Image description

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার গঠনের পর রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বেআইনি দোকানপাট ও নির্মাণ ভাঙতে কঠোর হয়েছে রাজ্য সরকার। সেই অভিযোগ ঘিরে কলকাতা হাইকোর্টে করা হয়েছে জনস্বার্থ মামলা।

 

 

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সেই মামলার শুনানিকে কেন্দ্র করে চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে উঠে আসে ভোট পরবর্তী হিংসা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হামলা, দখলদারি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে শাসক দলের বিরুদ্ধে।

 

অপরদিকে, আদালত চত্বরে দেখা যায় নজিরবিহীন উত্তেজনা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে হাইকোর্টের একাংশ আইনজীবী ও উপস্থিত ব্যক্তিরা ‘চোর, চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে নিরাপদে আদালত চত্বর থেকে বের করে আনতে তৃণমূলের লিগ্যাল সেলের সদস্য ও পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।

 

এদিন মামলার শুনানি হয় প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথী সেনের ডিভিশন বেঞ্চে।

শুনানির শুরুতেই একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন সিপিআইএম নেতা ও আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, যেখানে যেখানে ভাঙচুর হয়েছে, সেসব রাজ্য সরকারকে ঠিক করে দিতে হবে। আগের হাইকোর্টের নির্দেশও মানতে হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে বুলডোজার কালচার নিয়ে আসা হচ্ছে। এখানে আগে এই সংস্কৃতি ছিল না।

 

তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে হামলা হয়েছে এবং দলীয় সমর্থকদের হয়রানি করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরিতে ৬০টি দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাওড়ার ডোমজুড়ে ব্লক প্রেসিডেন্ট আক্রান্ত হয়েছেন বলেও আদালতে উল্লেখ করেন তিনি।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, আদালতের রায় ছাড়া, আইন না মেনে বুলডোজার অপারেশন চালানো যাবে না। অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে রাজ্য সরকারকে তা বন্ধ করতে বলা হোক।

এরপর তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বক্তব্য রাখার অনুমতি দেওয়া হোক, কারণ তিনিও আইনজীবী। মমতা উঠে দাঁড়াতেই আদালতে গুঞ্জন শুরু হয়। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, কেউ কোনো মন্তব্য করবেন না। ডেকোরাম বজায় রাখুন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে বলেন, এটা পশ্চিমবঙ্গ, এটা উত্তরপ্রদেশ নয়। এখানে বুলডোজার চালানো যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, ভোট-পরবর্তী হিংসায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হচ্ছে।

পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশকে নির্দেশ দিন। পুলিশ এফআইআর নিচ্ছে না। আমার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, তৃণমূল সমর্থকেরা আতঙ্কে অফিস যেতে পারছেন না, মাছ ও মাংসের বাজার ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং তাকেও বাড়ি থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

এসব শুনে বিচারপতি পার্থসারথী সেন জানতে চান, এসব অভিযোগ হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে কি না। উত্তরে মমতা জানান, সব তথ্য হলফনামায় রয়েছে। তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেন, পুলিশ যেন এফআইআর নেয় এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেয়।

অন্যদিকে, অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী ভার্চুয়ালি শুনানিতে অংশ নিয়ে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এটি জনস্বার্থ মামলা কীভাবে হলো? একজন প্র্যাকটিসিং আইনজীবী মামলা করেছেন। পাশাপাশি তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন, কোনো নির্দেশ দেওয়ার আগে অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখা হোক।

শুনানি শেষ হওয়ার পর আদালত চত্বরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ‘চোর, চোর’ স্লোগান দিতে থাকেন একাংশ আইনজীবী। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও তৃণমূলের আইনজীবীদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। কার্যত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই আদালত চত্বর ছাড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শেষ পর্যন্ত এদিন মামলার শুনানি শেষ হলেও কোনো রায় ঘোষণা করেনি আদালত। রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।