Image description

কখনো গানের সুর, কখনো ধর্মীয় সাধনা, আবার কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনার মধ্যদিয়ে কারাগারে সময় কেটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর। আর সেই দিনগুলোর অন্যতম সঙ্গী ছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও মানিকগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম।

 

জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর নিজ বাসভবনে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপকালে আইভী জানান, কারাগারে প্রায়ই গানের আসর বসত। সেখানে প্রধান শিল্পী ছিলেন মমতাজ বেগম। অবসর সময়ে বন্দিদের মন ভালো রাখতে তিনি গান পরিবেশন করতেন। তবে একটি বিশেষ গান না গাইতে মমতাজকে অনুরোধ করেছিলেন আইভী। গানটির একটি লাইনে ছিল, ‘আমার ভাইয়েরে কইও নাইওর আনতো গিয়া।’ এই লাইন শুনলেই সদ্য প্রয়াত ছোট ভাই আহমদ আলী রেজা রিপনের কথা মনে পড়ে যেত আইভীর। তাই মমতাজকে তিনি বলেছিলেন, কারাগারে থাকাকালে যেন গানটি না গাওয়া হয়।

 

আইভীর ভাষ্য, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, যেদিন জেল থেকে বের হব, সেদিন চাইলে এই গান গাইতে পারেন। তখন বাসায় গিয়ে অন্তত আমার কষ্টটা ভাগাভাগি করতে পারব।’ ঘটনাচক্রে তার মুক্তির দিন বিকেলে কারাগারের গানের আসরে ঠিক সেই গানটিই গেয়েছিলেন মমতাজ। তখনও আইভী জানতেন না যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মুক্তি পেতে যাচ্ছেন।

 

২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আইভীর ছোট ভাই আহমদ আলী রেজা রিপন। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ৯ মে গ্রেপ্তার হন তিনি। রিপনের স্ত্রী চার বছর আগে মারা যান। তাদের তিন সন্তান বর্তমানে আইভীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। মুক্তির পর বিভিন্ন সময়ে ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আইভী। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে বাসায় আগত রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

 

এদিকে কারাগারে থাকাকালে একটি কবিতাও লিখেছিলেন আইভী। যদিও নিজের লেখাকে তিনি খুবই সাধারণ বলে উল্লেখ করেন। তবে সেই কবিতায় সুরারোপ করে গান তৈরি করেছেন মমতাজ বেগম। এ বিষয়ে আইভী বলেন, ‘আমি কি আর কবিতা লিখতে পারি! খুবই বাজে হয়েছে। উনি একজন গুণী শিল্পী, তাই এটাকে গান বানিয়েছেন। কবিতাটা উনার কাছেই আছে, আমি কপি করে আনিনি।’

 

মুক্তির পর কোনো এক সময় গানটি জনসমক্ষে পরিবেশন করবেন বলে জানিয়েছেন মমতাজ। ধর্মীয় অনুশীলনে কাটানো দিন কারাগারে অবস্থানকালে ধর্মীয় অনুশীলনেও বেশি সময় দিয়েছেন বলে জানান আইভী। তিনি বলেন, ‘বাইরে থাকতে যেসব আমল নিয়মিত করা হয়নি, সেসব কারাগারে বসেই করার চেষ্টা করেছি।’

 

এদিকে মুক্তির দিন তার বাসার পারিবারিক খানকায় ‘গাদিরে খুম’ স্মরণে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। আইভীর দাবি, কারাগারে বসেই তিনি দোয়া করেছিলেন যেন এই গুরুত্বপূর্ণ দিনের আগেই বাসায় ফিরতে পারেন। সেই প্রার্থনা পূরণ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

 

বুধবার গভীর রাতে জামিনে মুক্তি পেয়ে নিজ বাসভবনে ফেরেন আইভী। এরপর থেকেই আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের আগমন অব্যাহত রয়েছে। ফোনকল ও সাক্ষাৎকারের ব্যস্ততায় প্রথম রাতেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি বলে জানান তিনি।

 

এদিকে আইভীর বাসার সামনে জেলা পুলিশের উদ্যোগে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও জেলা পুলিশের দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদক্ষেপ নয়।

 

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, কিশোর গ্যাং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। একই প্রকল্পের আওতায় সাবেক মেয়রের বাসার সামনের এলাকাতেও চারটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, মানুষজন সাবেক মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। তবে সেখানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সভা-সমাবেশ হচ্ছে কি না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যবেক্ষণ করবে।

 

গত ৯ মে নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের মোট ১২টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট একাধিক মামলায় তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর বিষয়টি আপিল বিভাগে গেলেও শেষ পর্যন্ত জামিন বহাল থাকে। সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তিনি মুক্তি পান।

 

নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিন মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।