দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার মূলে ছিল তাঁর চিরায়ত স্লোগান ‘মা, মাটি ও মানুষ’। তবে চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভেদ্য দুর্গে ফাটল ধরেছে। এর পেছনে পাঁচটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক সংস্তুতি নাথ।
নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, বিজেপি বর্তমানে ১৬০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮টি আসনের গণ্ডি অনায়াসে পেরিয়ে গেছে। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নির্বাচনী সমীকরণ ও জনভিত্তিকে গেরুয়া শিবির সফলভাবে তছনছ করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের এ পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে পাঁচ কারন।
১. নারী ভোটার
এতদিন পশ্চিমবঙ্গের নারী সমাজ ছিল তৃণমূলের প্রধান শক্তি, যার মূলে ছিল ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘কন্যাশ্রী’র মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প। তবে এবারের নির্বাচনে বিজেপি নারীদের নিরাপত্তার ইস্যুটিকে সামনে এনে সে আস্থায় ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে আর জি কর মেডিকেল কলেজের মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পানিহাটি আসনে নির্যাতিতার মাকে প্রার্থী করা এবং কেন্দ্রীয় ধাঁচে উন্নত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে অনুগত এ ভোটব্যাংককে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছে।
২. মুসলিম ভোট
রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোট সাধারণত বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের ঝুড়িতেই যেত। ২০২১ সালেও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টিতেই জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু ২০২৬ সালে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে মুসলিম ভোটে ব্যাপক বিভাজন দেখা গেছে।
প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দলের প্রভাব এবং অনেক এলাকায় কংগ্রেসের পুনরুত্থান তৃণমূলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. অভিবাসী শ্রমিক
২০২৬ সালের নির্বাচনে পরিযায়ী বা অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ গ্রামে ফিরে আসা এক বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনীর সময় নাম কাটা যাওয়ার আশঙ্কায় হাজার হাজার শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে বাড়িতে ফিরে ভোট দিয়েছেন। এ শ্রমিকরা বাইরের রাজ্যের উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা দেখে যে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছিলেন, তা গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় রাজনীতির গতানুগতিক ধারায় পরিবর্তন আনতে সহায়ক হয়েছে।
৪. মতুয়া সম্প্রদায়
রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায় এবারের নির্বাচনেও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ২০২১ সালে বিজেপিকে প্রধান বিরোধী দল করার পেছনে তাদের অবদান ছিল অপরিসীম। এবারও নাগরিকত্ব আইন ও মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো এলাকাগুলোয় গেরুয়া শিবির নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।
৫. বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি
পশ্চিমবঙ্গ প্রথাগতভাবেই ‘ক্যাডার-ভিত্তিক’ রাজনীতির রাজ্য, যেখানে তৃণমূল স্তরের শক্তিতেই ভোট জেতা যায়। ২০২৬ সালে বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো অবশেষে তৃণমূলের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। বুথ স্তরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, অত্যাধুনিক প্রচার কৌশল এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো দাপুটে নেতাদের নেতৃত্বে বিজেপি মাঠ পর্যায়ে তৃণমূলের পেশিশক্তি ও সাংগঠনিক দাপটকে রুখে দিয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
তৃণমূল যখন ১০০টি আসনের গণ্ডি পার হতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন এটি পরিষ্কার যে, এ পাঁচটি কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে। এর মাধ্যমেই রাজ্যে প্রথমবার বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পথ সুগম হলো। সূত্র: এনডিটিভি।