Image description
 

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ও হুমকি-ধামকিতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। মূলত ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার পর থেকেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মন্তব্যের পর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুক্রবার (২২ নভেম্বর) রাজধানীতে দলীয় কর্মসূচিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘সহযোদ্ধাদের ওপর ভায়োলেন্স হলে, আমরাও সেই পথ বেছে নিতে বাধ্য হবো। এক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে আপনারা বেশি পারবেন না, জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা তা দেখিয়ে দিয়েছি।’

তার এমন মন্তব্যকে অনেকে রাজনীতিতে ভিন্ন বার্তা হিসেবে দেখছেন। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, একটি স্থিতিশীল পরিবেশকে কলুষিত করতে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে অদৃশ্য শক্তি। সবাই সহনশীলতার পরিচয় না দিলে সামগ্রিক পরিবেশ জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর দেশ শাসন করেছে অগণতান্ত্রিক একটি শক্তি। আর মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়েও অনেক বিতর্ক ছিল। এই সময়ে যখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার যাত্রা করেছে, তখন এমন বক্তব্য উসকানিমূলক।’

এনসিপি নেতাদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে সরকারেরও দোষ আছে। সরকার তাদের অন্যায়গুলো সামনে নিয়ে আসছে না। ড. ইউনূসের সরকারের সময় এনসিপির এই নেতা বলেছিলেন, ডিপস্টেট তাদের ২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে বলেছিল। কিন্তু এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি। আমি মনে করি, এখন আবার এই ধরনের বক্তব্যও উসকানিমূলক।’

ঘটনার পরম্পরা-প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার (২২ নভেম্বর) ঝিনাইদহ কালেক্টরেট মসজিদ জুমার নামাজ শেষে বের হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন কয়েকজন যুবক। এ সময় তার অন্য নেতাকর্মীদেরও মারধর করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দায়ী করে নানা পোস্ট দেন এনসিপি ও বিএনপির সমর্থকরা।

দলগতভাবে তাৎক্ষণিক জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বিক্ষোভ করেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এ হামলার জন্য বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, আমরা বাকস্বাধীনতা বলতে বুঝি, এই দেশে যারা দায়িত্বে আছে তাদের যে কাউকে যে কেউ প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন। শুধু নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী না, এই দেশের যেকোনও নাগরিক আপনাদের প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন। সেখানে সরকার আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর ভায়োলেন্স করতে চাইলে আমরাও বাধ্য হবো। আমরা কতটুকু পারি, সেটাতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানেই প্রমাণ হয়েছে।

অন্যদিকে পাটওয়ারীর ওপর হামলায় নিজেদের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল। আর কেন্দ্রীয় বিএনপি বা সরকারের কোনও মন্ত্রী এ নিয়ে বিবৃতি দেননি। অবশ্য ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এ ঘটনার জন্য পাটোয়ারীকেই দাবি করেন। ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক উল্লেখ করেন, মব করতেই সেখানে গেছেন পাটওয়ারী।

নাছির আরও লেখেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত, সমালোচিত, মব ও সংঘাত উসকে দেওয়া ব্যক্তি নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী। সেখানে তার ওপর ডিম নিক্ষেপ করেছে সাধারণ জনতা। আর তার সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনতার উদ্দেশে গুলি করার চেষ্টা করে। তারা শিবিরের কর্মী।’

এদিন রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তাই বলে ভিন্নমতের কারণে হামলা, সহিংসতা ও অপমানজনক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’

কোনো কিছু কি আড়াল করা হচ্ছে

নতুন সরকারের মাত্র তিন মাসের মাথায় রাজনীতিতে হঠাৎ উত্তেজনার নেপথ্যে কী বা কারা জড়িত এ নিয়েও নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, দেশে হাজারও সমস্যা আড়াল করতে রাজনৈতিক ময়দানকে টার্গেট করা হচ্ছে। এক ধরনের সংঘাতের পথ তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দল সবারই দায় রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সীমালঙ্ঘন যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যখন কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, হামে শিশুর মৃত্যুর হার বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে মানুষের জীবন নাভিশ্বাস, তখন এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। এক্ষেত্রে ভিন্ন উদেশ্য আছে কী না তা বলা কঠিন।’

সরকারকে যেমন অনেক বিষয়ে চাপে রাখার অধিকার আছে, তেমনি ভায়োলেন্সের মতো শব্দ প্রয়োগে আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নেপথ্যে কারা, সরকার-বিরোধী দলের ভিন্নমত

একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে উত্তেজনার পারদ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা পরস্পরকে দোষারোপ করেই দায় সাড়তে চান।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার নানা ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। নিজেদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি,খুন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে ধামাচাপা দিতেই পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে উসকানি দিয়ে বিরোধী দলকে রাজপথে ঠেলে দিচ্ছে। তবে আমরা সরকারের কোনও অন্যায়কে মেনে নিবো না।’

একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের হুইপ রফিকুল ইসলাম খানও। তিনি বলেন, ‘সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই সবক্ষেত্রে বিরোধী দলকে দোষারোপ করছে। বিভিন্ন জায়গায় গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা সরকারকে সহনশীলতার আহ্বান জানাই।’

অপরদিকে শনিবার (২৩ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু যেভাবে কিছু মানুষ ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করছে, তা দেখে প্রশ্ন জাগে, তারা স্বাভাবিক অবস্থায় আছে কি না।’ তিনি মনে করেন একটি শক্তি পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ভিন্নদিকে নিতে চায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। তারেক রহমান দায়িত্বগ্রহণের পর থেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। কিন্তু যারা তা সহ্য করতে পারছেন না, তারাই অস্থিরতা তৈরি করতে চান।’