ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের দিকে তাকিয়ে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এই প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন সময় দেওয়া বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে কয়েক সপ্তাহের থেমে থেমে চলা আলোচনা এখন এক নাজুক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতি হয় একটি সফল চুক্তির দিকে যাবে, নয়তো নতুন করে হামলা শুরু হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মার্কো রুবিও বলেন, আমি মনে করি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল আজ তেহরান সফরে যাবে। আশা করছি, এর ফলে আলোচনা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া এক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ইসলামাবাদে আয়োজিত ঐতিহাসিক মুখোমুখি বৈঠকসহ এ পর্যন্ত নেওয়া নানা উদ্যোগ কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে, পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি গত বুধবার এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইরান সফর করেছেন।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, পাকিস্তানি সেনাপ্রধান মুনির সম্ভবত বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করতে পারেন।
যদিও পাকিস্তান সরকার তার এই সফরের পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। এর মধ্যেই বেইজিং জানিয়েছে, শনিবার চীন সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় বেইজিংও অন্যতম ভূমিকা পালন করছে।
পরিস্থিতি এক নাজুক সন্ধিক্ষণ
যদিও সরাসরি যুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা কিছুটা কমে এসেছে, তবে বিদ্যমান অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এপ্রিল মাসে পাকিস্তানেই একমাত্র সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় আয়োজিত সেই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা সফল হয়নি। তেহরানের অভিযোগ ছিল, ওয়াশিংটন 'বাড়তি ও অহেতুক দাবি' উত্থাপন করেছে। এর পর থেকে উভয় পক্ষ একাধিক প্রস্তাব দিলেও নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা সবসময়ই বিরাজ করছে।
বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বিশ্বাস করুন, পরিস্থিতি এখন একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে বা এক নাজুক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। যদি আমরা সঠিক উত্তর না পাই, তবে পরিস্থিতি খুব দ্রুত অন্যদিকে (যুদ্ধের দিকে) মোড় নেবে। আমরা সবদিক থেকে প্রস্তুত আছি।
তিনি আরও জানান, একটি সমঝোতা ‘খুব দ্রুত’ বা ‘কয়েক দিনের মধ্যেই’ হতে পারে। তবে তিনি তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, তাদের ‘শতভাগ সন্তোষজনক জবাব’ দিতে হবে।
এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ন্যাটো মিত্রদের কড়া সমালোচনা করেছেন রুবিও।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট তাদের সৈন্য মোতায়েন করতে বলছেন না, কিংবা যুদ্ধবিমান পাঠাতেও বলছেন না। তা সত্ত্বেও তারা কোনো ধরনের সহায়তা করতেই নারাজ। বিষয়টি আমাদের অত্যন্ত মনক্ষুণ্ণ করেছে।’
আক্রান্ত হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের আশঙ্কায় তেহরান এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মাদ বাগের গালিবাফ বুধবার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরান আক্রান্ত হলে তার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।
গালিবাফ বলেন, শত্রুর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তারা তাদের সামরিক উদ্দেশ্য ত্যাগ করেনি এবং একটি নতুন যুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, তেহরান ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখছে। একইসঙ্গে তিনি বিদেশে জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি পুনরায় ব্যক্ত করেন।
ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিলেও জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজ দেশে একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চাপের মুখে রয়েছেন।
যদিও যুদ্ধবিরতির ফলে লড়াই থেমেছে, কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ এখনো খুলে দেওয়া হয়নি। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হয়।
বর্তমানে আলোচনার অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজের ভবিষ্যৎ। যুদ্ধের আগের মজুত করা তেল ফুরিয়ে আসতে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা একটি ‘টোল’ ব্যবস্থা চালু করে সীমিত সংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি তদারকির জন্য ইরানের নবগঠিত সংস্থাটি দাবি করেছে যে, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। তেহরানের এই দাবি আবুধাবির পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন থেকেই ইরান ও আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।
বিশ্বব্যাপী সারের চালানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং তীব্র সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।