাধনা এ মিশনের মূল কাজ হলেও পীর-মুরিদি কিংবা সুফিজমের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্তি নেই। সাঈদ নুরসি ‘রিসালায়ে নুরে’ আধ্যাত্মিকতা ও ইসলামের সর্বাঙ্গীণ চিন্তার যে পাঠ দিয়ে গেছেন, এর আলোকেই তাঁরা আত্মশুদ্ধির চর্চা করে থাকেন।
মিশনের সাংগঠনিক কাঠামো বা সুনির্দিষ্ট কোনো নেতৃত্ব যেমন নেই, তেমনি এর নির্ধারিত কোনো নামও নেই। ‘নুরসি-অনুসারী’ বা ‘নুর জামাত’ নামে পরিচিত হলেও এটি অফিশিয়াল কোনো নাম না। তাঁর আবিষ্কৃত বিশ্বাসভিত্তিক আন্দোলন তুরস্কে ইসলামের পুনর্জাগরণের সূত্রপাত করে। তাঁর অনুসারীদের দৃষ্টিতে তিনি ‘যুগের বিস্ময়’ (Wonder of the Age) নামে পরিচিত। তাঁর অনুসারীদের জামাতকে ‘নুরজু’ বা ‘নুর জামাত’ নামে ডাকা হয়।
কিন্তু সাঈদ নুরসি তাঁর তিন দশকের মেহনতে পুরো তুরস্ক জুড়ে রেখে যান রিসালায়ে নুরের লাখ লাখ একনিষ্ঠ পাঠক। রেখে যান বেশুমার অনুসারী। তাঁর ইন্তেকালের পর এরাই আঁকড়ে ধরেন তাঁর মিশনকে, এবং ‘নুর জামাত’ নামে তাঁরা পুরো বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। নুরসির অনুসারী এবং রিসালায়ে নুরের পাঠকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলত কলেজ-ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষার্থী। নুরসি চেয়েছিলেন আধুনিক শিক্ষিতদের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পরিচর্যা করতে, তাই কলেজ-ইউনিভার্সিটিগুলোতেই এ মিশনের লোকজন জোরদার কার্যক্রম চালান। কেন্দ্রভিত্তিক কাজ করেন তাঁরা। কেন্দ্রগুলো সাধারণত মেসের আদলে হয়। কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা রিসালায়ে নুরের চর্চা করেন, তাঁরা আবাসিকভাবে কেন্দ্রগুলোতে থাকেন। দিনের বেলা ভার্সিটিতে ক্লাস করেন, বাকি সময় কেন্দ্রে অবস্থান করে রিসালায়ে নুর পঠন-পাঠন ও আধ্যাত্মিক মেহনতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। এসকল কেন্দ্রের অফিশিয়াল কোনো নাম নেই, নেই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আদলও। তবে সাধারণত ‘মাদরাসায়ে নুর’ নামে ডাকা হয়।
নুর জামাতের কার্যক্রমের জন্য যাঁরা নিজেদের উৎসর্গ করেন এবং দিনরাত কেবল এ মেহনত নিয়েই থাকেন, তাঁদেরকে ‘ওয়াকেফ’ বলা হয়। ওয়াকেফ হওয়ার জন্য শর্ত হলো দুনিয়াবি সকল ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে হবে, এমনকি সংসারী বা বিবাহিতও হতে পারবেন না। তবে হ্যাঁ, বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই এবং দুনিয়াবি বা অন্য কোনো ব্যস্ততায় জড়িয়ে থেকেও এ কাজ করা যায়, তবে তখন তিনি আর ‘ওয়াকেফ’ থাকবেন না। নুর জামাতের এ হলো আলাদা বৈশিষ্ট্য।
‘রিসালায়ে নুর’ রচনার প্রেক্ষাপট
তিরিশের দশকে তুরস্ক থেকে যখন কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলা হয়, মানুষকে ধর্মচর্চা থেকে জোর করে বিমুখ করে বিস্মৃত করা হয় তাদের ঈমানি চেতনা—ধর্মীয় সংকটের নিদারুণ সেই ক্রান্তিকালে উস্তাদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি মানুষের ভেতর ঈমানি চেতনা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে এ মিশনের সূচনা করেন। সিলসিলাগত আধ্যাত্মিকতার প্রাচীন ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ও অভিনব পদ্ধতিতে মানুষের আত্মশুদ্ধির এক মেহনতের সূচনা করেন। রচনা করেন ‘রিসালায়ে নুর’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থখানি। যেখানে মানুষের জীবন-জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন তিনি নতুন এক পদ্ধতিতে। ঈমানের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন গবেষণার ধাঁচে।
আধুনিক তুরস্কের সেকুলার ভাবাপন্ন মানুষ বিপুলভাবে আকৃষ্ট হন তাঁর এ পদ্ধতির প্রতি। বিপুলভাবে পঠিত ও চর্চিত হতে থাকে রিসালায়ে নুর গ্রন্থখানিও। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে তুরস্কের মানুষজন যখন ব্যাপকভাবে নুরসির ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইসলামের দিকে ফিরতে শুরু করে, তুরস্কের সেকুলার সরকার তখন নুরসির এ কর্মধারাকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। নুরসির প্রতি মানুষের এ আকর্ষণ থামিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে প্রথমে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু নির্বাসিত এলাকার মানুষজনও যখন নুরসির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তখন সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিনষ্ট হওয়ার অজুহাতে নুরসিকে গ্রেপ্তার করে। নিষিদ্ধ করা হয় রিসালায়ে নুর গ্রন্থটিকেও। সরকারের এ বৈরী আচরণে নুরসির প্রচারণা আরও বৃদ্ধি পায় এবং মানুষজন আরও বেশি করে আকৃষ্ট হতে শুরু করে তাঁর প্রতি। আরও ব্যাপকভাবে পঠিত হয় রিসালায়ে নুর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশে রিসালায়ে নুরের কার্যক্রম
তুরস্কসহ বর্তমানে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, ইরান, আফ্রিকার মৌরিতানিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নুর জামাতের কার্যক্রম চলমান। তুরস্কের ইস্তাম্বুলেই মাদরাসায়ে নুর নামে পরিচালিত তাঁদের কেন্দ্রের সংখ্যা এক হাজারের ওপরে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তুরস্কের অন্যান্য প্রদেশ ও শহরে এর সংখ্যা আরও বেশি। সৌদি আরবের ১০টি শহরে আছে মাদরাসায়ে নুরের কার্যক্রম। মাদরাসায়ে নুরের মূল কার্যক্রম হচ্ছে রিসালায়ে নুর অধ্যয়ন এবং চর্চা।
প্রতিটি কেন্দ্রেই পাঞ্জেগানা নামাজের ব্যবস্থা থাকে। কেন্দ্রে অবস্থানকারীরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এখানেই আদায় করেন। নামাজের পর তাসবিহ ও দোয়ার বিশেষ আমল থাকে। আমল শেষ হলে রিসালায়ে নুর থেকে অল্প খানিক তালিম হয়। এছাড়া প্রতিদিন একঘণ্টা সম্মিলিতভাবে রিসালায়ে নুরের চর্চা হয়। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে কিতাবটি অধ্যয়ন ও গবেষণায় নিরত থাকেন কেন্দ্রের বাসিন্দারা। কেন্দ্রের জিম্মাদার থাকেন অভিজ্ঞ ও পুরোনো কোনো ওয়াকেফ। জিম্মাদার ওয়াকেফ ছাড়া আরও একাধিক ওয়াকেফ থাকেন প্রতিটি কেন্দ্রে।
বাংলাদেশেও প্রায় বছর দশেক হলো নুরসি জামাতের কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে রাজধানীর আজিমপুরে অরফানেজ রোডে একটি ভাড়া বাসায় পরিচালিত হচ্ছে নুরসি জামাত এবং মাদরাসায়ে নুরের কার্যক্রম। বাংলাদেশে তাঁদের কার্যক্রমের বছর দশেক পার হলেও মনে হলো এখনও পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা। তিন-চারজন তুর্কি ওয়াকেফ নিয়মিত থাকেন আজিমপুরের কেন্দ্রে। বাংলাদেশি বেশ কিছু তরুণ তাঁদের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন বর্তমানে ওয়াকেফ হিসেবে আছেন। এছাড়া সেমিনার-সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠান এবং রিসালায়ে নুর থেকে চয়ন করে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পুস্তক প্রকাশ করে সাঈদ নুরসির আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা বিস্তারে কাজ করছেন তাঁরা। বাংলাদেশের অনেক ওলামায়ে কেরামের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হলে তাঁদেরকে অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ করেন। যেসব ওয়াকেফের সঙ্গে দেখা হলো সেখানে, তাঁদের প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত।
রিসালায়ে নুর কী?
“রিসালায়ে নুর” আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো আলো বা হেদায়েতের নিবন্ধসমূহ বা আলোর পঙ্ক্তিমালা বা পথনির্দেশক আলো। এর প্রকৃত নাম হচ্ছে ‘Risale-i Nur Külliyatı’। আর ইংরেজিতে হচ্ছে ‘Treatise of Light’। রিসালায়ে নুর হলো একটি তাফসির (কুরআনের ব্যাখ্যা) যা দুটি প্রধান ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে—একটি হলো কালাম (বিশ্বাসের জ্ঞান), এবং অপরটি সুফিবাদ (অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক মাত্রা)। রিসালায়ে নুর মূলত ‘মানেভি’ (আধ্যাত্মিক) তাফসির। কেউ কেউ এটিকে মানেভি জিহাদ বা কলমের যুদ্ধও বলেছেন।
তাই বলা হয়ে থাকে “রিসালায়ে নুর” তাফসির হলেও প্রচলিত তাফসির গ্রন্থের মতো ‘word by word’ (শব্দে শব্দে) বা ‘verse by verse’ (আয়াতে আয়াতে) ভিত্তিক তাফসির নয়; বরং এটি থিমেটিক অ্যাপ্রোচে লিখিত একটি বিষয়ভিত্তিক তাফসির। তবে মজার বিষয় হলো, রিসালায়ে নুরের লেখক সাঈদ বদিউজ্জামান স্বয়ং এর প্রবন্ধগুলোকে সময়ের মুজাদ্দিদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রিসালায়ে নুরে মূলত ঈমানের মূল বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে (Belief by Investigation)। রিসালায়ে নুরকে নুরসি কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন:
- প্রথম ভাগ: সোজলার (Words – মৃত্যুর পুনরুত্থান বিষয়ক আলোচনা)
- দ্বিতীয় ভাগ: মাকতুবাত (Letters – ছাত্রদের কাছে লেখা বিভিন্ন চিঠি)
- তৃতীয় ভাগ: লেমালার (Flashes – আলোকসম্পাত) ও শুয়ালার (Rays – রশ্মি)
হামিদ আলগার রিসালা সম্পর্কে বলেছেন, “…a reflection of the Qur’anic luminosity through the prisms of Said’s expression” (সাঈদের বর্ণনার প্রিজমের মধ্য দিয়ে কুরআনের আলোকরশ্মির একটি প্রতিফলন)। এটি ইসলাম কীভাবে অনুশীলন করতে হবে তা নিয়ে বেশি আলোচনা করে এবং সৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করে। প্রায় ৬০০০-এর অধিক পৃষ্ঠা সংবলিত ১৪ খণ্ডের একটি রচনা সংকলনের নাম “রিসালায়ে নুর”। এটি লেখা হয়েছে আরবি এবং উসমানীয় তুর্কি ভাষায়। এতে ১৩০-এর অধিক প্রবন্ধ (রিসালা) রয়েছে। এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৫২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে রিসালায়ে নুর। অন্যতম দুটি ইংরেজি অনুবাদ সংকলনের একটি হচ্ছে আলী উনাল (Ali Ünal) এবং অন্যটি হচ্ছে শুকরান ভাহিদে (Şükran Vahide)-এর করা অনুবাদ। তবে ইংরেজি সংকলনে এর সবটুকু অনূদিত হয়নি। কিছু কিছু অংশ বাদ রেখে মূল বিষয়গুলো অনূদিত হয়েছে।
রিসালায়ে নুর হচ্ছে সেই এনলাইটেনমেন্ট, যা দিয়ে ইউরোপের সেকুলার সমাজব্যবস্থাকে সাঈদ নুরসি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন আল-কুরআন দিয়ে। অটোম্যান সাম্রাজ্যের মধ্যেও একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ছিল যারা পশ্চিমা দর্শন ও সভ্যতা গ্রহণের পক্ষে ছিল। বদিউজ্জামানের সমস্ত প্রচেষ্টা ছিল বিজ্ঞান এবং অগ্রগতির সাথে সংগতি রেখে এগিয়ে গিয়ে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিথ্যা অপবাদের জবাব দেওয়া। আর তিনি সফলভাবে সেটাই করেছেন তাঁর অমর গ্রন্থ রিসালায়ে নুর রচনার মধ্য দিয়ে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সেক্রেটারি ফর কলোনিজ গ্ল্যাডস্টোন যখন ঘোষণা দিলেন, “So long as the Muslims have the Quran, we shall be unable to dominate them. We must either take it from them, or make them lose their love of it.” জবাবে সাঈদ নুরসি বলেন, “I shall prove and demonstrate to the world that the Quran is an undying, inextinguishable sun.” অর্থ: আমি প্রমাণ করব, দুনিয়াকে দেখিয়ে দেব যে কুরআন শাশ্বত ও চিরন্তন এবং এমন এক সূর্য যাকে চাইলেই নিভিয়ে ফেলা যায় না।
তিনি বিশ্বাস করতেন, কুরআনই প্রকৃত অগ্রগতি এবং সভ্যতার উৎস। আর তিনি জাতিকে পাশ্চাত্যের নোংরা সংস্কৃতি থেকে বাঁচাতে গিয়ে ‘রিসালায়ে নুর’ লিখে তাঁর পুরো জীবন ব্যয় করেছেন। যখন তুর্কি সরকার ধর্মীয় বই পড়া নিষিদ্ধ করেছিল, তখন সাঈদ নুরসি জেলখানায় বসে কোনো প্রকার রেফারেন্স বুক ছাড়া আল-কুরআনের বিষয়ভিত্তিক এই বিস্ময়কর গ্রন্থ রিসালায়ে নুর রচনা করেন।
সাঈদ নুরসির লেখা রিসালায়ে নুর ছিল একটি গাইডবুক, যা পড়ার মাধ্যমে মানুষ তার ঈমানকে তাজা করতে পারবে এবং আল্লাহকে চিনতে পারবে। পাশাপাশি রিসালায়ে নুর হচ্ছে ইবাদতের মেথডলজিমূলক একটি বই, যে বই পড়লে অন্যান্য সময়ের সাধারণ ইবাদতে যে তৃপ্তি বা প্রশান্তি পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি আত্মার প্রশান্তি আসে রিসালায়ে নুর অনুসরণ করে ইবাদত করার মাধ্যমে। রিসালায়ে নুর হচ্ছে কুরআনের জীবনভিত্তিক, বিষয়ভিত্তিক এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আকারে লেখা। এটি পড়লে মানুষ স্রষ্টা ও সৃষ্টির রহস্য তথা ইসমে আজম জানতে পারবে এবং এটি পড়ার মাধ্যমে নিজের ঈমান রক্ষা করতে পারবে আধুনিক জাহেলিয়াত থেকে।
‘রিসালায়ে নুর’ চিন্তাশীল প্রতিটি মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর রচনা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানকালের বিরল রচনা ‘রিসালায়ে নুর’ বিশ্বব্যাপী চিন্তার জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা সম্যক উপলব্ধি করা যায় সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে রিসালায়ে নুরের বিস্ময়কর সাফল্য থেকে। যেমন, বিগত দিনগুলোতে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের বিপুলসংখ্যক বিধর্মী রিসালায়ে নুর অধ্যয়ন করে এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এমনিভাবে রিসালায়ে নুর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পর থেকে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের কোথাও না কোথাও পথহারা মানুষ প্রতিদিন অন্ধকার জীবন থেকে বেরিয়ে এসে ঈমানের আলোয় অবগাহন করছে। রিসালায়ে নুরের এই বিস্ময়কর ঈমানি প্রভাব বিংশ শতাব্দীর দাওয়াতি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেই সাথে বিশ্ব মুসলিমের প্রকৃত ঈমানি চেতনা সৃষ্টিতে রিসালায়ে নুরের জাদুকরী প্রভাব—এর রচয়িতা হিসেবে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
সাঈদ নুরসিকে তুরস্কের ইসলামের পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর জীবনের অনন্যসাধারণ কাজটি হলো রিসালায়ে নুর। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে যেভাবে সাঈদ নুরসি তাঁর রিসালায়ে নুরে পর্যালোচনা করেছেন, তা অন্য কোনো বইতে আমরা সেভাবে আর পাই না। এই গ্রন্থে আমাদের চারপাশের প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। রিসালায়ে নুর হলো সেই অসাধারণ সৃষ্টি, যা বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসিকে আজও চির অম্লান করে রেখেছে।
রিসালায়ে নুরের প্রবন্ধসমূহ মূলত ১৯১০ থেকে শুরু করে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত। রিসালায়ে নুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্রন্থ যা লেখকের নিজ হাতে সরাসরি রচিত নয়; এটি পুরোটাই শ্রুতিলিখন। তিনি বলতেন এবং তাঁর ছাত্ররা তা শুনে শুনে লিখতেন। পরে লিখিত কপি সাঈদ নুরসি নিজ হাতে সম্পাদনা করতেন। বলা বাহুল্য যে, রিসালায়ে নুরের কপির সংখ্যা ইদানীং ৬ লক্ষ অতিক্রম করেছে এবং ১৯৫৭ সালে এর প্রিন্টেড কপি বাজারে আসে। রিসালায়ে নুর তাফসির হলেও প্রচলিত সাধারণ তাফসির গ্রন্থগুলোর মতো শব্দ থেকে শব্দ ধরে কিংবা আয়াত থেকে আয়াত ধরে তাফসির করা হয়নি; এটি একটি বিষয়ভিত্তিক তাফসির।
‘রিসালায়ে নুর’ নামটি কেন?
“রিসালায়ে নুর” নামটি বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির নিজস্ব চয়ন। কেন তিনি এ নামটি চয়ন করেছেন তার অনেক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এসব কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—নুর গ্রামে ছিল তাঁর জন্ম, মরহুম মায়ের নাম ছিল নুরিয়া, তাঁর প্রিয় শাইখের নাম ছিল নুরি, ছাত্রদের মধ্যে যাঁরা তাঁকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন তাঁদের কয়েকজনের নাম ছিল নুর ইত্যাদি।
রিসালায়ে নুর থেকে আপনি কী পাবেন?
রিসালায়ে নুর কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়; বরং এটি ইসলামের শরিয়তের নির্দেশিত ইবাদতের একটি পদ্ধতি বা মেথডোলজি নিরূপণ করেছে। আর রিসালায়ে নুরের বিষয়বস্তু কোনোদিনই সেকেলে হবে না, এটি এতটাই প্রাসঙ্গিক যে বর্তমান সামাজিক ও বৈশ্বিক কাঠামোতেও বইটি একই রকম জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে। রিসালায়ে নুরকে আবার গতানুগতিক তাত্ত্বিক কোনো বই হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না, বরং এটি ভীষণ রকমের ব্যবহারিক একটি বই। রিসালায়ে নুর গ্রন্থটিতে অনেকগুলো ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ প্রশ্নের উত্তরও মিলবে। বইটিতে মহাবিশ্বের গঠন ও পরিচালনা নিয়েও ইসলামের ব্যাখ্যাগুলোকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষ করে অসীমতা (Infinity) বা কন্টিঞ্জেন্সি (Contingency) বিষয়ে বিজ্ঞান যেসব বিতর্ক উত্থাপন করেছে, তারও উত্তর এই বইটিতে পাওয়া যাবে। কুরআনের বিভিন্ন কালামকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে রিসালায়ে নুর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একক নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতাকে প্রমাণ করেছে। শেষ বিচারের দিন এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থান নিয়ে যাঁরা সন্দেহ পোষণ করেন, তাঁরাও তাঁদের কৌতূহল মেটাতে পারবেন এই বইটি থেকে। যাঁরা নবী মুহাম্মদ (সা.) সত্যিকারভাবেই আল্লাহর রাসূল কি না তা নিয়ে সংশয় দেখান, তাঁরাও খুব স্পষ্ট উত্তর এই বইটি থেকে পেয়ে যাবেন।
একইসঙ্গে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পৃথিবীর সৃষ্টি, বিবর্তনবাদ প্রভৃতি বিষয়ে ইসলামের অবস্থান ও মূল্যায়নও বইটিতে পাওয়া যাবে। একইসঙ্গে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তরও মিলবে রিসালায়ে নুরে। বিশেষত সাধারণ প্রচলিত জ্ঞানের বাইরে ঐশ্বরিক জ্ঞান কীভাবে একজন মানুষকে পরিণত করে, কিংবা বৈষয়িক জীবনদর্শন বা অল্পে তুষ্ট হয়ে জীবন ধারণ করার ব্যাপারে অথবা আল্লাহর নিয়ামতকে ব্যবহার করার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা যায়, তার কিছু উপায় এই বইটিতে পাওয়া যাবে। বয়স হয়ে গেলে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভোগেন, হতাশ হয়ে পড়েন; কিন্তু এই বইটিতে প্রবীণদের নিয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, বয়স্ক হওয়াও আল্লাহ তায়ালার একটি নিয়ামত এবং তাই সেই বয়সে পৌঁছে হতাশা নয় বরং তৃপ্তি নিয়ে বেঁচে থাকা দরকার।
পাশাপাশি, মুসলমানরা কেন সভ্যতার বিনির্মাণে এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ল, ইসলামে নারীদের কী অবস্থান বা সম্মান নির্ধারণ করা হয়েছে, কিংবা হুদুদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী, দাসপ্রথা নিয়ে ইসলামের বক্তব্য কী—সেগুলোও জানা যাবে এই রিসালায়ে নুর থেকে। আমরা কীভাবে অন্য ধর্মের মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করব কিংবা কীভাবে তাদের সাথে সহাবস্থান করব, সেই প্রক্রিয়া সম্বন্ধেও এই বইটি থেকে আমরা ধারণা পাব।
এককথায় বলতে গেলে, উস্তাদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি রচিত এই ‘রিসালায়ে নুর’ বা ‘ট্রিটিজ অব লাইট’টি প্রকৃতার্থেই আলোকময় একটি বই, যা আলোর দিশারি হয়ে মুসলমানদেরকে আলোর পথে নির্দেশনা দেবে বহুযুগ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা, যিনি এই বইটি লিখেছেন, যাঁরা এর অনুলিপি রচনা করেছেন কিংবা যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগতভাবে বইটিকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তিনি যেন তাঁদের সবাইকে তাঁদের পরিশ্রমের এবং আত্মত্যাগের উত্তম জাজা দান করেন। আমিন।
দ্য কুরআন ইন কনগ্রুয়াস অ্যালাইনমেন্ট ও তুরস্কে হায়রাত ফাউন্ডেশনের জন্ম
উস্তাদ নুরসির দিকনির্দেশনা মোতাবেক হুসরেভ এফেন্দি কুরআনের একটি তাফসির কপিও প্রস্তুত করেন। কুরআনের এই নতুন ধারার তাফসিরের নাম দেওয়া হয় ‘তেভাফুকলু কুরআনে কারিম’ (Tevafuklu Kur’an-ı Kerim) বা ‘দ্য কুরআন ইন কনগ্রুয়াস অ্যালাইনমেন্ট’ (The Quran in Congruous Alignment)।
উল্লেখ্য, কুরআন পড়তে পড়তেই উস্তাদ নুরসি একটা সময় আবিষ্কার করেন যে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর সকল নাম, সিফাতি নামগুলো (যেমন—আল্লাহ, রব) এবং কুরআনের অন্যান্য সব শব্দ একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। হয় একই পৃষ্ঠায় একটি শব্দের সাথে সম্পর্কিত অন্য শব্দগুলোকে পাওয়া যায়, নয়তো অন্য কোনো পৃষ্ঠায়। কুরআনের শব্দগুলোর এহেন মিল ও সাদৃশ্যকে উস্তাদ নুরসি কুরআনের আরেকটি মুজিজা হিসেবে শনাক্ত করেন।
যা-ই হোক, উস্তাদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির ইন্তেকালের পর হুসরেভ এফেন্দির হাত ধরেই পরবর্তীতে তুরস্কে হায়রাত ফাউন্ডেশনের জন্ম হয়; যারা আজ অবধি উস্তাদ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির কার্যক্রম ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করছে এবং বিশ্বজুড়ে নুরসির আবিষ্কার ও চেতনাকে—বিশেষ করে রিসালায়ে নুরকে—ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে।
এবার আসা যাক রিসালায়ে নুর প্রসঙ্গে। রিসালায়ে নুর মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের ওপর অনন্যসাধারণ একটি গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হয়ে আছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ওপর বিগত ২০০ বছরে যতগুলো পুস্তক রচিত হয়েছে, রিসালায়ে নুর সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এতদিন পশ্চিমের অনেক জায়গাতেই অবশ্য রিসালায়ে নুর তেমন একটা পরিচিত ছিল না। এমনকি অনেক মুসলমানও এ বিষয়ে ততটা অবগত ছিলেন না; তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এখন পাল্টাচ্ছে।
মোট ১৩০টি অধ্যায়ে এই বইটি বিভক্ত এবং মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। ধর্মতত্ত্ব, ধর্মদর্শন এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়, তার অনেকগুলোরই উত্তর পাওয়া যাবে এই বইটিতে। রিসালায়ে নুর রচনা করা হয় ১৯২৬ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে।
রিসালায়ে নুর নিয়মিত অধ্যয়ন করেন এমন পাঠকেরা দাবি করেন যে, রিসালায়ে নুরের অধ্যয়ন তাদের মধ্যকার ঈমানের দৃঢ়তাকে মজবুত করেছে, আধ্যাত্মিক শক্তিকে বলিষ্ঠ করেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকেও শাণিত করেছে। রিসালায়ে নুর অধ্যয়নে বিবেকের কাছে তারা আরও পরিষ্কার হয়েছেন, আল্লাহ তায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইসলামকে আরও গভীরভাবে জানার আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়েছে বলে এই পাঠকেরা জানান।
শেষকথা
ইসলামের ইতিহাসে সাঈদ বদিউজ্জামান নুরসি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি (১৮৭৭–১৯৬০) কুরআন ও ইসলামের নিমিত্তে যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন, তা ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায় হয়ে থাকবে। বদিউজ্জামান এমন একসময় জন্ম নিয়েছিলেন, যখন তুরস্কে মুসলিম খিলাফত পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ধর্মবিরোধী পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসন মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করছিল। তিনি পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন। নিজ দেশের স্বকীয়তার জন্য সংগ্রাম করেছেন।
কোর্ট মার্শাল, জেল-জুলুম, কারাবরণ—সব ধরনের হয়রানি ও নির্যাতন তিনি পরম ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করেছেন। সব পরিস্থিতিতে ইতিবাচক বিকল্প উদ্ভাবন এবং নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যে দিকনির্দেশনা তিনি দিয়ে গিয়েছেন, তা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় একটি অবদান। তাঁর দ্বিতীয় অবদান হচ্ছে ‘রিসালায়ে নুর’। সাঈদ নুরসি রাজনৈতিক বিপ্লবের চাইতে বেশি আধ্যাত্মিক বিপ্লব করেছেন। সুতরাং, রিসালায়ে নুর আন্দোলন হচ্ছে— ‘The first text-centered Islamic movement in modern Turkey’ (আধুনিক তুরস্কে পাঠ্য-কেন্দ্রিক প্রথম ইসলামি আন্দোলন)। বদিউজ্জামান যে আলো দেখাতে পেরেছিলেন, সেই আলো যেন ক্রমান্বয়ে আরও সুস্পষ্ট হচ্ছে এবং সেই আলো একদিন গোটা পৃথিবীটাকে আবার আলোময় করে তুলবে ইনশাআল্লাহ।
তথ্যসূত্র
- ■বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী এবং তুরস্ক — লেখক: মুহাম্মদ কামরুজ্জামান
- ■যুগে যুগে ইসলামি আন্দোলন — লেখক: এ কে এম নাজির
- ■ইসলামি আন্দোলনের তিন পথিকৃৎ — লেখক: এ কে এম নাজির
- ■বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসী জীবন ও দর্পণ — লেখক: ইহসান কাসেম সালেহী
- ■বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি এবং রিসালায়ে নুর — লেখক: মুহাম্মদ ইরফান হাওলাদার
- ■বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসি ও রিসালা-ই নূর — ছাত্রসংবাদ
- ■বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসি ও রিসালা-ই নূর — প্রবন্ধকার: আলী আহমদ মাবরুর, ছাত্রসংবাদ