পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়। সে ঝড়ে উড়ে গেল তৃণমূলের ঘাসফুল। ঠিক ২০১১ সালে তৃণমূল বিধানসভা নির্বাচনে যে রেকর্ড করেছিল, ঠিক যেন তার বিপরীত চিত্র এবার। তারা বামেদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছিল সেবার। আর ১৫ বছর পর
তারাই রাজ্যের ক্ষমতা থেকে উড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি’র গেরুয়া পতাকায় ছেয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গ। এমন খবরে বিজেপি’র সমর্থকরা সোমবার দুপুর থেকেই উল্লাস করছেন রাজ্য জুড়ে। কোথাও আবীরে রাঙাচ্ছেন। কোথাও খাবার বিতরণ করছেন। কেউ নাচছেন। গাইছেন। সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস তৈরি হলো পশ্চিমবঙ্গে।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার মসনদে বসতে চলেছে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের কঠিন দুর্গে আঘাত হেনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৪টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন। আর তিনবার তিনি জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলেও এবার আর তা সম্ভব হয়নি। প্রত্যাবর্তনের সব স্বপ্নকে চুরমার করে বিজেপি পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে পূরণ করেছে। এই প্রথম রাজ্যটিতে হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতায় এলো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জুটির হাত ধরেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। আগামী ৯ই মে শপথ গ্রহণের দিন চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ শপথের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা অধ্যায়ের
আপাতত সমাপ্তিত ঘটছে
গতরাতে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ১৯০টি আসনে জয়ী প্রার্থীদের ফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে বিজেপি জয়ী হয়েছে ১৩৬ আসনে। তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছে ৪৯ আসনে। এছাড়া আমজনতা উন্নয়ন পার্টি ২টি আসনে, কংগ্রেস ২টি আসনে এবং সিপিআইএম ১টি আসনে জয়ী বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া বিজেপি ৭৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ৩০টি আসনে এবং এআইএসএফ ১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। ফলে বিজেপি মোট ২০৮টি আসনে জয়ী ও এগিয়ে রয়েছে। প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ৭৯টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে। শতাংশের হিসেবে স্থানীয় সময় সোমবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিজেপি পেয়েছে ৪৫.৪০ শতাংশ ভোট। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪০.৮২ শতাংশ ভোট। অন্যরা পেয়েছে শতকরা ৪ ভাগের নিচে ভোট।
অনেকদিন পরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে বুথ ফেরত জরিপ অনেকখানি মিলে গিয়েছে। বেশির ভাগ সমীক্ষা সংস্থা বিজেপি’র দেড়শ’ থেকে দু’শ আসনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী অবশ্য এই সব জরিপকে বানানো বলে অভিযোগ করে আঙ্গুল তুলেছিলেন বিজেপি’র দিকে। সোমবার দুপুরেও ফেসবুক লাইভে মমতা এই প্রাথমিক ভোট গণনার ট্রেন্ডকে বিজেপি’র পরিকল্পনা বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, শেষের দিকের রাউন্ডের গণনা শেষ হলে আমরাই জিতবো।
মমতা দাবি করেন, এখনো তৃণমূল শতাধিক আসনে এগিয়ে রয়েছে। সেগুলো বলছে না কমিশন। তিনি বলেন, ইলেকশন কমিশন নিজের ইচ্ছামতো খেলছে। সঙ্গে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আমাদের পুলিশরা মাথানত করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হয়ে কাজ করছে।
ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তার মধ্যে সোমবার সকাল থেকে রাজ্যের ৭৭টি গণনা কেন্দ্রে প্রার্থীর এজেন্টদের উপস্থিতিতে সতর্কতার সঙ্গে ভোট গণনা শুরু হয়। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গত ২৩ এবং ২৯শে এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় নির্বাচনী অপরাধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গের অভিযোগে গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে ফের ভোট হবে ২১শে মে। গণনা হবে ২৪শে মে। তাই গতকাল ফলতা বাদে বাকি কেন্দ্রগুলোর ভোটগণনা হয়েছে।
এদিন গণনা শুরুর প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বিজেপি’র এগিয়ে থাকার লক্ষণ স্পষ্ট হলেও প্রথমদিকে তৃণমূল কংগ্রেস হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালিয়ে গেলেও যত গণনা এগিয়ে গিয়েছে ততই তৃণমূল কংগ্রেস পিছিয়ে পড়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের একের পর এক মহারথির পতন ঘটেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারের ১১৪ ভোটের ব্যবধানে ভবানীপুর আসনে হেরে গেছেন। অন্যদিকে নন্দি গ্রামেও শুভেন্দু অধিকারী জিতেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ধীরগতিতে গণনার অভিযোগ করা হয়েছে।
সর্বশেষ নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গিয়েছে, গোটা উত্তরবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বিজেপি তাদের শক্ত ঘাঁটিকে আরও পোক্ত করেছে। দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গে বিজেপি একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুরের সব আসনে বিজেপি জয়ী হয়েছে। তৃণমূণ কংগ্রেস উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কিছু আসনে আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, নারী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী সাফল্যের মেরুদণ্ড হয়েছিল।
গত এক দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভোটব্যাংককে নজরে রেখে নারীদের জন্য একাধিক কল্যাণ প্রকল্প চালু করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান কর্মসূচি এবং মেয়েদের সহায়তার জন্য কন্যাশ্রী প্রকল্প। তবে এবারের নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নারীকেন্দ্রিক প্রণোদনা এবং কল্যাণ প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে প্রচার চালিয়েছে। আরজি-কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটিও এই নির্বাচনে একটি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। বিজেপি নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে। গেরুয়া দলটি পানিহাটি আসন থেকে নির্যাতিতার মা-কেও টিকিট দিয়েছে।
এ সবই নির্বাচনে সুফল তুলতে বিজেপিকে সহায়তা করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার আবেগও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রবল ছিল। তাছাড়া অনুপ্রবেশ ইস্যু ও দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলো নিয়ে বিজেপি যেভাবে প্রচার করেছিল তা ভোটারদের অনেকটাই প্রভাবিত করেছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের মতে, মুসলিম ভোট প্রবল হারে পড়লেও তা নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম ভোটের যে সমর্থন তিনি এতদিন পেয়েছেন তা এবার সম্ভব হয়নি। তবুও মুর্শিদাবাদ ও মালদহের বেশ কিছু আসনে তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিমদের সমর্থন পেয়েছেন ভালোভাবেই।
নির্বাচনে রেকর্ড ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়াকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী আশার লক্ষণ বলে মনে করলেও এখন স্পষ্ট হয়েছে এসআইআরের ভিত্তিতে ভোটের রেকর্ড হলেও তা মমতার দিকে যায়নি। বরং হিন্দু ভোটের সমর্থনের বড় অংশই বিজেপি’র দিকে গিয়েছে। এদিকে, ভোট গণনা যত এগিয়েছে ততই অশান্তির খবর পাওয়া গেছে। প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের মতো একাধিক ঘটনার খবর জানা গিয়েছে। কোচবিহারের দিনহাটায় বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বিজেপি’র নেতৃত্ব দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সংযত থাকার আবেদন জানিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, বাংলার মাটিতে গেরুয়া শাসন কায়েম হলেও কোথাও অশান্তি হতে দেবেন না।
তিনি আরও বলেন, তোষণের রাজনীতির পথে হেঁটে রাজ্যে এযাবৎ হিংসা ছড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসই।
তবে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনা কোনো ভাবেই বরদাশত করা হবে না। কোনো অশান্তি যাতে না ঘটে সেই দিকটা পুলিশকে দেখতে হবে। বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষকদের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। বিজেপি’র পক্ষ থেকে অবশ্য দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সংযত থাকার আবেদন জানানো হয়েছে। ওদিকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে ভোট গণনা কেন্দ্রে মমতা পৌঁছার পর সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন মমতা ও শুভেন্দু অধিকারীর মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।