সমুদ্র শান্ত। ছোট নৌকাটি ধীরে ধীরে এগুচ্ছে সবুজে ঢাকা এক দ্বীপের দিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে নারকেল গাছের সারি, সাদা বালুর সৈকত আর তার পেছনে ঘন অরণ্য। যেন এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু নৌকাটি যত কাছে যাচ্ছিল, ততই অদ্ভুত কিছু চোখে পড়ছিল।
সৈকতে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে। তাঁদের শরীরে পোশাক নেই বললেই চলে। হাতে লম্বা ধনুক। নৌকা আরেকটু কাছে আসতেই একজন তির তুলল। তারপর আরেকজন। মুহূর্তের মধ্যে আকাশে ছুটে গেল তিরের ঝাঁক।
বার্তাটা স্পষ্ট, ফিরে যাও।
পৃথিবীতে এমন জায়গা এখন খুব বেশি নেই, যেখানে বাইরের মানুষের উপস্থিতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু ভারত মহাসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ সেই বিরল ব্যতিক্রম। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রবেশ করা শুধু নিষিদ্ধই নয়, বিপজ্জনকও।
সময়ের বাইরে আটকে থাকা মানুষ
উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অংশ। আয়তন প্রায় ৬০ বর্গকিলোমিটার। বাইরে থেকে দেখলে অন্য যেকোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপের মতোই মনে হবে। কিন্তু এর বাসিন্দারা একে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন মানবগোষ্ঠীর আবাসে পরিণত করেছে।
সেন্টিনেলিজ নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাস করছে। গবেষকদের ধারণা, তাদের পূর্বপুরুষেরা দশ হাজার বছরেরও আগে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর উত্তরসূরি।
তবে তাঁদের সংখ্যা ঠিক কত, তা কেউ জানে না। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে অনুমান করা হয়েছে, জনসংখ্যা কয়েক ডজন থেকে দেড় শতাধিকের মধ্যে হতে পারে। এর চেয়ে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের উপায় নেই।
কারণ দ্বীপে যাওয়া নিষিদ্ধ। আর সেন্টিনেলিজরাও কাউকে স্বাগত জানায় না।
সেন্টিনেলিজদের ইতিহাস মূলত বহিরাগতদের প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস।
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর ‘দূরে থাকুন’ বার্তা
সেন্টিনেলিজদের ইতিহাস মূলত বহিরাগতদের প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস। উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তা মোরিস ভিদাল পোর্টম্যান দ্বীপে অভিযান চালান। তিনি কয়েকজন সেন্টিনেলিজকে ধরে নিয়ে যান পোর্ট ব্লেয়ারে। সোজা ভাষায় এটি ছিল একটি অপহরণই।
ফলাফল হয় ভয়াবহ। অচেনা পরিবেশে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তারা। দুজন বৃদ্ধ মারা যান। পরে বাকি লোকদের আবার দ্বীপে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর থেকে বাইরের বিশ্বের প্রতি তাদের অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছিল কি না, তা জানা যায় না। তবে পরবর্তী এক শতাব্দীতে যারা যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, তাদের প্রায় সবাই তির-ধনুকের মুখোমুখি হয়েছে।
১৯৭৪ সালে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ দলের সদস্যদের ওপর তির ছোড়া হয়। একজনের উরুতে তির বিদ্ধ হয়েছিল।
২০০৬ সালে দুই ভারতীয় জেলে ভুল করে দ্বীপের কাছে চলে গেলে তারা নিহত হন।
আর ২০১৮ সালে আমেরিকান ধর্মপ্রচারক জন অ্যালেন চাও গোপনে দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কয়েকবার সতর্ক হওয়ার পরও তিনি ফিরে যাননি। শেষ পর্যন্ত তিনিও মারা যান দ্বীপবাসিদের হাতে।
এই ঘটনাগুলো শুনতে নির্মম মনে হতে পারে। কিন্তু সেন্টিনেলিজদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। তাদের কাছে বহিরাগতরা অনুপ্রবেশকারী। আর নিজেদের ভূমি রক্ষা করা তাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার।
উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অংশ। ছবি: উইকিপিডিয়া
কেন তাদের একা থাকতে দেওয়া হয়?
একসময় গবেষকরা মনে করতেন, পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। এখন সেই ধারণা বদলেছে।
কারণ, বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে বাইরের মানুষ।
আমাদের কাছে সাধারণ সর্দি-কাশি তেমন কিছু নয়। কিন্তু যেসব জনগোষ্ঠী হাজার বছরের বিচ্ছিন্নতায় বসবাস করেছে, তাদের শরীরে এসব রোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা নাও থাকতে পারে।
একটি সাধারণ ভাইরাসও পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ভারত সরকার বহু বছর ধরে দ্বীপটির চারপাশে সুরক্ষাবলয় বজায় রেখেছে। দ্বীপের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে প্রবেশ করা আইনত নিষিদ্ধ। নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনী নিয়মিত নজরদারি চালায়।
এখন নীতি একটাই—সেন্টিনেলিজরা যদি যোগাযোগ না চায়, তাহলে তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে।
সুনামির পর যে প্রশ্ন জেগেছিল
২০০৪ সালের ভয়াবহ ভারত মহাসাগরীয় ভূমিকম্প ও সুনামির পর অনেকেই ভাবছিলেন, উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপের মানুষ কি বেঁচে আছে? কারণ সেই দুর্যোগে আন্দামান-নিকোবরের বহু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
কয়েক দিন পর একটি হেলিকপ্টার পরিস্থিতি দেখতে গেলে অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখা যায়। সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সেন্টিনেলিজ যোদ্ধা হেলিকপ্টারের দিকে ধনুক তাক করে তির ছুড়তে উদ্যত হয়।
এর অর্থ ছিল একটাই—তারা জীবিত আছে, এবং এখনও বাইরের কাউকে চায় না।
অনেক গবেষকের মতে, প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থানের কারণে সেন্টিনেলিজরা হয়তো সমুদ্রের অস্বাভাবিক আচরণ বুঝে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পেরেছিল।
আমরা তাঁদের সম্পর্কে কী জানি? খুবই সামান্য।

দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, তারা কাঠের কুঁড়েঘরে বাস করে। মাছ ধরে, কাঁকড়া সংগ্রহ করে এবং বনে শিকার করে।
তাদের ধনুক লম্বা এবং শক্তিশালী। তিরের অগ্রভাগে ধাতু ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, সমুদ্রে ভেসে আসা ধাতব বস্তু সংগ্রহ করে তারা অস্ত্র তৈরি করে।
তারা সরু নৌকা ব্যবহার করে। তবে গভীর সমুদ্রে যায় না। সাধারণত অগভীর পানিতে চলাচল করে।
তাদের ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ভাষাগুলোর একটি। আন্দামানের অন্য জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে কি না, তাও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এমনকি তারা নিজেদের কী নামে পরিচয় দেয়, সেটিও অজানা।
অজানা থাকাই কি ভালো?
বিজ্ঞানীদের কাছে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ এক বিশাল রহস্য। সেখানে কী ধরনের পাখি আছে, কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মায়, দ্বীপের ইতিহাস কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন উপগ্রহ পৃথিবীর প্রতিটি কোণ ছবি তুলছে, যখন মানুষের উপস্থিতি পৌঁছে গেছে সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত, তখনও একটি ছোট দ্বীপ আছে যেখানে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে অজানা রয়ে গেছে।
হয়তো এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয়।
সেন্টিনেলিজদের বার্তাটা তাই আজও অপরিবর্তিত—
“আমাদের একা থাকতে দাও।”
সূত্র: রয়্যাল অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট, সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ব্রিটানিকা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর প্রশাসনের সরকারি নথি