সূর্যাস্তের পর অন্ধকার রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় হুট করে একটা কালো বিড়াল সামনে দিয়ে পার হয়ে গেলো। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ হলে আপনি হয়তো অমঙ্গলের আশঙ্কায় থমকে দাঁড়াবেন, বিশেষ করে বিড়ালটি যদি বাঁ থেকে ডানে যায়। চকচকে কালো পশম, তীক্ষ্ণ চোখ আর চোরের মতো মৃদু পায়ের চলনের কারণে শতাব্দী ধরে কালো বিড়ালকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে রহস্য। কোনও সংস্কৃতিতে এটি অলৌকিক অপশক্তির প্রতীক, আবার কোথাও এটি পরম সৌভাগ্যের বার্তাবাহক।
কালো বিড়ালের এই ‘অপয়া’ বদনামের শুরু মধ্যযুগে, যখন ডাইনি শিকারের উন্মাদনা চলছিল। মানুষ বিশ্বাস করত, ডাইনিরাই আসলে কালো বিড়ালের রূপ ধরে রাতে দুর্ভাগ্য ছড়িয়ে বেড়ায়। শয়তানের চরিত্র মনে করে তথাকথিত ডাইনিদের সঙ্গে এই নিরীহ বিড়ালগুলোকেও জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো।
ফরাসি সাংবাদিক জঁ-লুই হুয়ের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ শতক পর্যন্ত ফ্রান্সের কিছু অংশে গ্রীষ্মকালীন উৎসবের আগুনে একসঙ্গে ১৩টি কালো বিড়ালকে জীবন্ত পোড়ানো হতো। বেলজিয়ামের ইপ্রেসে এদের ছুড়ে ফেলা হতো গির্জার চূড়া থেকে। পরবর্তীতে ইউরোপীয় অভিবাসীদের মাধ্যমে এই কুসংস্কার আমেরিকায় পৌঁছায় এবং ১৯ শতক থেকে হ্যালোউইনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে পিঠ বাঁকানো, জ্বলজ্বলে চোখের এই কালো বিড়াল।
তবে সবাই কিন্তু কালো বিড়ালকে অমঙ্গলের প্রতীক ভাবেন না। যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে কালো বিড়াল ঘরে আসা বা রাস্তা পার হওয়াকে সৌভাগ্যের লক্ষণ ধরা হয়। স্কটল্যান্ডে দরজায় কালো বিড়াল আসা মানে সমৃদ্ধির আগমন। জাপানে এটি অর্থ ও ভাগ্যের পাশাপাশি রোগবালাই থেকে মুক্তির প্রতীক।
জাপানি ঐতিহ্যবাহী ইশারায় ডাকা বিড়ালের কালো সংস্করণটি ভূত-প্রেত তাড়াতে ব্যবহৃত হয়। এমনকি সেখানে বিশ্বাস করা হয়, কালো বিড়ালের মালকিনরা পুরুষদের বেশি আকর্ষণ করতে পারেন। জাহাজেও কালো বিড়ালকে ঝড়-তুফান দূরে রাখার ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের শুভ প্রতীক মানা হতো।
প্রাচীন মিশরে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের রক্ষাকর্তা এবং আনন্দ-নৃত্যের দেবী ‘বাস্তোত’-কে সবসময় কালো বিড়ালের রূপেই চিত্রিত করা হতো।
বিজ্ঞান অবশ্য বলে, কালো বিড়ালের এই রঙের পেছনে কোনও অলৌকিকতা বা ঈশ্বরের বিশেষ রঙের কোটা নেই, বরং রয়েছে জিনতত্ত্ব। বিড়ালের ‘বি’ জিনটি ইউমেলানিন নামক পিগমেন্ট তৈরি করে, যা এদের পশম, নাক ও থাবা কালো করে। মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ কালো বিড়ালই পুরুষ হয়ে থাকে। কারণ এই ‘বি’ জিনটি থাকে ‘এক্স’ ক্রোমোজোমে। পুরুষ বিড়ালের কেবল একটি ‘এক্স’ ক্রোমোজোম থাকায় সহজেই তা কালো হয়, অন্যদিকে স্ত্রী বিড়ালের ক্ষেত্রে দুটি ক্রোমোজোমেই এই জিনের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।
শিল্প ও পপ সংস্কৃতিতেও কালো বিড়ালের রাজত্ব কম নয়। ১৮৪৩ সালে এডগার অ্যালান পো তাঁর ‘দ্য ব্ল্যাক ক্যাট’ গল্পে একে খুন ও উন্মাদনার প্রতীক হিসেবে দেখান। পরবর্তীতে এটি স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘সাবরিনা দ্য টিনেজ উইচ’ সিরিজের রসিক বিড়াল ‘সালেম’ কিংবা অ্যানিমে সিরিজ ‘সেইলর মুন’-এর কথা বলা ‘লুনা’ চরিত্রগুলো দারুণ জনপ্রিয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা টিম বার্টনের সিনেমাতেও এদের মেলানকোলিক রূপ দেখা যায়।
২০১৮ সালের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ সিনেমার জনপ্রিয়তার পর তো অনেকে কালো বিড়াল দত্তক নিয়ে ছবির চরিত্রগুলোর নামে নাম রাখা শুরু করেন। রক ও গথ সংস্কৃতিতে কালো বিড়াল মানেই আভিজাত্য, রহস্য ও অহংকার।
সূত্র: ডয়চে ভেলে