আজ নাকবা দিবস। ১৯৪৮ সালের এই দিনেই ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা শুরু হয়েছিল আসলে আরও আগে থেকেই।
জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যান পাশের পরপরই, ১৯৪৭ সালের ১১ই ডিসেম্বর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রশাসন নিশ্চিত করে যে ১৯৪৮ সালের মে মাসের ১৫ তারিখেই ম্যান্ডেট শাসনের অবসান ঘটবে এবং এর আগেই তারা ফিলিস্তিন থেকে সকল সৈন্য সরিয়ে নেবে।
ঐ ঘোষণার পরপরই ফিলিস্তিন জুড়ে সহিংসতা শুরু হয়ে যায়। পার্টিশন প্ল্যান প্রত্যাখ্যান করে স্থানীয় আরবরা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ইহুদি দোকানপাট এবং যানবাহনের উপর আক্রমণ করে।
আর বিপরীতে ইহুদি মিলিশিয়া বাহিনীগুলো প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রের সীমানা জুড়ে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর উপর আক্রমণ শুরু করে দেয় এবং ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় ৭৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করে।
১৯৪৮ সালের ১০ই মার্চ ডেভিড বেন গুরিয়নের নেতৃত্বে ইহুদিদের প্রধান মিলিশিয়া বাহিনী হাগানা Plan Dalet, তথা প্ল্যান ডি চূড়ান্ত করে। এই পরিকল্পনার আওতায় পরবর্তী মাসগুলোতে ইহুদি মিলিশিয়া বাহিনীগুলো ফিলিস্তিনিদের উপর এথনিক ক্লিনজিং (Ethnic Cleansing), তথা জাতিগত নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করে।
মে মাসের ১৫ তারিখে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে পেশাদার সৈন্যরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করার আগেই মাত্র দুই মাসে তারা প্রায় ২০০ ফিলিস্তিনি গ্রাম পুরোপুরি দখল করে নেয় এবং সেগুলো থেকে আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করে।
ইহুদিদের এসব আক্রমণ, গণহত্যা এবং উচ্ছেদ কর্মসূচির সামনে ফিলিস্তিনিরা ছিল সম্পূর্ণ অসহায়। কারণ তাদের প্রতিরোধের সক্ষমতা এর আগেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
১৯৩৬ সালে ফিলিস্তিনিরা যখন ব্রিটিশদের ইহুদি-বান্ধব নীতির বিরুদ্ধে গ্রেট রিভোল্ট (الثورة الكبرى) শুরু করেছিল, তখন সেই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ২০ হাজার সৈন্য নিয়োগ করেছিল।
ফিলিস্তিনিদের উপর নির্বিচারে বিমান হামলা চালিয়ে এবং তাদেরকে গণহারে বাস্তুচ্যুত করে তিন বছর পর তারা সেই বিদ্রোহ পুরোপুরি দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। ততদিনে ফিলিস্তিনের পুরুষ জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশই হয় নিহত, অথবা আহত, গ্রেপ্তার বা দেশান্তরী হয়েছিল।
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ফিলিস্তিনিদেরকে সাহায্য করার জন্য প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে আরব লীগের কয়েক হাজার সদস্যের একটা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে শুরু করে। কিন্তু ইহুদি মিলিশিয়া বাহিনীগুলোর তুলনায় এদের সংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ ছিল নিতান্তই অপ্রতুল।
ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের অবসানের ঠিক আগের দিন, মে মাসের ১৪ তারিখে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সর্ববৃহৎ সংগঠন জুইশ এজেন্সি ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেয়।
এর পরপরই আরব রাষ্ট্রগুলো যখন প্রথমবারের মতো তাদের নিয়মিত সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোকে ফিলিস্তিনে প্রেরণ করে, তখন দেখা যায় সেই সম্মিলিত সেনাবাহিনীও নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর তুলনায় অনেক দুর্বল।
এর কারণ হচ্ছে, অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রই তখন সদ্য স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। একমাত্র মিসর ছাড়া বাকিদের তখনও কার্যকর অর্থে সেনাবাহিনীই গড়ে ওঠেনি। এবং মিসরীয় সেনাবাহিনীও তখন পর্যন্ত সেই অর্থে পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি।
ফিলিস্তিনে যুদ্ধ করতে যাওয়া মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রায় অর্ধেকই ছিল মিসরের ইসলামপন্থি বিরোধী রাজনৈতিক দল এখুয়ানুল মুসলেমিন (الإخوان المسلمين), তথা মুসলিম ব্রাদারহুডের স্বেচ্ছাসেবী, যাদের বলতে গেলে কোনো প্রশিক্ষণই ছিল না।
১৯৪৮ সালের শেষের দিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় ৮০ হাজার, সেখানে আরব সেনাবাহিনীগুলোর সম্মিলিত সংখ্যা কখনোই ৫০ হাজারের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি। ব্রিটিশদের বিভাজন নীতি এবং জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ’র স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রের কারণে এই বাহিনীগুলোর মধ্যেও তেমন কোনো সমন্বয় ছিল না। এরা প্রত্যেকে যুদ্ধ করছিল বিচ্ছিন্নভাবে; ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে।
তার উপর একদিকে আরবদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা ছিল অপর্যাপ্ত, বিপরীতে ইসরায়েলি সেনাসদস্যদের একটা বড় অংশ ছিল ব্রিটিশদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করার অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ।
সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধের শুরুতেই ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের অবরোধের কারণে আরবদের অস্ত্র সংগ্রহের পথ বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চেকোস্লোভাকিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করতে সক্ষম হয়।
ফলে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে যখন এই অসম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে, ততদিনে সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ এলাকাই চলে যায় ইসরায়েলের দখলে। মিসর এবং জর্ডান যথাক্রমে গাযা এবং পশ্চিম তীরের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেও বাকি অংশগুলো হাতছাড়া হয়ে যায় চিরতরে।
ইসরায়েলি বাহিনী ৫৩১ টা ফিলিস্তিনি গ্রাম পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যুদ্ধের শেষ নাগাদ প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করা হয়, যে সংখ্যাটা ছিল তৎকালীন ফিলিস্তিনের স্থানীয় জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীর এই ভয়াবহ দুর্দশাই ইতিহাসে নাকবা (النكبة), তথা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিতি পায়।
===
বই: দ্য রোড টু অপারেশন আল আকসা ফ্লাড
লেখক: মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা