হাওয়া হয়ে যাচ্ছে পানি। মিঠাপানি। যার ওপর নির্ভরশীল মানুষ, প্রাণিকূল থেকে চাষাবাদ—সব। এই তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে।
সেই প্রতিবেদনের তথ্য মতে, প্রতি বছর ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার মিঠাপানি হারাচ্ছে বিশ্ব। ২৮ কোটি মানুষের বার্ষিক চাহিদা মেটাতে পারে এই পরিমাণ পানি।
মিঠাপানির ক্রমাগত এই হ্রাস ‘কন্টিনেল্টাল ড্রাইং’ বলে পরিচিত। ক্রমবর্ধমান খরা এবং অস্থিতিশীল ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কারণে হচ্ছে এটি।
দ্রুত পানি কমে যাচ্ছে বিশ্বের এমন দশ লেক, নদী ও বাধের তথ্য সংগ্রহ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। এতে ফুটে ওঠেছে পানি উধাও হয়ে যাওয়ার প্রকৃত চিত্র।
পারানা নদী
৪ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম পারানা নদী ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে এবং আর্জেন্টিনাকে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহু বছরের খরায় এই নদীর পানি কমে গেছে। এতে শস্য পরিবহন, ইতাইপু বাঁধে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। বেরিয়ে এসেছে নদীর বিস্তৃত তলদেশ, গঠিত হয়েছে নতুন দ্বীপপুঞ্জ।
লেক পুপি, বলিভিয়া
বলিভিয়ার ৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পুপি লেক বিলুপ্তির এক চরম উদাহরণ। ১৯৮৪ সাল ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে দেখা গেছে, ১ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিসৃত ছিল। এটি এখন অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে।
জলপ্রবাহের দিক পরিবর্তন, খরা এবং উষ্ণায়নের কারণে লেকটি প্রায় শুকিয়ে লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে মৎস্যসম্পদ ও আদিবাসী উরু জনগোষ্ঠীর জীবিকা।
লেক এনগামি, বতসোয়ানা
আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ বতসোয়ানার এনগামি লেকের অবস্থা নির্ভর করে ওকাভাঙ্গো প্রণালী থেকে আসা পানির প্রবাহের ওপর। তীব্র খরা এবং উজানের জলধারা থেকে আসা জলের ওঠানামার কারণে হ্রদটি তার সর্বনিম্ন পর্যায়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গেছে উৎপাদনশীল মৎস্যক্ষেত্র এবং গবাদি পশুর চারণভূমি। ফাটল ধরা অববাহিকায় পরিণত হওয়ার পর সেটি আংশিক পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে এ চিত্র।
লাগুনা দে আকুলেও, চিলি
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির সান্তিয়াগোর কাছে অবস্থিত আকুলেও লেগুন দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং পানির সংকটের কারণে অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে সাম্প্রতিক দশকে। ২০০৭ এবং ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনায় দেখা যায়, একসময়ের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তাকারী জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্রটি প্রায় শুকিয়ে গেছে।
ইরানের উর্মিয়া হ্রদ
উত্তর-পশ্চিম ইরানে অবস্থিত উর্মিয়া হ্রদ একসময় মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত পানির হ্রদ ছিল। ১৯৯০ সালে এই হ্রদের আয়তন ছিল ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। এখন এর আয়তন কমে এখন মাত্র ৫৮১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে যা আগে আয়তনের মাত্র ১০ শতাংশ।
ধারাবাহিক খরা, কৃষিকাজে পানির ব্যবহার, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে উর্মিয়া হ্রদের বিস্তীর্ণ এলাকা উন্মুক্ত লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে।
ইরাকের আল-চিবায়িশ জলাভূমি
দক্ষিণ ইরাকে অবস্থিত আল-চিবায়িশ জলাভূমি বৃহত্তর মেসোপটেমীয় জলাভূমির একটি অংশ। জলাভূমিটি টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী দ্বারা পুষ্ট এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
১৯৯০-এর দশকে তীব্র পানি নিষ্কাশন ও খরার কারণে ব্যাপক শুষ্কতা দেখা দিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়ায় এবং এটি পুনরুদ্ধারে নেওয়া বেশ কিছু প্রচেষ্টার ফলে এর কিছু অংশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
আম্বোভোম্বে, মাদাগাস্কার
দক্ষিণ মাদাগাস্কারের শহর আম্বোভোম্বে দেশটির অন্যতম জলবায়ু-পীড়িত ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। ১৯৮৫ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে দক্ষিণ মাদাগাস্কারে বহু বছরের খরা এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার ফলে একটি গুরুতর পরিবেশগত সংকট দেখা যায়। বালুঝড় ও বৃষ্টির ঘাটতি পানির উৎস ও কৃষিজমির ক্ষতি করেছে। ব্যাহত হয়েছে কৃষি ও পশুপালন।
মালির ফাগুইবিন হ্রদ
সাহারা মরুভূমির পাশে অবস্থিত উত্তর মালির ফাগুইবিন হ্রদটি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
নাইজার নদীতে বন্যা হলে পানিতে পুষ্ট থাকত এই হ্রদ। তবে ১৯৮৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, বন্যার পরিমাণ কমে যাওয়া, খরা এবং পলি জমার কারণে হ্রদটি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর বেশিরভাগ অংশ শুষ্ক এবং ক্রমশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
লেক মিড, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা-অ্যারিজোনা সীমান্তে অবস্থিত লেক মিড ধারণক্ষমতার দিক থেকে দেশটির বৃহত্তম জলাধার।
১৯৩০-এর দশকে কলোরাডো নদীতে হুভার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে গঠিত এই জলাধারটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং মেক্সিকোর কিছু অংশের লাখ লাখ মানুষের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্র তুলনা করলে দেখা যায় জলাধারটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং পানির ব্যাপক চাহিদার কারণে পানির স্তর তীব্রভাবে কমে গেছে। জলাধারটির বিস্তৃত অঞ্চল শুকিয়ে সমভূমিতে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ আরল সাগর, উজবেকিস্তান
উত্তর-পশ্চিম উজবেকিস্তানে অবস্থিত দক্ষিণ আরল সাগর বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবসৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি অংশ।
১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনা করলে হ্রদটির নাটকীয় বিলুপ্তি চোখে পড়ে। কয়েক দশক ধরে সেচের জন্য নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে হ্রদটিতে। হ্রদটির ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়ে গেছে; উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে এর তলদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা।