আমেরিকান স্বপ্ন বা আমেরিকান ড্রিম পূরণের চিরাচরিত গল্প বলতে সাধারণত সিলিকন ভ্যালির কোনো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কিংবা ওয়াল স্ট্রিটের বড় কোনো কর্পোরেট চুক্তিকে বোঝানো হয়। তবে এর বাইরেও সম্পূর্ণ প্রচারণামুক্ত থেকে মার্কিন মুলুকে সম্পদ গড়ার এক নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে।
দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ সাধারণ আমেরিকানকে নীরবে কোটিপতি বানিয়ে দিচ্ছে। ম্যাকডোনাল্ডস, ডানকিন বা সাবওয়ের মতো চেইন শপ থেকে শুরু করে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ কিংবা গৃহস্থালি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান—এসবের ফ্র্যাঞ্চাইজি বা লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে বহু মানুষ আজ বিপুল সম্পদের মালিক।
অনেকেরই ধারণা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মানেই কেবল ফাস্টফুড বা বার্গার বিক্রির দোকান, যেখানে মুনাফার বড় অংশই চলে যায় মূল ব্র্যান্ড বা কর্পোরেট সদর দপ্তরে। তবে বাস্তব চিত্রটি বেশ ভিন্ন এবং অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। ইন্টারন্যাশনাল ফ্র্যাঞ্চাইজি অ্যাসোসিয়েশন এবং অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে আট লাখ ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট রয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই আউটলেটগুলোর সিংহভাগেরই মালিকানা স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ীদের হাতে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি মূলত এমন এক ব্যবসায়িক কাঠামো, যেখানে একজন উদ্যোক্তা সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে ঝুঁকি না নিয়ে, ইতিমধ্যে বাজারে প্রতিষ্ঠিত ও সফল একটি ব্র্যান্ডের নাম, লোগো এবং পরিচালনার পদ্ধতি নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে ব্যবহার করেন।
এই ব্যবসায়িক মডেলটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ধারাবাহিকতা এবং গ্রাহকের পূর্বপরিচিত আস্থা। একজন স্বাধীন নতুন ব্যবসায়ীকে যেখানে ব্র্যান্ডের পরিচিতি তৈরি করতেই বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হয়, সেখানে একজন ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ব্যবসার প্রথম দিন থেকেই তৈরি গ্রাহক পেয়ে যান। পাশাপাশি মূল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সস্তায় কাঁচামাল কেনা এবং বিপণন সহায়তার সুবিধা তো রয়েছেই।
এই কাঠামোগত সুবিধার কারণেই সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসার তুলনায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসাগুলোর টিকে থাকার এবং দ্রুত মুনাফা অর্জনের হার অনেক বেশি। ফলে বহু মধ্যবিত্ত আমেরিকান, বিশেষ করে যারা কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে স্বাধীনভাবে কিছু করতে চেয়েছেন, তারা এই মডেলকে বেছে নিয়ে অল্প সময়ে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন।
বর্তমান সময়ে এই খাতে আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা একে আরও বেশি লাভজনক করে তুলেছে। আগে যেখানে একজন ব্যক্তি কেবল একটি বা দুটি আউটলেট পরিচালনা করতেন, এখন সেখানে 'মাল্টি-ইউনিট অপরেটর' বা বহু-শাখা পরিচালনাকারীদের আধিপত্য বাড়ছে।
অনেক সফল উদ্যোক্তা এখন একটি ব্র্যান্ডের সফলতার পর বিভিন্ন শহরের ডজনখানেক বা তারও বেশি আউটলেটের মালিক হচ্ছেন। এমনকি বেসরকারি ইক্যুইটি ফান্ড এবং বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার স্থিতিশীল ক্যাশ-ফ্লো এবং নিশ্চিত মুনাফার দিকে ঝুঁকছে। কম ঝুঁকিতে স্থায়ী আয়ের এই উৎসটি এখন আমেরিকার সম্পদশালী শ্রেণির পোর্টফোলিওতে একটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
তবে এই সাফল্যের পথটি একেবারে বাধাহীন নয়। কড়া কর্পোরেট নিয়মকানুন মেনে চলা, মূল ব্র্যান্ডকে নিয়মিত লয়্যালটি ফি দেওয়া এবং ক্রমবর্ধমান কর্মী সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ এখানেও রয়েছে। তা সত্ত্বেও, ব্যবসায়িক কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেবল একটি প্রমাণিত পদ্ধতি অনুসরণ করে ধনী হওয়ার জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। কোনো বড় প্রযুক্তিগত আবিষ্কার বা যুগান্তকারী আইডিয়া ছাড়াই, স্রেফ সুশৃঙ্খলভাবে এবং দক্ষতার সাথে পরিচিত একটি ব্র্যান্ডকে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালনা করেই অসংখ্য সাধারণ আমেরিকান আজ সফল উদ্যোক্তা এবং বিপুল বিত্তের অধিকারী হয়ে উঠেছেন।
সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট।