কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ লেবাননের বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
যেটিকে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের একটি "নির্ধারক পরিবর্তন" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর মূল সীমারেখা পেরিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইসরায়েলের এই সর্বশেষ আগ্রাসনের সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের আরো বড় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে " কালেক্টিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি" দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোর মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননের বাসিন্দাদের জাহরানি নদীর নিচের পুরো দক্ষিণ লেবানন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল ইসরায়েল।
আইডিএফ এর একজন মুখপাত্র বলেছেন, "হেজবুল্লাহর সদস্য, স্থাপনা অথবা যুদ্ধের সরঞ্জামের কাছাকাছি থাকা যে কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।"
এই মুখপাত্র আরো জানান, "উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইডিএফের স্থলসেনা" এই অভিযানে অংশ নিয়েছে।
যেটি "বর্তমানে আরো নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে।"
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার রোববার ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে যোগ দিয়ে ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহকে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স এ কুপার লিখেছেন, "লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করেছে, অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং কূটনীতির সুযোগ সংকুচিত করেছে। এটি অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।"
ছবির উৎস,Reuters
তিনি আরো লিখেছেন, হেজবুল্লাহকে "অবশ্যই ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।"
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশের দক্ষিণে "স্কর্চড-আর্থ পলিসি বা পোড়ামাটি নীতি এবং কালেকটিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি" দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
লেবাননের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা ফ্রান্স ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক্স এ লিখেছেন, "এটা অত্যন্ত জরুরি যে, সবপক্ষের অস্ত্রগুলোই শান্ত হোক এবং চিরতরের জন্য।"
তিনি আরো লিখেছেন, "দক্ষিণ লেবাননে বর্তমানে যে বড় ধরনের আগ্রাসন চলছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।"
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারোট ফ্রেঞ্চ নেটওয়ার্ক বিএফএমটিভিকে বলেছেন, এই পরিস্থিতি "ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ভুল।"
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ লেবাননের আরো ভেতরে অগ্রসর হওয়া "গুরুতর উদ্বেগের কারণ।"
এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, "যে কোনো ধরনের আরো উত্তেজনা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলবে এবং লেবাননের ভেতরে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঢেউ তৈরি করবে।"
লিতানি উপত্যকার ওপর অবস্থিত বিউফোর্ট দুর্গটি প্রায় ৯০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিল ক্রুসেডাররা।
এরপর থেকেই এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই দূর্গ।
৪৪ বছর আগে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই দূর্গটি দখল করেছিল। ইসরায়েলে যে যুদ্ধ প্রথম লেবানন যুদ্ধ নামে পরিচিত।
দূর্গটি দখলের পর রোববার এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, এটি ছিল "আমাদের নীতির একটি নিষ্পত্তিমূলক স্টেজ বা ধাপ এবং নিষ্পত্তিমূলক পরিবর্তন।"
তিনি বলেন, "আমরা ভয়ের দেয়াল ভেঙে ফেলেছি। আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি, আমরা সব ফ্রন্ট যেমন: সিরিয়া, গাজা এবং লেবাননে অভিযান চালাচ্ছি।"
নেতানিয়াহু আরো বলেন, তার লক্ষ্য হলো "হেজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গাগুলোর ওপর দখল আরো জোরদার করা এবং প্রসারিত করা।"
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ৪৪ বছর আগে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন, যেটি ছিল লেবাননের যুদ্ধের প্রথম যুদ্ধগুলোর একটি।
তিনি বলেন, গোলানি ব্রিগেড, যারা তখন এটি দখল করেছিল, তারা আবার ফিরে এসেছে এবং এই দূর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেছে।
তাই, ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কৌশলগত বিজয়ের পাশাপাশি অত্যন্ত প্রতীকী একটি বিজয়।
ইসরায়েলি বাহিনী ১৯৮২ সালে এই দুর্গটি দখল করেছিল।
ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার (নয় মাইল) দূরে অবস্থিত এটি।
তবে দুই হাজার সালে তারা যখন দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্বঘোষিত বাফার জোন (নিরাপদ অঞ্চল) ছেড়ে চলে যায়, তখন তারা এই দূর্গ ছেড়ে চলে যায়।
লেবাননের মানুষের জন্য এটি হলো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দখল হওয়া সর্বশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে আরো উত্তরে অবস্থিত নাবাতিহ শহরটি ক্রমশ আইডিএফ এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
কাৎজ বলেন, এই দুর্গ এবং যে পাহাড়ের চূড়ায় এটি অবস্থিত তার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সীমান্তের ওপারে থাকা ইসরায়েলি জনবসতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ছবির উৎস,Getty Images
লেবাননের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার এই নির্দেশগুলো আরো একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, ইসরায়েলি স্থলসেনারা লিতানি নদীর মূল সীমারেখা পেরিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডের আরো ভেতরে এগোচ্ছে।
ইসরায়েল বলছে যে, লেবাননের ভেতরে থাকা ইসরায়েলি সেনা এবং সীমান্তের ওপারে থাকা জনবসতি, উভয় লক্ষ্যবস্তুতেই ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর বিস্ফোরক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়ে দেওয়ার জবাবে তারা এই হামলা আরো তীব্র করেছে।
রোববার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের টায়ার এলাকার হিরাম হাসপাতালের কাছে একটি বিমান হামলায় হাসপাতালের ১৩ জন কর্মী আহত হয়েছেন এবং এতে হাসপাতালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আরো একজন সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সামরিক বাহিনী।
অন্যদিকে সতর্কতা হিসেবে রোববার সীমান্তের ইসরায়েলি পাশের জনবসতিগুলোর স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
গত শনিবার হেজবুল্লাহ ওই অঞ্চলের দিকে প্রায় ২৫টি প্রজেক্টাইল বা দূরপাল্লার গোলা নিক্ষেপ করেছে।
এর ফলে বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আরো বেশি কিছু করা উচিত বলে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা দাবি তুলেছেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, হেজবুল্লাহর এই হামলাগুলো ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যকার সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত মাসে কার্যকর হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত দুইবার বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, লেবাননের কর্মকর্তারা আবার ইসরায়েলের এই হামলাগুলোকেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পরস্পরকে দোষারোপ করার অর্থ হলো যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত ভেস্তে গেছে।
তবুও এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে দুই সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে চতুর্থ দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সালাম বলেছেন, এই যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য লেবাননের সামনে এটাই একমাত্র পথ তবে হেজবুল্লাহ এই আলোচনায় যুক্ত নেই।
আর লেবানন সরকার ও সেনাবাহিনী, বরাবরের মতোই, ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যকার এই সাম্প্রতিক সংঘাতের শুধুমাত্র নীরব দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারছে না।
গত দোসরা মার্চ ইসরায়েলি এক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে হেজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবানন একপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যপক্ষে ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
ওই হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েল পুরো লেবানন জুড়ে বিমান হামলা এবং স্থল হামলা শুরু করে।
তখন থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার তিনশোরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবানন কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ২৫ জন সদস্য মারা গেছে।