তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সফরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। হাকানের সফরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সমরাস্ত্র ছাড়াও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে আঙ্কারার আগ্রহে সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পরামর্শক কমিটিও গঠন করেছে বাংলাদেশ সরকার।
তুরস্কের সঙ্গে সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচক দেখছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, তুরস্ক বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তারা আরও জানান, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে তুরস্ক। নতুন বিশ্বের বৃহৎ এই শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্ম ও সংস্কৃতিগত গভীর সাদৃশ্য বিদ্যমান। দেশের স্বার্থেই তাদের সঙ্গে জামায়াতও নিবিড় সম্পর্কে আগ্রহী।
বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের সিলসিলা
হাকানের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দীন। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আমরা তুরস্ককে বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমরাস্ত্র খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করেছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে একটি বড় হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসাসেবা পায়।’ এ ছাড়া দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ বাড়ানোর ওপর তারা গুরুত্ব দিয়েছেন বলেও জানান।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার যান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা মুসলমানকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহান দায়িত্ব পালন করেছে এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে বের করা দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য বলে জানান হাকান।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুরস্কের ভূমিকার প্রশংসা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য তুরস্ক অন্যতম সর্বোচ্চ সাহায্য প্রদানকারী দেশ। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি যেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিশুদের সহায়তায় তারা আরও জোরালো ভূমিকা রাখে।’
জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের ঐতিহাসিক ও আদর্শিক বন্ধন রয়েছে কিনা– প্রশ্নে সেলিম উদ্দীন বলেন, ‘তুর্কি খেলাফতের ঐতিহ্য এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী আমলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে এরদোয়ান যেভাবে প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছিলেন, তা জামায়াত যুগ যুগ ধরে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতি এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা। এটি কখনো ভোলার মতো না, কখনো ভুলব না, আমরা মনে রাখব।’
আর মিয়া গোলাম পরওয়ার তুরস্কের এই ভূমিকাকে ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্ব’ এবং ‘বীরত্বের’ বহিঃপ্রকাশ অভিহিত করে বলেন, ‘অবিচারের বিরুদ্ধে উনারা বীরপুরুষের মতো ভূমিকা পালন করেছেন।’ তখনকার প্রেক্ষাপটে জামায়াত নেতাদের পাশে দাঁড়ানো ‘সব মুসলিম দেশের কর্তব্য ছিল’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মজলুম নেতাদের অন্যায়ভাবে জুডিশিয়াল কিলিং করা হচ্ছে–যাদের বিবেক আছে, অবিচার জুলুমের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের তো এমন ভূমিকাই জরুরি ছিল। যারা পারেনি, তারা কাপুরুষ। কিন্তু এরদোয়ান বীরপুরুষের মতো ভূমিকা পালন করেছেন।’
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলকে ‘বাড়তি সুবিধা’ মনে করছে জামায়াত। তবে এক্ষেত্রেও তারা জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা দলের সদস্য আলী আহমদ মাবরুর।
তিনি জানান, যেকোনো কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশের স্বার্থ’ তাদের কাছে সবার আগে। তুরস্কের সঙ্গে চিন্তাগত ও আদর্শিক সামঞ্জস্য আছে ঠিকই, কিন্তু সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা।
নতুন বিশ্বের বৃহৎ মুসলিম শক্তি
সফরে হাকান ফিদান সরকার, বিরোধী দল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ছাড়াও নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেলিম উদ্দীন, আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানিয়েছেন, হাকান ফিদানের সফরে দুই দেশ ঘোষিত নতুন কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় জামায়াত। কোনো চাপ বা ‘আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী’র চক্রান্তে পড়ে বাংলাদেশ যেন পিছিয়ে না যায়, তারও নিশ্চয়তা চান তারা।
তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাওয়ার বিষয়টিকে বিশেষভাবে স্বাগত জানিয়েছেন জামায়াতের নেতারা। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্ট্রিমকে বলেন, ‘তুরস্ক এখন অর্থনীতির পাশাপাশি সামরিক শক্তিতেও মুসলিম বিশ্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে তারা যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার।’
এই বিষয়ে আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা দলের সদস্য আলী আহমদ মাবরুর বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক এই খাতে বেশ উন্নতি করেছে। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তুরস্ক একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।’
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মেরূকরণে তুরস্কের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্ককে ভারতের একক আধিপত্যের বলয় থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প পথ হিসেবে দেখছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, ‘বিশ্ব রাজনীতিতে একটি মেরূকরণ হচ্ছে। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং আধিপত্যবাদী নীতির বাইরে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠছে, যেখানে তুরস্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।’
হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠকে থাকা সেলিম উদ্দীনের মতে, ‘বাংলাদেশ যেন কোনো আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্তে পড়ে এই সম্পর্ক থেকে পিছিয়ে না যায়। তুরস্ক একটি বন্ধু রাষ্ট্র এবং তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’