Image description

জাপানের ‘মিয়াজাকি’ আমকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমগুলোর একটি বলা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই আমের কিছু প্রিমিয়াম জোড়া কয়েক হাজার ডলারে বিক্রির রেকর্ডও রয়েছে। ২০১৯ সালে জাপানে ‘তাইয়ো নো তামাগো’ ব্র্যান্ডের এক জোড়া মিয়াজাকি আম নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৫ লাখ ইয়েনে, যা তখন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারের সমান ছিল।

বর্তমানে জাপানের প্রিমিয়াম বাজারে উচ্চমানের মিয়াজাকি আমের দাম প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১ লাখ টাকার কাছাকাছি।

অপরদিকে, বাংলাদেশে একই নামে বিক্রি হওয়া আম চলতি মৌসুমে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এর আগের বছরগুলোতে অবশ্য মিয়াজাকি নামে বাংলাদেশের বাজারে আমের কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দেখা গেছে। তবে দেশে শুরুর দিকে প্রতি কেজি মিয়াজাকি আম ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম হিসেবে পরিচিত ফলটি বাংলাদেশে এত কম দামে বিক্রি হচ্ছে কেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান কারণ উৎপাদন পদ্ধতি ও বাজারব্যবস্থার পার্থক্য। জাপানে মিয়াজাকি আম অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদন করা হয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, গ্রিনহাউস প্রযুক্তি, আলোর প্রতিফলন, হাতে বাছাই এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে এই আম বাজারে আসে। ‘তাইয়ো নো তামাগো’ বা ‘এগ অব দ্য সান’ নামের প্রিমিয়াম গ্রেড পেতে প্রতিটি আমের ওজন, রং ও মিষ্টতার মাত্রাও পরীক্ষা করা হয়।

 

জাপানে ফলকে অনেক সময় বিলাসবহুল উপহার হিসেবেও দেখা হয়। বিশেষ অনুষ্ঠান বা করপোরেট উপহারে দামি ফল দেওয়ার সংস্কৃতি থাকায় প্রিমিয়াম ফলের বাজার সেখানে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। সামাজিক মর্যাদা ও ব্র্যান্ড ভ্যালুও দাম বাড়ানোর বড় কারণ।

বাংলাদেশে এখনও সেই ধরনের বিলাসবহুল ফলের বাজার তৈরি হয়নি। এখানে মিয়াজাকি আম মূলত কৌতূহলনির্ভর ও সীমিত আকারের একটি পণ্য। অনেক কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করছেন। উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম, কারণ শ্রম ও জমির ব্যয় জাপানের মতো বেশি নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশে ‘মিয়াজাকি’ নামে বিক্রি হওয়া সব আম জাপানের প্রিমিয়াম মানের ‘তাইয়ো নো তামাগো’ গ্রেডের নয়। একই জাতের চারা ব্যবহার হলেও আবহাওয়া, পরিচর্যা, মিষ্টতার মাত্রা ও বাজারজাতকরণে পার্থক্য থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সেই উচ্চমূল্য এখানে তৈরি হয় না।

জানতে চাইলে রাজধানীর বনশ্রী এলাকার একজন ফল বিক্রেতা বলেন, ‘জাপানের আসল প্রিমিয়াম মিয়াজাকি আর এখানে যে আম বিক্রি হয়, সেটা এক জিনিস না। আমাদের এখানে যেটা পাওয়া যায়, সেটা স্থানীয়ভাবে চাষ করা। তাই দামও কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্রেতারা মূলত কৌতূহল থেকে কিনছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে এসে খোঁজ করেন। তবে স্বাদ ভালো হওয়ায় ধীরে ধীরে এর চাহিদাও বাড়ছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়াজাকি আমের দাম শুধু স্বাদের কারণে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিরলতা, নিখুঁত উপস্থাপন, ব্র্যান্ডিং এবং জাপানের বিলাসপণ্যের সংস্কৃতি। আর বাংলাদেশে এটি এখনও মূলত ‘ভাইরাল’ ও আলোচিত একটি বিদেশি জাতের আম—যার বাজারমূল্য বাস্তবতার কারণে আন্তর্জাতিক দামের অনেক নিচে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে বাড়ছে মিয়াজাকির চাষ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ টন মিয়াজাকি উৎপাদিত হয়েছে। তার আগের বছর হয়েছিল ২৪ টন। বাংলাদেশে এ আম আসার পর এবার সর্বোচ্চ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। মাঠ পর্যায়েও এ আমের ভালো উৎপাদনের চিত্র পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মিয়াজাকি আমের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। সেখানে আম্রপালি বা রাংগুই আমের পাশে সহযোগী হিসেবেই চাষাবাদ হচ্ছে মিয়াজাকির। খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় হচ্ছে মিয়াজাকি আমের চাষ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মিয়াজাকির ভালো উৎপাদনের কারণ হিসেবে এখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকেই মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।